কৃপণতা নয়, অর্থ সঞ্চয়ের মাহাত্ম্য রয়েছে ইসলামে

Islamic Finance, Kewangan Islam
3D illustration of a magnifier over the text Islamic finance written with golden letter. Black background.

ইসলামে সম্পদ খরচের ক্ষেত্রে কৃপণ হওয়া যেমন নিষিদ্ধ, তেমনি প্রাচুর্যের সময় অপচয়, অপব্যয় করে সম্পদ খরচ করাও নিষিদ্ধ। পবিত্র কোরআনে কারিমে অপচয় ত্যাগের কঠোর নির্দেশ জারি করে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা আহার এবং পান করো, আর অপচয় করো না; তিনি (আল্লাহ) অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।’ অপচয় এবং কৃপণতা দু’টোই ইসলামে অনুনমোদিত। এই দুই প্রান্তিকতার মাঝখানে মধ্যমপন্থা হিসেবে মিতব্যয়ী হয়ে ভবিষ্যতের জন্য কিছু অর্থ সঞ্চয় করে রাখা ইসলামের শিক্ষা। যারা অপচয় এবং কৃপণতার পথ পরিহার করে মিতব্যয়িতার পথ অবলম্বন করবে আল্লাহ তাদেরকে নিজের বান্দা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

অর্থোপার্জন, খরচ ও সঞ্চয়ের ব্যাপারে মধ্যমপন্থার নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। মনে রাখতে হবে, সঞ্চয় করতে গিয়ে কৃপণের তালিকায় যেন আপনার নাম না উঠে। কৃপণতা ও অপব্যয় সম্পর্কে সমাজের প্রচলিত ধারণাটি ভুল। যাকে বলে গোড়ায় গলদ। অনেকে মনে করেন, জন্মদিন, মৃত্যুদিবস, বিবাহবার্ষিকী ও ভালোবাসা দিবসের মতো বিভিন্ন দিবস কিংবা বার্ষিকীতে প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে নির্বিচারে ধার-দেনা করে হলেও খরচ করতে পারাই যেন উদারতা। ক্রমবর্ধমান এমন অযাচিত খরচের জোগান ও আনুষ্ঠানিকতায় তাল মেলাতে কালো টাকার পেছনে দৌড়ানো এবং চোরাপথ আবিষ্কার করাও যেন দূষণীয় নয়!

পক্ষান্তরে যে হালাল-হারাম, পাপ-পুণ্য, প্রয়োজন-অপ্রয়োজন বিবেচনা করে খরচ করেন এবং অপব্যয়-অপচয় থেকে বিরত থাকেন- তাকে মনে করা হয় ‘কৃপণ’। স্ত্রী, সন্তান-সন্ততির ভরণপোষণ, পিতামাতার প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণের মতো আল্লাহ নির্দেশিত খাতে খরচ করতে অবহেলাই হলো- প্রকৃত কৃপণতা। অনেকে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচটুকু করতে করে না, অভাবগ্রস্তকে কিছু দান করে না; জরুরী দ্বীনি কাজে অর্থ ব্যয় করে না- তাকেও কৃপণ বলা হয়।

কৃপণ না হয়ে ইসলাম নির্দেশিত খাতে খরচে কোনো রকম দ্বিধা না করে, হারাম পথে খরচের সব পথ বন্ধ করে দিয়ে; অপচয়-অপব্যয় না করার মাধ্যমে মিতব্যয়ী হলে দারিদ্রমুক্ত জীবন আল্লাহ তাকে দান করবেন। এটা রাসূলে কারিম (সা.)-এর ভবিষ্যতবাণী।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলে কারিম (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি পরিমিত ব্যয় করে সে নিঃস্ব হয় না।’ -মুসনাদে আহমাদ: ৭/৩০৩

কৃপণ না হয়ে মিতব্যয়ী হয়ে সঞ্চয় করলে হাজার কোটি টাকার মালিক হতেও ইসলাম নিষেধ করে না। সঞ্চিত অর্থ থাকলেই তো অর্থনির্ভর আমলগুলো করা যাবে। রোজাদারকে ইফতার করানো যাবে। শরিক হওয়া যাবে জনকল্যাণমূলক নানা কাজে। চালু করা যাবে সদকায়ে জারিয়ার অফুরন্ত ধারা। আবার উদ্ধৃত অর্থ যখন নেসাব পরিমাণ হবে এবং তার বর্ষপূর্তি হবে তখন সেখানে এসে যাবে জাকাতের মতো আরেকটি মহান ইবাদতের সুযোগ। ইসলাম সঞ্চয়কে কতটুকু গুরুত্ব দিয়েছে তা আরও স্পষ্ট হয় রাসুলে কারিম (সা.)-এর হাদিস থেকে। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, হযরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, উত্তম দান তাই, যা নিজ অভাবমুক্ততা রক্ষার সঙ্গে হয়। (সহিহ বোখারি: ২/১১২)

সন্তানদের জন্য কিছু সঞ্চয় করাও ইসলামের শিক্ষা। সন্তানদের কারও মুখাপেক্ষী রেখে যাওয়া নবীজি সা. কখনো পছন্দ করেননি। রাসুল সা. বলেন, ‘তোমার উত্তরাধিকারীদের মানুষের করুণার মুখাপেক্ষী রেখে যাওয়ার চেয়ে তাদের সচ্ছল রেখে যাওয়াই উত্তম।’ (বোখারি : ১/৪৩৫)।
রোজাদারকে ইফতার করানো যাবে। হাদিয়া আদান-প্রদান করা যাবে। শরিক হওয়া যাবে জনকল্যাণমূলক কাজে। অর্থ ব্যয় করে সদকায়ে জারিয়ার অফুরন্ত সাওয়াব হাসিল করা যাবে।

অর্থ সঞ্চয়ের সহজ কিছু উপায়।

১। খরচের হিসাব রাখুন : অর্থ সঞ্চয়ের প্রথম ধাপে আপনাকে নিজের খরচের পরিমাণ সম্পর্কে জানতে হবে। এক মাসের জন্য, আপনার সমস্ত ব্যয়ের হিসাব লিখে রাখুন।কফি, নিউজপেপার কিংবা স্ন্যাকস অর্থাৎ দৈনন্দিন জীবনের ছোট বড় সব খরচ তালিকাভুক্ত করতে হবে।

২। বাজেট তৈরী করুন : নিজের মাসিক খরচ সম্পর্কে যখন ভালো ধারণা পেয়ে যাবেন, তখন অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা করার জন্য বাজেট তৈরী করে নেওয়াটা উত্তম। প্রতিদিনের নির্ধারিত বাজেট থেকে অল্প টাকা বাঁচিয়ে নিতে চেষ্টা করুন। অতিরিক্ত খরচ সম্পর্কে সচেতন থাকুন এবং জরুরি আর্থিক প্রয়োজনের জন্য সেভিংস ফান্ডে আলাদা অর্থ জমা রাখতে পারেন।

৩। সঠিক পরিকল্পনা তৈরী করুন : সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া কোনকিছুই সফলভাবে করা সম্ভব নয়- সেটা অর্থ সঞ্চয় বা অন্য কিছু হোক। সঞ্চয় করতে হলে আপনাকে কিছু হিসেব কষে এগোতে হবে। আপনি নিজের মাসিক আয়-ব্যয় বিবেচনা করে, আপনার বাজেটের মধ্যে একটি সেভিংস ক্যাটাগরি তৈরী করে নিতে পারেন। খরচের পরিমাণের কারণে যদি আপনার জন্য সঞ্চয় করা সম্ভব না হয়, তবে একটু কাটছাঁট শুরু করতে পারেন।

৪। সঞ্চয়ের লক্ষ্য নির্ণয় করুন : কোন উদ্দেশে সঞ্চয় করবেন সেটা আগে স্থির করুন। এতে সঞ্চয় শুরু করাটা সহজ হবে। নির্ধারিত আর্থিক লক্ষ্যে পৌঁছাতে আপনার কতটুকু সময় লাগবে সেটাও জানা জরুরি। কিছু স্বল্প মেয়াদি (১-৩বছর) লক্ষ্যের মধ্যে রয়েছে : চাকরিচ্যুত হলে বা কোন আর্থিক প্রয়োজনে, ৬ মাস থেকে ১ বছর আপনার ব্যয় নির্বাহ করতে পারবেন এইরূপ একটি জরুরি ফান্ড গঠন।