কেন প্রিয় কন্যা জেবউন্নিসাকে জীবনের শেষ পর্যন্ত বন্দি করে রেখেছিলেন আলমগীর?

mural
Dhaka University Fine Arts FFA student painted a mural. Photo 104121672 © - Dreamstime.com

মুঘল রাজপরিবারের বহু মহিলাই লোকচক্ষুর আড়ালে রয়ে গিয়েছেন। কিন্তু যে কয়েক জন নিজের স্বাধীন পরিচয় গড়ে তুলতে পেরেছিলেন, তাঁদের একজন হলেন শাহাজাদী জেব-উন-নিসা  বা জেবউন্নিসা (১৬৩৮-১৭০২ খ্রিস্টাব্দ)তিনি ছিলেন বাদশাহ আওরঙ্গজেবের জ্যেষ্ঠ কন্যা। চিরাচরিত ইতিহাসে জেবউন্নিসা-কে নিয়ে বিশেষ কিছু জানা যায় না। তাঁর সম্পর্কে সর্বজনবিদিত তথ্যটি হল, জীবনের শেষ ২০ বছর, প্রতিবাদী সুফি কবি হিসেবে পরিচিত এই শাহাজাদী কাটিয়েছিলেন দিল্লির লালদুর্গের অন্তর্ভুক্ত সেলিমগড় প্রাসাদে, নিজের পিতার বন্দি হিসেবে। 

ছেলেবেলা

ছোটবেলা থেকেই নিজের অনন্য মেধার পরিচয় দিয়েছিলেন শাহাজাদী জেবউন্নিসা। মাত্র তিন বছরে সমগ্র কুরআন মুখস্থ করে সাত বছর বয়সেই তিনি হাফিজা-য় পরিণত হয়েছিলেন। সেই আনন্দে বাদশাহ আওরঙ্গজেব সমগ্র সাম্রাজ্যে দুই দিনের ছুটি ঘোষণার পাশাপাশি তাঁর কন্যার শিক্ষিকাকে ৩০ হাজার স্বর্ণমুদ্রা পুরস্কার হিসেবে দান করেছিলেন। ছোট্ট জেবউন্নিসাকেও তিনি ৩০ হাজার স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে পুরস্কৃত করেছিলেন। 

শৈশব থেকেই বিদ্যানুরাগী জেবউন্নিসা বড় হয়ে পরিণত হয়েছিলেন স্বাধীনচেতা নারী-তে। তিনি কবিতা লিখতে পছন্দ করতেন, মাকফি (অর্থ, যে লুকিয়ে রয়েছে) ছদ্মনামে তিনি বহু কবিতা লিখেছিলেন জেবউন্নিসার বিভিন্ন লেখনী-তে তাঁর স্বাধীনচেতা মনোভাবের স্পষ্ট ছাপ দেখা যায়। শাহাজাদীর মৃত্যুর পরে তাঁর বেশ কিছু লেখা সংগ্রহ করে একটি সংকলন প্রকাশ করা হয়েছিল, যার নাম দিওয়ান-ই-মাকফি। এই বইতে প্রকাশিত ৪২১টি গজলই জেবউন্নিসার লেখা। তিনি নিজে সুগায়িকাও ছিলেন। এছাড়া মনিস-উল-রোহ, জেব-উল-মোনশা এবং জেব-উল-তাফাসির নামের বইগুলির রচয়িতাও তিনি ছিলেন।

অনন্য মেধার অধিকারী

জানা যায়, মাত্র ১৪ বছর বয়স থেকেই বহু ফার্সি কবিতা আবৃত্তি করতে পারতেন জেবউন্নিসা। তাঁর শিক্ষক-শিক্ষিকারাও কবিতার প্রতি শাহাজাদীর আগ্রহ দেখে তাঁকে আরও উৎসাহ দিতেন। শুধু কবিতা-ই নয়, দর্শন, গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যাতেও তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। বিভিন্ন ভাষাশিক্ষায় আগ্রহী জেবউন্নিসা দক্ষ ছিলেন ফার্সি, আরবি এবং ঊর্দুতে। নিজের পিতার মতো তিনিও দক্ষ ছিলেন ক্যালিগ্রাফি-তে।

ইতিহাস বলে, তাঁর একটি নিজস্ব কুতুবখানা ছিল। শুধু কবিতার বই-ই নয়, জেবউন্নিসার কুতুবখানায় ছিল আইন থেকে শুরু করে সাহিত্য, ইতিহাস ও ধর্মবিদ্যার নানা ধরনের পাণ্ডুলিপি। তাঁর লেখা বহু গজলের পাণ্ডুলিপি ছিল এই কুতুবখানায়। তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা পাণ্ডুলিপির সম্ভার অন্য যে কোনও বিখ্যাত গ্রন্থাগারকে টেক্কা দেওয়ার ক্ষমতা রাখত। সেই আমলের বেশ কয়েক জন বিদ্বান ব্যক্তিকে প্রচুর বেতন দিয়ে জেবউন্নিসা নিজের কুতুবখানায় নিয়োগ করেছিলেন। 

তাঁর গ্রন্থাগার

নিজের জ্যেষ্ঠ কন্যাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন আলমগীর। কোমল মনের অধিকারী জেবউন্নিসা ছিলেন অত্যন্ত দরদী। কারও আচরণে বা কাজে ক্ষুব্ধ বাদশাহ কড়া শাস্তির নিদান দিলেও বহু ক্ষেত্রে প্রিয় কন্যার অনুনয় রক্ষা করতে সেই সাজা মকুব করেছিলেন। গাছের প্রতিও গভীর ভালোবাসা ছিল জেবউন্নিসার। লালকেল্লা সংলগ্ন বিশাল বাগানে বহু গাছ নিজে হাতে রোপণ করেছিলেন তিনি। পরে, যখন লাহোরে থাকতে শুরু করেন তখনও নিজের প্রাসাদের সামনের বাগান তৈরি করেছিলেন তিনি। বাস্তবের রূঢ় আঘাত থেকে বাঁচতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেই বাগানেই প্রিয় গাছেদের সাথে সময় কাটাতেন শাহাজাদী। 

বেশ কিছু লেখনি থেকে জানা যায়, লালকেল্লার কোনও এক অংশে একটি গুপ্ত গ্রন্থাগার ছিল। সেই গুপ্ত গ্রন্থাগারে আলমগীরের নজর এড়িয়ে কবিসভার আয়োজন করা হত। সেই আমলের খ্যাতনামা কবিরা, যেমন – ঘানি কাশ্মিরী, নইমাতুল্লাহ খান এবং আকিল খান (ওরফে রাজি) প্রমুখ সেই কবিসভাগুলিতে অংশগ্রহণ করতেন। জানা যায়, জেবউন্নিসা-ও এই ধরনের গুপ্ত কবিসভায় নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন।

করুণ পরিণতি

ধর্মীয় ভাবনায় পিতা আওরঙ্গজেবের তুলনায়, পিতার জ্যেষ্ঠভ্রাতা দারাশিকোর সাথে অনেক বেশি মিল ছিল জেবউন্নিসার, কারণ দুজনেই বিশ্বাসী ছিলেন সুফিবাদে। বাদশাহ শাহজাহানের ইচ্ছানুসারে, দারাশিকোর জ্যেষ্ঠপুত্র সুলেমান শিকো-র বাগদত্তা ছিলেন জেবউন্নিসা। তবে শাহজাহানের মৃত্যুর পরে দারাশিকো-কে হত্যা করে আওরঙ্গজেব যখন দিল্লির মসনদ দখল করেন, তখন তিনি হত্যা করেছিলেন কন্যার হবু স্বামী সুলেমান-কেও। অনেকে আবার মনে করেন, ধর্মীয় বিষয়ে আওরঙ্গজেব ছিলেন বিশুদ্ধাচারী, অপর দিকে জেবউন্নিসা বেছে নিয়েছিলেন সুফিবাদ। এটিও ছিল পিতা-কন্যার সম্পর্কে অবনতির অপর একটি কারণ। 

দারাশিকো এবং সুলেমান শিকো-র মৃত্যুর খবর পেয়ে জেবউন্নিসা দিল্লির প্রাসাদ ত্যাগ করে চলে যান লাহোরে। সেখানে বেশ কয়েক বছর বসবাস করার সময় তিনি প্রেমে পড়েন লাহোরের গভর্নর আকিল খানের। কিন্তু কন্যার এই সম্পর্ক মেনে নেননি আলমগীর। জেবউন্নিসার চোখের সামনেই নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করা হয়েছিল তাঁর প্রেমিককে। সেই ঘটনার পরেই, ১৬৮১ সালে দিল্লিতে নিয়ে এসে বন্দি করে রাখা হয়েছিল শাহাজাদী-কে। ১৭০২ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুই মুক্তি দিয়েছিল তাঁকে।