কৃতজ্ঞতাই অন্তরে প্রশান্তি নিয়ে আসে

ID 50178150 © Dmitry Antonov | Dreamstime.com
ID 50178150 © Dmitry Antonov | Dreamstime.com

নাসিরুদ্দিন জুহা নামে একজন সাধারণ মানুষ ছিলেন, যিনি একটি ছোট্ট গ্রামে বাস করতেন। তিনি একজন ভাল জুতা প্রস্তুতকারক ছিলেন। তিনি খুব জ্ঞানী বা ধনী বা খুব শক্তিশালী বা সুদর্শন ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন সাধারণ মানুষ। তবে তিনি ছিলেন একজন সদাহাস্য সন্তুষ্ট মানুষ।

জুহার বয়স অনেক হয়েছিল তবে তার কোন সন্তান ছিল না। তাঁর স্ত্রী অনেক আগেই মারা গিয়েছিল এবং তিনি আর কখনও বিয়েও করেননি। তাঁর কোনো ভাইবোন বা আত্মীয়স্বজন ছিল না। তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি প্রতিদিন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামাজ পড়তে মসজিদে যেতেন। সেখান থেকে তিনি তাঁর কর্মশালায় যেতেন, যেখানে তিনি সারাদিন ব্যাপি পরিশ্রম করতেন।

যখন তিনি বৃদ্ধ হচ্ছিলেন, তখন এক যুবক তাঁর কাছে এল। সে জুহার কাছ থেকে কাজ শিখতে চেল। জুহা তাকে মেনে নিলেন। তার নাম ছিল আবদুল্লাহ।

একদিন আবদুল্লাহ জুহাকে জিজ্ঞাসা করল, “আপনি কীভাবে এত আনন্দিত ও সন্তুষ্ট থাকেন  যখন আপনার স্ত্রী, সন্তান বা পরিবার বলতে কিছু নেই? যখন আল্লাহ আপনাকে জ্ঞান বা সম্পদ কিছুই দেন নি? যখন আপনি একজন ভাল জুতা প্রস্তুতকারক এবং দয়ালু ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কোনোকিছুর জন্য পরিচিতও না?”

জুহা হেসে উত্তর দিলেন, “সম্ভবত আল্লাহ আমাকে ধন-সম্পদ দান করেননি কারণ হয়ত এর দ্বারা আমি দুর্নীতি করতাম। সম্ভবত তিনি আমাকে প্রচুর জ্ঞান দান করেননি কারণ হয়ত এটি আমাকে গর্বিত ও অহঙ্কারী করে তুলত। সম্ভবত তিনি আমাকে সন্তান দেননি কারণ আমি হয়ত ভাল পিতা হতে পারতাম না এবং তারা অন্যায়ের পথে পা বাড়াত।

আমার স্ত্রীকে আমি খুব ভালবাসতাম, তবে সে আল্লাহকে আরও বেশি ভালবাসত। সে আমার চেয়ে এগিয়ে গেছে এবং আমি শীঘ্রই তার সাথে মিলিত হব।

তবে আল্লাহ আমাকে দুটি হাত দিয়েছেন এবং আমাকে জুতা তৈরি করা শিখিয়েছেন যাতে আমাকে ভিক্ষা করতে না হয় এবং আমি আমার ত্রুটিগুলি শুধরে নেওয়ার জন্য সামান্য সদকা করতে পারি। তিনি আমাকে দীর্ঘ জীবন দান করেছেন যাতে আমি তাঁর ইবাদত করতে পারি। এরপরও কি আমি কৃতজ্ঞ ও সন্তুষ্ট হব না?”

জুহার আনন্দ ও সন্তুষ্টির কারণ

জুহাকে কোন জিনিসটি কৃতজ্ঞ এবং সন্তুষ্ট বানিয়েছে? আল্লাহ ও তাঁর সৃষ্টির প্রতি ভালো দৃষ্টিভঙ্গি। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

“নিশ্চয়ই আল্লাহ সম্পর্কে ভাল ধারণা রাখা মহান আল্লাহর ইবাদতেরই একটি অঙ্গ।” (জামে তিরমিযী)

তিনি আরও বলেছেনঃ

“আল্লাহ বলেন, যদি কেউ আমার প্রতি সুধারণা রাখে তবে সে ভালকিছু পাবে। আর যদি কেউ আমার প্রতি খারাপ ধারণা রাখে তবে সে খারাপকিছুই পাবে।” (মুসনাদে আহমাদ)

সন্তুষ্টি সন্ধান করা

আমরা জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আলোকে আমাদের নিজেকে ও বিশ্বকে চিনতে পারি। এটি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি গঠন করে। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কোনো বিষয় উপলব্ধি করতে আমাদেরকে সাহায্য করে এবং আমাদের প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। প্রতিটি মুহুর্ত ও উদ্দীপনাকে ব্যাখ্যা করে। 

ইবনে আব্বাস রাযিঃ বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুবই আশাবাদী ছিলেন এবং তিনি অশুভ অভ্যাস পছন্দ করতেন না এবং তিনি ভাল নাম পছন্দ করতেন। (মুসনাদে আহমাদ)

মনোবিজ্ঞানে এটিকেই আজ “ইতিবাচক চিন্তাভাবনা” বলে অভিহিত করা হয়। এটি মনোবিজ্ঞানের মধ্যে অধ্যয়নের একটি শাখায় পরিণত হয়েছে। এটি মানুষকে আরও ভাল জীবনযাপন করতে সহায়তা করে।

তবে যা ঘটে তা সবই ভাল নয় এবং সকলেই সদয় নয়।

আমাদের উচিত জীবনের প্রতিটা দিককে ইতিবাচক ভাবে দেখা। দুঃখ কষ্টের অনুভূতি জীবনেরই একটি অংশ। তবে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এই কষ্টগুলিকে অনেকাংশেই কমিয়ে দেয়।

উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহর সম্পর্কে ভাল দৃষ্টিভঙ্গি থাকার অর্থ এই হতে পারে যে, যখন আমাদের কঠিন কিছু হয় তখন আমরা তা থেকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করি যে, আল্লাহ তা’আলা আমাদের জন্য এতে কী রেখেছেন। এই অভিজ্ঞতা থেকে আমরা কী শিখতে পারি। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

“মুমিনের বিষয়টি বড়ই আশ্চর্যজনক। তার সবকিছুই তার জন্য কল্যাণকর; মুমিন ছাড়া আর কারও এই বৈশিষ্ট্য নেই। সে যখন আনন্দদায়ক কিছু লাভ করে তখন শোকর করে, আর শোকর তার জন্য কল্যাণের বিষয়। যখন কষ্টদায়ক কোনো কিছুর সম্মুখীন হয়, তখন সে ছবর করে, আর ছবরও তার জন্য কল্যাণের বিষয়” (বুখারী)

তাই আসুন আমরা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে ইতিবাচক হিসেবে গড়ে তুলি। আল্লাহই তওফিকদাতা।