কেন অটিজম নিয়ে প্রাচ্যে কথা বলা জরুরি?

autism
ID 111568767 © Vetre Antanaviciute-meskauskiene | Dreamstime.com

বেশিরভাগ লোক অস্টিজমের সাথে ডাস্টিন হফম্যানের বহুল প্রশংসিত হলিউডের মুভি রেইন ম্যানকে গুলিয়ে ফেলে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে চলচিত্রটিতে অটিজমের একটি ভাল চরিত্রায়ন দেখালেও এটি যা দেখায় তা হল সমুদ্রের একটি পানির ফোটা মাত্র। বর্তমান সময়ে এই রোগটি নিয়ে অনেক কথাবার্তা হয়ে থাকে। কিন্তু এই রোগটি সেই প্রাচীনকাল থেকেই ছিল। অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি এই রোগে আক্রান্ত ছিলেন। দ্রুত বিকশিত রোগগুলোর মধ্যে এটি তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে।

অটিজম একটি ‘স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার’ হিসাবে পরিচিত। এটি মস্তিষ্কের এমন একটি ব্যাধি যা এর স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। প্রধানত এই রোগে মানুষের যোগাযোগ এবং সামাজিক দক্ষতাগুলো প্রভাবিত হয়। একটি শিশুর জন্মের পর থেকে এর লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে থাকে এবং সাধারণত বয়স আড়াই বছর হলে তা তীব্র আকার ধারণ করে। তখন সুস্পষ্টভাবে বুঝা যায় শিশুটি অটিজমে আক্রান্ত।

ভারতে অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে কাজ করা ইনস্টিটিউট ফর রেমিডিয়াল হস্তক্ষেপ পরিষেবা (আইআরআইএস) এর প্রতিষ্ঠাতা মাইথিলি চারি বলেছেন যে, “অটিজম আক্রান্ত একটি শিশু বন্ধু বানানো, আড্ডা দেয়া এবং অন্যের সাথে যোগাযোগ অসম্ভব মনে না করলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনেক কঠিন কাজ মনে করে। এমন কি দেখা যায় যে সে এগুলো করতে মোটেও পছন্দ করছে না।”
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, অটিজমে আক্রান্ত শিশুর পরিবারগুলো এটিকে মোকাবেলা করা কঠিন বলে মনে করে। প্রেম, স্নেহ, যত্ন, এবং সংবেদনশীলতা দিয়ে পিতা-মাতা হয়ে উঠতে পারে একটি অটিস্টিক শিশুর সবচাইতে বড় অবলম্বন। কিন্তু পিতামাতার জন্য এটা অনেক বড় একটা চ্যালেঞ্জ এবং আন্তরিকতার সাথে তাদেরকে এটা সামলাতে হবে।

অটিজম অন্যান্য ব্যাধি থেকে একেবারেই আলাদা। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় অটিজম আক্রান্ত শিশু এমন অনেক কাজ করতে পারে যা সাধারণ মানুষের পক্ষে ভাবা অসম্ভব। হয়তো তাদের বেশ কিছু বাধা রয়েছে যার কারণে তাদের পরিপূর্ণ মানসিক বিকাশ ঘটে না। কিন্তু কিছু কিছু দক্ষতা তারা ঈশ্বরের উপহার হিসেবে পেয়ে থাকে। অটিজমের নির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। পরিবেশগত ও বংশগত কারণে এই রোগ হতে পারে।মূলত জিনগত কারনে এ রোগ হতে পারে। এছাড়া বাচ্চা নেয়ার সময় বাবা বা মা এর বয়স বেশি হলে অটিজম হতে পারে।

অটিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের যোগাযোগের ক্ষেত্রে মূল সমস্যাটা হয়। তারা ঠিক ভাবে অন্য মানুষদের সাথে যোগাযোগ করতে পারে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা চুপচাপ থাকে এবং অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে তাদের মনোভাব প্রকাশ করে। তাদের সমবয়সীদের সাথে সম্পর্ক শুরু করতে এবং তা বজায় রাখতে তাদের জন্য অসুবিধাজনক হয়। এমন নয় যে কি তারা বন্ধু বানাতে চায় না। ব্যাপারটা হলো তারা জানেই না এটা কিভাবে তারা করবে।

বাবা-মা যখন তার সন্তানের মধ্যে এই ধরনের অস্বাভাবিকতা দেখেন তখন তারা মনে করেন তাদের সন্তান হয়তো প্রতিবন্ধী। কিন্তু ব্যাপারটা মোটেও তা নয়। প্রতিবন্ধী শিশু এবং অটিজম আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। বাবা মারা বুঝতে পারেন না তারা তাদের সন্তানদেরকে নিয়ে কী করবেন। এই প্রসঙ্গে বিখ্যাত চিকিতসক চারি বলেছিলেন, “একজন বাবা-মা তাদের সন্তানকে কেবল শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যেতে পারেন। সেখান থেকে তারা শুধু এই আশ্বাস নিয়ে ফিরতে পারেন যে তাদের সন্তান সামাজিক গুণাবলী অর্জনে একটু ধীর। কিন্তু এর আসল চিকিৎসা হল বাবা মার স্নেহ ও ভালোবাসা। সঠিক পরিচর্যা পেলে সমাজে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।”

উই ক্যান ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক গীতা শ্রীকান্ত বলেছেন, “এই পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।  কেননা অটিজম আক্রান্ত শিশু সারা জীবনই এই ধরনের বাধাগুলোকে বয়ে নিয়ে যাবে। কিন্তু সচেতনতা থাকলে এই সমস্যা নিয়েও শিশুটি সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে পারবে।”
পরিশেষে বলা যায় যে, পরিমিত পরিচর্যা, স্কুল ভিত্তিক প্রশিক্ষণ, সঠিক স্বাস্থ্য সেবা এবং প্রয়োজনে সঠিক ওষুধের ব্যবহারের মাধ্যমে শিশুর অটিজমের সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। এক্ষেত্রে বাবা মায়ের ভূমিকাই মুখ্য।