কুরআনে সুলাইমান (আঃ) ও রাণী বিলকিসের গল্প

Photo <a href=158084867 © - Dreamstime.com">

(দ্বিতীয় এবং শেষ পর্ব)

প্রথম অংশে আমরা হযরত সুলাইমান(আঃ) এর কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করেছি। এ অংশে আমরা তাঁর জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ‘সাবা’ সাম্রাজ্যের রাণী বিলকিসকে ইসলামের দিকে নিয়ে আহবানের ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা করব।

হযরত সুলাইমান(আঃ) আল্লাহর হুকুমে পক্ষীকুলের আনুগত্য লাভ করেছিলেন। একদিন তিনি পক্ষীকুলকে ডেকে একত্রিত করলেন এবং তাদের ভাল-মন্দ খোঁজখবর নিলেন। তখন দেখতে পেলেন যে, ‘হুদহুদ’ নামক পাখিটা সেখানে নেই। তিনি অনতিবিলম্বে তাকে ধরে আনার জন্য কড়া নির্দেশ দিলেন। সাথে তার অনুপস্থিতির উপযুক্ত কারণ দর্শানোর কথাও বললেন। উক্ত ঘটনা কুরআনের ভাষায় নিম্নরূপ:

“সুলায়মান পক্ষীদের খোঁজ খবর নিলেন, অতঃপর বললেন, কি হল, হুদহুদকে দেখছি না কেন? নাকি সে অনুপস্থিত? আমি অবশ্যই তাকে কঠোর শাস্তি দেব কিংবা হত্যা করব অথবা সে উপস্থিত করবে উপযুক্ত কারণ। কিছুক্ষণ পড়েই হুদ এসে বলল, আপনি যা অবগত নন, আমি তা অবগত হয়েছি। আমি আপনার কাছে সাবা থেকে নিশ্চিত সংবাদ নিয়ে আগমন করেছি” (আল কুরআন-২৭:২০-২২)

এ পর্যন্ত বলেই সে তার নতুন আনীত সংবাদ পেশ করল। যেখানে ‘সাবা’ সাম্রাজ্যের রাণী বিলকিস ও তার সম্রাজ্যের সূর্যপূজার সংবাদ সে বর্ণনা করে।

দুনিয়াবী দিক দিয়ে এই ‘সাবা’ সাম্রাজ্য খুবই সমৃদ্ধ এবং শান-শওকতে পূর্ণ ছিল। তাদের সম্পর্কে হযরত সুলাইমান(আঃ) এর কিছু জানা ছিল না বলেই কুরআনী বর্ণনায় প্রতীয়মান হয়। তাঁর এই না জানাটা বিস্ময়কর কিছু ছিল না। ইয়াকূব(আঃ) তাঁর বাড়ীর অনতিদূরে তাঁর সন্তান ইউসুফকে কূয়ায় নিক্ষেপের ঘটনা জানতে পারেননি। স্ত্রী আয়েশার গলার হারটি হারিয়ে গেল। অথচ স্বামী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম তা জানতে পারেননি। বস্ত্ততঃ আল্লাহ যতটুকু ইলম বান্দাকে দান করেন, তার চেয়ে বেশী জানার ক্ষমতা কারও নেই। পার্শ্ববর্তী ‘সাবা’ সাম্রাজ্য সম্পর্কে পূর্বে না জানা এবং পরে জানার মধ্যে যে কি মঙ্গল নিহিত ছিল, তা পরবর্তী ঘটনাতেই প্রমাণিত হয়েছে, যেখানে রাণী বিলকিস মুসলমান হয়ে যান। বস্ত্ততঃ হুদহুদ পাখি তাদের সম্পর্কে হযরত সুলাইমান(আঃ) এর নিকটে এসে প্রথম খবর দেয়। তার বর্ণিত প্রতিবেদনটি ছিল কুরআনের ভাষায় নিম্নরূপঃ

“আমি এক নারীকে সাবাবাসীদের উপর রাজত্ব করতে দেখেছি। তাকে সবকিছুই দেয়া হয়েছে এবং তার একটা বিরাট সিংহাসন আছে। আমি তাকে ও তার সম্প্রদায়কে দেখলাম তারা আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যকে সেজদা করছে। শয়তান তাদের দৃষ্টিতে তাদের কার্যাবলী সুশোভিত করে দিয়েছে। অতঃপর তাদেরকে সৎপথ থেকে নিবৃত্ত করেছে। অতএব তারা সৎপথ পায় না।” (আল কুরআন-২৭:২৩-২৪)

এই খবর পেয়ে সুলাইমান(আঃ) খানিক ভেবে একটি চিঠি লিখলেন রানী বিলকিসের কাছে। তাতে লিখলেন ‘গোমরাহির পথ ছেড়ে দাও, সত্যের পথে ফিরে এসো। অগ্নিপূজা বন্ধ করো, আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করো, তার ইবাদত করো। সময় থাকতে আমার অধীনতা স্বীকার করো।’

হুদহুদ এই চিঠি বয়ে নিয়ে পৌঁছে গেল রানী বিলকিসের প্রাসাদে। ঘুমন্ত রানীর বিছানার পাশে চিঠিটি রেখে চলে আসলো। এত সৈন্যের কঠোর প্রহরা ভেদ করে কে রেখে গেল এই চিঠি কেউ বলতে পারল না।

রানী চিন্তাই পড়ে গেলেন। অনেক ভেবেচিন্তে সুলাইমান(আঃ) কে সন্দেহ করলেন কারণ সোলাইমান(আঃ) এর ক্ষমতা সম্পর্কে তিনি জানতেন ৷ তাই সোলাইমান(আঃ)কে বশে আনতে দামি দামি উপঢৌকন দিয়ে দূত পাঠালেন।

সুলাইমান(আঃ) হলেন আল্লাহর নবী। তাঁকে অত সহজে কেও বশ করতে পারবে না। পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, ‘রানী বিলকিস কি এসব উপঢৌকন দিয়ে আমাকে খুশি করতে চায়? আমি সম্পদের কাঙাল নই। তোমাদের রানী যদি সূর্যপূজা না ছাড়ে, তবে তাকে গিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে বলো।’

খবর পেয়ে রানী রওনা হলে নবী সুলাইমান(আঃ) এব় দরবারে।

রানী কখন আসছেন, কীভাবে আসছেন। এসব হুদহুদ আগেই জানিয়ে দিল সুলাইমান(আঃ)কে। সুলাইমান(আঃ) তাকে ইসলামের দিকে আহ্বান করতে রাজ দরবারকে সুন্দরভাবে সাজালেন। চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিলেন সুন্দর সুন্দর ফুল ও সুগন্ধি।

রানী আসার আগেই জিনের মাধ্যমে সুলাইমান(আঃ) ‘সাবা’ নগরী থেকে রানীর স্বর্ণখচিত ও পাথরে অলঙ্কৃত সিংহাসন নিয়ে এলেন নিজের দরবারে।

রানী এলেন। এখানে নিজের সিংহাসন দেখে তিনি ভেবেই পেলেন না কেমন করে এটা সম্ভব! সুলাইমান(আঃ) তাকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। আল্লাহর একত্ববাদের কথা বললেন। সব দেখে-শুনে মুগ্ধ হলেন রানী বিলকিস।

তারপর অগ্নিপূজা ছেড়ে দিয়ে তখনই আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস করতে আগ্রহী হলেন ফলে শামিল হলেন চির শান্তির পতাকাতলে।

এভাবেই রাণী বিলকিস আশ্রয় নিলেন তাওহিদের পতাকাতলে।