‘কুসকুস’ আর ‘তাজিনের’-এর শহর রক্তিম মারাক্কেশ

marrakesh
Red flowers in front of the gate in the Medina of Marrakech, Morocco. ID 142311881 © Gábor Kovács | Dreamstime.com

উত্তর আফ্রিকার একটি দেশ মরক্কো। আটলান্টিক মহাসাগরের কোল ঘেঁষে আফ্রিকার সবচেয়ে পশ্চিমের দেশও বলা যায় একে। ইউরোপীয় মহাদেশের এত কাছে থাকা সত্ত্বেও মরক্কোকে আমরা কখনওই ইউরোপের সঙ্গে সংযুক্ত করতে পারি না। বলাবাহুল্য ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের পাশাপাশি প্রগতি এবং আধুনিকতার এক অপূর্ব মিশেল লক্ষ করা যায় এই শহরের আনাচ-কানাচে। এই প্রসঙ্গে বিভিন্ন পর্যটক, ভ্রমণকারীদের প্রত্যক্ষ বক্তব্যকেই আমরা উদাহরণের মাপকাঠি হিসেবে বিচার করতে পারি। শোনা যায় মরক্কোর রাজধানী শহর রাবাত, যেখানে চোখে পড়বে বিদেশি এবং বিলাসবহুল গাড়ি, সেখানেই আবার উট ছাড়া মরক্কো ভ্রমণ আজও অকল্পনীয়।

মরক্কোর ভৌগোলিক অবস্থিতিও নিঃসন্দেহে আকর্ষক। এর দক্ষিণে রয়েছে সাহারা মরুভূমি, উত্তরে মেডিটারিয়ান সমুদ্র ও পূর্বে আলজেরিয়া, পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর। ভৌগোলিক এই অবস্থান দেখে বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না যে মরক্কো দেশটি দুই সমুদ্র দ্বারা পরিবেষ্টিত। রবাত ছাড়াও মরক্কোর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য শহরগুলো হয় মারাক্কেশ, তানগির, আডাগির, কাসাব্লাঙ্কা…. তবে ভৌগোলিক এবং ঐতিহাসিক নিদর্শনের কারণেই হোক মারাক্কেশ শহরেই পর্যটকদের বেশি আনাগোনা আমাদের চোখে পড়ে।

এককথায় এই শহর যেন সেজে উঠেছে পর্যটকদের জন্যই। পর্যটকদের মনে আনন্দ দেওয়ার জন্যই যেন এর বহুবিধ স্থাপত্যশিল্পের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি… মারাক্কেশ শহরটির কথা বলার প্রসঙ্গেই আরও কয়েকটি বিষয় জেনে নেওয়া যাক। ১০৬২ খ্রিষ্টাব্দে এই শহর প্রতিষ্ঠা করেন আবু বকর ইবনে উমর ইবনে ইব্রাহিম ইবনে তুরগুত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা ৪৬৬ মিটার। ২০১২ সালের হিসেব অনুসারে এই শহরের জন সংখ্যা ১০ লক্ষ ৬৩ হাজার ৪১৫ জন। নিতান্ত সংখ্যা এবং গবেষণাভিত্তিক পরিসংখ্যানকে বাদ দিয়ে বলা যায় এই শহরের চকমপ্রদ শোভা পর্যটকদের বারবার ফিরে আসার আমন্ত্রণ জানায়।

শহরটিতে সবসময়েই তাপমাত্রা বেশি থাকে, শীতের দিকে বিশেষত ডিসেম্বর-জানুয়ারির সময়ে শহরের তাপমাত্রা কিছুটা কম থাকে বলে এই সময়টিকে অনেক পর্যটেকরা ঘুরতে যাওয়ার জন্য একটা আদর্শ সময় হিসেবে বেছে নিয়ে থাকেন। শহরের প্রশস্ত রাস্তা জুড়ে কমলালেবু সদৃশ সিস্ট্রাস ফলের শোভা মনোমুগ্ধকর। ভাল লাগে লাল রঙয়ের পুরনো বাড়িগুলোর ঐতিহ্য সমৃদ্ধ ইমারত। একটা বিষয় আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে মরক্কো দেশ হল ঐতিহ্য এবং আধুনিকতার সমৃদ্ধ এক দেশ, কাজেই এই শহরের বুকেও রয়েছে তার ছোঁয়া রয়েছে। ঘোড়ার টানা গাড়ি আর জামা আল ফানা স্কয়ারের পরিবেশ নিঃসন্দেহে আলাদা আমেজ এনে দেয় পর্যটকদের মনে। সমগ্র স্কোয়ার জুড়ে ফেরিওয়ালাদের দরদামের হাকাহাকি এবং সাপুড়িদের বাঁশি যেন পরিবেশের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে তুলতে সহায়ক। এ ছাড়াও এখানে চোখে পড়বে নানাধরনের হস্তশিল্পের নিদর্শন এবং পাওয়া যাবে সুস্বাদু ‘তাজিন’ তৈরির বাসনপত্রও।

এই স্কোয়ারের ঠিক পাশেই রয়েছে কুতুবিয়া মসজিদ, মসজিদ সংলগ্ন প্রায় ৭৭ মিটার দীর্ঘ মিনারের শোভা পরিবেশের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে তোলার পক্ষে যথেষ্ট। সময়ের বিচারে মসজিদটি ১২ শতকে তৈরি হয়েছে। সুতরাং, প্রাচীন সময়ের নিদর্শন এই মসজিদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবহমান… কুতুবিয়া মসজিদের পাশাপাশি এই শহরের অন্যান্য দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে অবশ্যই রয়েছে বাদি প্যালেস, সেন্ট্রাল প্যালেস, রাজকীয় প্যালেস, বাহিয়া প্যালেস, সাত পীরের মাজার শরীফ, মারাক্কেশ জাদুঘর, মিউজিয়ম অফ ইসলামিক আর্ট প্রভৃতি। মারাক্কেশ শহরের মূল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই গড়ে উঠেছে এর পর্যটনশিল্পকে কেন্দ্র করে। তৃতীয় শতকে এই শহরের নির্মাণ এবং একটা দীর্ঘ সময় জুড়ে শহরটি ছিল রোমানদের দখলে, যার প্রভাব হয়তো প্রচ্ছন্নে থেকে গিয়েছে মারাক্কেশবাসীর জীবনশৈলীতে। মারাক্কেশের হস্তশিল্পের নমুনা নিঃসন্দেহে শৈল্পিক উৎকর্ষসমৃদ্ধ। মারাক্কেশ শহরের দুটি প্রধান খাবারের পদের জনপ্রিয়তা চোখে পড়ে। অবশ্যই উল্লেখ করতে হয় কুসকুস-এর কথা।

কুসকুস তাদের ঐতিহ্যবাহী একটি খাবার যা মূলত ভাত এবং সবজির মিশ্রণে তৈরি করা হয়। মরক্কো দেশে এবং মারাক্কেশ শহরে আরও একটি খাবার বিশেষভাবে জনপ্রিয়, তা হল ‘তাজিন’। প্লাম( একধরনের ফল) এবং মাংস দিয়ে তাজিন তৈরি করা হয়, স্বাদে-গন্ধে এই খাবার অনবদ্য। মারাক্কেশবাসীরা এই পদটি খেয়ে থাকে প্রধানত ডালিয়া বা রুটি দিয়ে। মারাক্কেশ শহর জুড়েই এমনভাবেই ছড়িয়ে ছিড়িয়ে রয়েছে প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ঐতিহাসিক নিদর্শন, যার উপরে ভিত্তি করে ইউনেস্কো কর্তৃক ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের তকমা পেয়েছে শহরটি।