কেউ কি জন্মগতভাবে ভাগ্যবান বা হতভাগা হয়?

katherine-chase-uNNvGTSwFtw-unsplash
Fotoğraf: Katherine Chase-Unsplash

নিশ্চয় আমি প্রত্যেক বস্তুকে পরিমিতরূপে সৃষ্টি করেছি (আল কুরআন – ৫৪:৪৯)

তাকদীরের ধারণাটি নতুন মুসলিমদের কাছে অনেকটা বিভ্রান্তিকর মনে হতে পারে; আমি যখন প্রথম ইসলামী বিশ্বাসে রূপান্তরিত হয়েছিলাম তখনও আমার কাছে বিষয়টি এমনই ছিল।

তাকদীরে বিশ্বাস স্থাপন করা ইসলামের একটি অন্যতম স্তম্ভ এবং এটি ঈমানের মূল ভিত্তি। মূলত, ক্বাদা বা নিয়তির অর্থ আমাদের সাথে যা ঘটে, আমাদের চারপাশের মানুষের সাথে যা ঘটে এবং আমাদের মহাবিশ্বে যা কিছু ঘটে তা সবই একমাত্র আল্লাহর ইচ্ছাতেই ঘটে।

সমস্তকিছুই আল্লাহ পূর্বনির্ধারিত করে রেখেছেন এবং আমরা যা বলি বা করি না কেন আল্লাহর ইচ্ছারই প্রতিফলন ঘটবে।

তবে আল্লাহপাকের কাছে আন্তরিক প্রার্থনা কোনো ঘটনার ফলাফলের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।

তাকদীর এবং স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি

তাহলে এর অর্থ কি এই যে আমরা হাত পা ফেলে বসে থাকব এবং আমাদের জন্য ভাল বা খারাপ যা কিছু ঘটবে তার জন্য অপেক্ষা করব?

অবশ্যই না! মহান আল্লাহ তা’আলা সকল মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দান করেছেন।

মানুষ তাদের নিজের জীবনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী, কারণ তারা ভাল থেকে মন্দ এবং মন্দ থেকে ভাল বেছে নেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এ কারণেই, শেষ বিচারের দিন আমরা নিজ থেকে যা পছন্দ করেছি তার জন্য আমাদেরকে জবাবদিহি করতে হবে।

এখানে উল্লেখ্য, আল্লাহ তা’আলা অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের সকল বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন; এবং আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা কী করব তা তিনি জানেন।

তাকদীর এবং ইসলাম

ইসলামী বিশ্বাস অনুসারে ভাগ্যবান বা দুর্ভাগা বলে কোনো বিষয় নেই। যখন কোনো ভাল কিছু আপনার সামনে আসে তার অর্থ এই নয় যে, আপনি ভাগ্যবান। আবার যখন কোনো খারাপ বিষয় আপনার মুখোমুখি হয়, তার অর্থ এই নয় যে, আপনি দুর্ভাগা।

সবকিছুই কোনো না কোনো কারণে ঘটে, যদিও কারণটি আমাদের কাছে পরিষ্কার নাও হতে পারে। কিন্তু আল্লাহই কেবল এর পিছনের সমস্ত হেকমত জানেন। মনে রাখবেন মানুষকে কেবল এবং কেবলমাত্র একটি কারণেই সৃষ্টি করা হয়েছে এবং তা হল সর্বশক্তিমান আল্লাহর ইবাদত করা।

আমরা কতবার দেখেছি যে, কেউ লটারিতে কয়েক মিলিয়ন ডলার জিতেছে? আশেপাশের প্রত্যেকেই তাকে কত ভাগ্যবান মনে করে নিজের জন্য বিলাপ করে।

তবে, আমরা কিন্তু লটারি বিজয়ীদের অনেক সময় তাদের জয়ের ফলস্বরূপ ভুগতেও দেখেছি। কারণ অর্থের প্রাচুর্য্য অনেক সময় পারিবারিক সমস্যা ও সামাজিক অনিরাপত্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং লটারি জেতা তার জন্য কোনো ভাল বিষয় ছিল না যদিও এই বিষয়টি তাৎক্ষণিক বুঝে আসেনি।

যদিও মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দেওয়া হয়েছে, তবে এর অর্থ এই নয় যে, আল্লাহর ইচ্ছার প্রতিফলন হবে না। আল্লাহ বলেনঃ

তোমাদের চাওয়ার দ্বারা কিছুই হয় না যদি আল্লাহ না চান; আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। (আল কুরআন – ৭৬:৩০)

তাকদীরে বিশ্বাস কি নিষ্ক্রিয়তাকে সমর্থন করে?

তাকদীরের সৌন্দর্য হল মানুষ তাদের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আ’লামিনের উপর ভরসা রাখতে পারে, যিনি সবকিছু সমন্ধে সম্যক অবগত । তাকদীরে বিশ্বাস মানুষের কাধ থেকে ভবিষ্যত নিয়ে ভাবনার বোঝাটি নামিয়ে দেয়।

মনে রাখবেন, আল্লাহ আমাদের জন্য যা প্রেরণ করেন তাতেই আমাদের মঙ্গল রয়েছে তা আমাদের বুঝে আসুক বা না আসুক। আল্লাহ বলেনঃ

আপনি বলুন, আমাদের কাছে তাই পৌঁছাবে যা আল্লাহ আমাদের জন্য নির্ধারণ করে রেখেছেন; তিনিই আমাদের কার্যনির্বাহক। আল্লাহর উপরই মুমিনদের ভরসা করা উচিত। (আল কুরআন – ৯:৫১)

মহাবিশ্ব এবং আল্লাহর সৃষ্টি সমূহকে বোঝার জন্য আল্লাহ আমাদেরকে বুদ্ধি দিয়েছেন এবং জীবনে চলার পথে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আল্লাহ আমাদেরকে একটি সহজাত নৈতিকবোধ বা বিবেক দিয়েছেন ।

এছাড়াও, আমাদেরকে একটি ত্রুটিহীন কিতাব দেওয়া হয়েছে যা আমাদেরকে সরাসরি সঠিক পথ প্রদর্শন করতে পারে এবং সেই কিতাবটি হল কুরআন।

আমরা ঐ ফসলই পাই যা আমাদের হাত রোপন করে। সৎকর্মগুলি বহুগুণ বর্ধিত হয়ে পুরস্কৃত হয় এবং এবং মন্দকর্মগুলি সঠিক বিচারের দ্বারা শাস্তিপ্রাপ্ত হয়।

আপনার জীবনকে নিয়তির কাছে ফেলে দেওয়া বোকামি, যখন আল্লাহ আমাদের জন্য এমন একটি পথ তৈরি করে দিয়েছেন যা আমাদেরকে কেবলমাত্র মুক্তির দিকে নিয়ে যায়।

এই কারণেই, সকল মুসলিমের উচিত নিজের সাধ্যের ভিতর সর্বোচ্চ চেষ্টা করা এবং ফলাফলের জন্য একমাত্র আল্লাহর ফয়সালার উপর নির্ভর করা। তাহলে এখন আপনারাই উত্তর দিন, আমরা কি জন্মগতভাবে ভাগ্যবান বা হতভাগা?