কুরআনে হযরত সুলাইমান(আঃ)-এর গল্প (প্রথম অংশ)

© Arief Bagus | Dreamstime.com

মুসললিমরা এটি বিশ্বাস করে যে, আল্লাহর নবীগণ তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিশেষ অনুগ্রহ লাভ করেছিলেন এবং তাঁরা সকলেই পুরুষ ছিলেন।

আল্লাহ তা’আলা সুলাইমান(আঃ) কে তাঁর বাল্যকালেই গভীর প্রজ্ঞা ও দূরদৃষ্টি দান করেছিলেন। ছাগপালের মালিক ও শস্যক্ষেতের মালিকের মধ্যে পিতা হযরত দাঊদ(আঃ) যেভাবে বিরোধ মীমাংসা করেছিলেন, বালক সুলাইমান(আঃ) তার চাইতে উত্তম ফায়ছালা পেশ করেছিলেন। ফলে হযরত দাঊদ(আঃ) নিজের পূর্বের রায় বাতিল করে পুত্রের দেওয়া প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং সে মোতাবেক রায় প্রদান করেন।

উক্ত ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহ বলেন, “আর স্মরণ কর দাঊদ ও সুলাইমানকে, যখন তাঁরা একটি শস্যক্ষেত সম্পর্কে বিচার করছিল, যাতে রাত্রিকালে কারও মেষপাল ঢুকে পড়েছিল। আর তাদের বিচারকার্য আমাদের সম্মুখেই হচ্ছিল। অতঃপর আমরা সুলাইমানকে মোকদ্দমাটির ফায়ছালা বুঝিয়ে দিলাম এবং আমরা উভয়কে প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দান করেছিলাম।” (আল কুরআন-২১:৭৮-৭৯)

দাঊদ(আঃ)-এর ন্যায় সুলাইমান(আঃ)-কেও আল্লাহ বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য দান করেছিলেন, যা আর কাউকে দান করেননি। যেমন: (১) বায়ু প্রবাহ অনুগত হওয়া (২) তামাকে তরল ধাতুতে পরিণত করা (৩) জিনকে অধীনস্ত করা (৪) পক্ষীকূলকে অনুগত করা (৫) পিপীলিকার ভাষা বুঝা (৬) অতুলনীয় সাম্রাজ্য দান করা (৭) প্রাপ্ত অনুগ্রহরাজির হিসাব না রাখার অনুমতি পাওয়া।

১. বায়ু প্রবাহকে তাঁর অনুগত করে দেওয়া হয়েছিল। যেমন আল্লাহ বলেন, “এবং আমরা সুলাইমানের অধীন করে দিয়েছিলাম বায়ুকে, যা সকালে এক মাসের পথ ও বিকালে এক মাসের পথ অতিক্রম করত…” (আল কুরআন-৩৪:১২)

২. তামার ন্যায় শক্ত পদার্থকে আল্লাহ সুলাiমান(আঃ) এর জন্য তরল ধাতুতে পরিণত করেছিলেন। যেমন আল্লাহ বলেন, “আমরা তার জন্য গলিত তামার একটি ঝরণা প্রবাহিত করেছিলাম…’ (আল কুরআন-৩৪:১২)

৩. জিনকে তাঁর অধীন করে দিয়েছিলেন। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘আর জিনের মধ্যে কিছুসংখ্যক তার (সুলাইমানের) সম্মুখে কাজ করত তাঁর পালনকর্তার আদেশে…’ (আল কুরআন-৩৪:১২)

৪. পক্ষীকুলকে সুলাইমান (আঃ) এর অনুগত করে দেওয়া হয়েছিল এবং তিনি তাদের ভাষা বুঝতেন। যেমন আল্লাহ বলেন,

“সুলাইমান দাঊদের উত্তরাধিকারী হয়েছিল এবং বলেছিল, হে লোক সকল! আমাদেরকে পক্ষীকুলের ভাষা শিক্ষা দেওয়া হয়েছে এবং আমাদেরকে সবকিছু দেওয়া হয়েছে। নিশ্চয়ই এটি একটি সুস্পষ্ট শ্রেষ্ঠত্ব” (আল কুরআন-২৭:১৬)

পক্ষীকুল তাঁর হুকুমে বিভিন্ন কাজ করত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা এই যে, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পত্র তিনি হুদহুদ পাখির মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী ‘সাবা’ রাজ্যের রাণী বিলক্বীসের কাছে প্রেরণ করেছিলেন। এই ঘটনাটি ২য় অংশে বিবৃত হবে।

৫. পিপীলিকার ভাষাও তিনি বুঝতেন। যেমন আল্লাহ বলেন, “অবশেষে সুলাইমান তার সৈন্যদল নিয়ে পিপীলিকা অধ্যুষিত উপত্যকায় পৌঁছল। তখন পিপীলিকা (নেতা) বলল, হে পিপীলিকা দল! তোমরা স্ব স্ব গৃহে প্রবেশ কর। অন্যথায় সুলাইমান ও তাঁর বাহিনী অজ্ঞাতসারে তোমাদের পিষ্ট করে ফেলবে’। ‘তার এই কথা শুনে সুলায়মান মুচকি হাসল…” (আল কুরআন-২৭:১৮-১৯)

৬. তাঁকে এমন সাম্রাজ্য দান করা হয়েছিল, যা পৃথিবীতে আর কাউকে দান করা হয়নি। এজন্য আল্লাহর হুকুমে তিনি আল্লাহর নিকটে প্রার্থনা করেছিলেন। যেমন আল্লাহ বলেন, “সুলাইমান বলল, হে আমার পালনকর্তা! আমাকে ক্ষমা কর এবং আমাকে এমন এক সাম্রাজ্য দান কর, যা আমার পরে আর কেউ যেন না পায়। নিশ্চয়ই তুমি মহান দাতা।” (আল কুরআন-৩৮:৩৫)

উল্লেখ্য যে, নবীদের কোনো দু‘আ আল্লাহর অনুমতি ব্যতিরেকে হয় না। সে হিসাবে হযরত সুলাইমান(আঃ) এ দু‘আটিও আল্লাহ তা‘আলার অনুমতিক্রমেই করেছিলেন। কেবল ক্ষমতা লাভ এর উদ্দেশ্য ছিল না। বরং এর পিছনে আল্লাহর বিধানাবলী বাস্তবায়ন করা এবং তাওহীদের ঝান্ডাকে সমুন্নত করাই মূল উদ্দেশ্য ছিল। কেননা আল্লাহ জানতেন যে, রাজত্ব লাভের পর সুলাইমান তাওহীদ ও ইনছাফ প্রতিষ্ঠার জন্যই কাজ করবেন এবং তিনি কখনোই অহংকারের বশীভূত হবেন না। তাই তাঁকে এরূপ দু‘আর অনুমতি দেওয়া হয় এবং সে দু‘আ সর্বাংশে কবুল হয়।

৭. আল্লাহ তাঁকে প্রাপ্ত অনুগ্রহরাজির হিসাব রাখা বা না রাখার অনুমতি প্রদান করেন। আল্লাহ পাক হযরত সুলাইমান(আঃ)-এর রাজত্ব লাভের দু‘আ কবুল করার পরে তার প্রতি বায়ু, জিন, পক্ষীকুল ও জীব-জন্তু সমূহকে অনুগত করে দেন। অতঃপর বলেন, “এসবই আমার অনুগ্রহ। অতএব এগুলো তুমি কাউকে দাও অথবা নিজে রেখে দাও, তার কোন হিসাব দিতে হবে না। নিশ্চয়ই তার (সুলাইমানের) জন্য আমার কাছে রয়েছে নৈকট্য ও শুভ পরিণতি” (আল কুরআন-৩৮:৩৯-৪০)

(চলবে)