কেন জ্ঞানের বাতিঘরে পরিণত হয়েছিল মরক্কোর ফেজ শহর?

fes city
A man looking through the window of Kairouan university in Fez, Morocco. The mosque of Al-Karaouine was founded by Fatima al-Fihri in 859 with an associated mosque school or madrasa, which has also been referred to as a university. It has been and continues to be one of the leading spiritual and educational centers of the Muslim world. It became a state university in 1963. ID 27739326 © Lukasz Kasperek | Dreamstime.com

ফেজ শহর হল মুসলিম উৎকর্ষতার প্রতীক। উত্তর-পূর্ব মরক্কোর এই শহরকে দেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী বললে অত্যুক্তি হয় না।

যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি মুসলিম সভ্যতাকে গৌরবময় করে তুলেছিল তা হল: পরিপূর্ণতার সন্ধান। এই অনুসন্ধানের ফল হল মুসলিম বিজ্ঞান, শিল্প এবং সাহিত্যের সাফল্য। এমন বহু কৃতিত্বের নজির কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে, তবে ফেস শহরে এখনও এই চিহ্নগুলি দেখা যায়। এই শহরটিকে মুসলিম গৌরবের সংগ্রহশালা বলা যায়, এবং তার নজির বিভিন্ন ভবন ও শহরের নানা সম্পদের ছবিতে স্পষ্ট।

ফেজ শহর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল নবম শতকের গোড়ার দিকে, ইদ্রিসিদ সাম্রাজ্যের হাত ধরে। শাসক প্রথম আল-হাকেম-এর নিপীড়ন থেকে বাঁচার জন্য করডোবার স্পেনীয় মুসলমান-সহ স্পেনের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী, বর্বর, ইহুদি, আরবরা এখানে এসে বসতি স্থাপন করে। এই সময়েই এই শহরটি আকারে বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং তার সাংস্কৃতিক গুরুত্ব বহু গুণ বেড়ে গেছিল। উপলভ্য বিভিন্ন তথ্য থেকে প্রমাণ মিলেছে যে, সেই সময়ে ফেজে শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

ফেজ শহরের সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতীক হল কাররাওউইন (Qarrawwiyin) মসজিদ বিশ্ববিদ্যালয়। আল-কাররাওউইন প্রথম ৮৫৯ সালে নির্মীত হয়েছিল, এবং ক্রমে মরক্কোয় উচ্চশিক্ষার মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। এটি বিশ্বের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্ববিদ্যালয়, যা আজ তার কার্যক্রম চালু রেখেছে। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এক শিক্ষানুরাগী বিদুষী নারী, ফাতিমা আল-ফিহরি। 

আল-কাররাওউইনে ব্যাকরণ, অলঙ্কারশাস্ত্র, যুক্তি, গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যা, এবং সম্ভবত ইতিহাস, ভূগোল এবং রসায়নের উপাদান সম্পর্কেও পড়ানো হত। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি মূলত রাজপরিবার দ্বারা পরিচালিত হত।

মাগরীব, সাহারা এমনকী ইউরোপ থেকেও শিক্ষার্থীরা এখানে শিক্ষাগ্রহণ করতে আসত। শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক ভবনে থাকার বন্দোবস্ত ছিল, সেখানে ষাট থেকে দেড় শতাধিক শিক্ষার্থীর থাকার ব্যবস্থা ছিল। কাররাওউইনে তিনটি পৃথক গ্রন্থাগার ছিল, যার মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ছিল আবু ইনান গ্রন্থাগার, এটি ইলমিয়া গ্রন্থাগার নামেও পরিচিত। এর মূল ভবনটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে। মেরিনিড সুলতান দ্বারা প্রতিষ্ঠিত আল-মুতাওয়াক্কিল আবু ইনান গ্রন্থাগারটি ১৩৪৯ সালে শিক্ষার্থী এবং সাধারণ জনগণের জন্য খুলে দেওয়ার হয়েছিল। বিদ্বান সুলতান তার নতুন প্রতিষ্ঠিত এই গ্রন্থাগারে বইয়ের সম্ভারে ধর্ম, বিজ্ঞান, সাহিত্য এবং ভাষার মতো বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। এই গ্রন্থাগারের দায়িত্ব সামলানোর জন্য একজন গ্রন্থাগারিককেও নিযুক্ত করেছিলেন সুলতান। ফেজে মেরেনিডরা আরও বেশ কয়েকটি মাদ্রাসা (স্কুল) নির্মাণ করেছিল। ফলে শিক্ষার দিক দিয়ে এই শহর সমকালীন অন্যান্য শহরের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে ছিল, বলা যেতে পারে। 

তবে, দ্বাদশ শতাব্দীতে আলমোহাদদের শাসনামলে, ফেজ  শহরের সাংস্কৃতিক, সাহিত্যিক এবং বাণিজ্যিক বিকাশ শীর্ষে পৌঁছয়। আল-মনসুর ও তাঁর অনুসারীদের রাজত্বকালে ফেজ শহরে ৭৮৫ মসজিদ ছিল। বর্তমানে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫০-তে। ঐতিহাসিকদের লেখনীতে, ফেজ শহরে কাগজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন দ্রব্যের কারখানা, দোকান, বিভিন্ন শস্যকল, উন্নত বাজার এমনকি সৌন্দর্যয়নের জন্য ফোয়ারা এবং জনসাধারণের জন্য স্নানগারের উল্লেখ পাওয়া গিয়েছে।   

ফেজে পড়াশোনা এবং বৃত্তি ছিল কাররাওউইন মসজিদের প্রতীকী। আল-কাররাওউইন মসজিদ বিশ্ববিদ্যালয়টি ভূমধ্যসাগর এবং ইউরোপ, উভয়ের উপরেই শিক্ষা ক্ষেত্রে দুর্দান্ত প্রভাব ফেলেছিল। দ্বাদশ শতাব্দীর প্রথম থেকে এখনও পর্যন্ত, শিক্ষক হিসেবে এখানে যে বিদ্বান (উলেমা)-রা পড়াতেন, তাঁরাই ছিলেন কাররাওউইন-এর ‘গৌরব’। সেখানে প্রথমে শিক্ষাগ্রহণ ও পরবর্তীকালে শিক্ষাদান করেছিলেন এমন বিদ্বানদের মধ্যে রয়েছেন, ইবন খালদুন, ইবন আল-খাতিব, আল-বিত্রুজি, ইবন হারাজিম, ইবন মায়মুন এবং ইবন ওয়াজান। তবে ফেজের সবচেয়ে বিখ্যাত বিদ্বান ছিলেন গণিতবিদ ইবন আল বান্না, বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তাঁর বিভিন্ন অবদান অনস্বীকার্য।

আবুল-আব্বাস-আহমেদ ইবন মহম্মদ ইবন উথমান আল-আজদি, যিনি ইবন আল-বান্না নামেও পরিচিত ছিলেন, তিনি ১২৫২ সালে মারাকেচ শহরে একজন স্থপতির পুত্র হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ইবন আল-বান্না জ্যামিতি, ভগ্নাংশ নিয়ে অধ্যয়ন করেছিলেন এবং পূর্ববর্তী ৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মুসলমানরা গণিতে যে বিশাল অবদান রেখেছিল তার অনেকটাই আয়ত্ত করেছিলেন। ফেসের বিশ্ববিদ্যালয়ে  আল-বান্না গণিতের সমস্ত শাখা সম্পর্কে শিক্ষাদান করতেন, যার মধ্যে পাটিগণিত, বীজগণিত, জ্যামিতি এবং জ্যোতির্বিদ্যা অন্তর্ভুক্ত ছিল। 

আল-বান্নার অধিকাংশ রচনাই গণিত এবং জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত। এছাড়াও ভাষাবিজ্ঞান, অলঙ্কারশাস্ত্র, জ্যোতিষশাস্ত্র, ব্যাকরণ ও লজিকের মতো বহু বিষয়ে তাঁর দখল ছিল। 

আল-বান্নার বিখ্যাত রচনাগুলি হল তালখিস আমাল আল-হিসাব এবং রাফ আল-হিজাব উল্লেখ্য, এগুলি হল তালখিস সংক্রান্ত আল-বান্নার নিজস্ব ভাষ্য। তালখিসের বৈশিষ্ট্য ছিল, বর্গ এবং কিউব-এর হিসেব। এখানে আল-বান্না কিছু গাণিতিক চিহ্নের প্রয়োগ করেছিলেন, যার জন্য অনেকেই মনে করেন যে, ইসলামে বীজগণিত সিম্বলিজম-এর উদ্ভব হয়েছিল ইবন আল-বান্না এবং আল-কালাসাদির হাত ধরে। 

সম্ভবত, আল-বান্নাই প্রথম মনে করেছিলেন যে দুটি সংখ্যার মধ্যে অনুপাত হিসাবে একটি ভগ্নাংশকে বিবেচনা করা যেতে পারে এবং তাঁর কিতাব আল-মানখ এর মধ্যে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং আবহাওয়া সম্পর্কিত তথ্য অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন, যার তাঁর আগে আর কেউ করেননি বলেই মনে করা হয়।