কেন বিখ্যাত ছিলেন স্পেনের গণিতবিদ কালাসাদি?

mathematics

বীজগণিতের জগতের উজ্জ্বলতম নক্ষত্রদের মধ্যে স্পেনের কালাসাদি অন্যতম। গ্রীসের ডিওফেনটাস ভারতের ব্রহ্মগুপ্ত বীজগণিতের প্রাথমিক ব্যবহার শুরু করার প্রায় এক হাজার পরে স্পেনের আন্দালুসিয়ার আবু হাসান ইবন আলি আল কালাসাদি একে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যায়।

বর্তমান বীজগণিতে আমরা যে অসংখ্য গাণিতিক চিহ্ন দেখি তার বেশ কিছু কালাসাদির হাত ধরেই এসেছে। ১৪১২ খ্রীস্টাব্দে গ্রানাডার কাছে একটা ছোট শহরে জন্মেছিলেন তিনি। ২৪ বছর বয়স পর্যন্ত ইসলামী রীতিনীতি নিয়ে পড়াশোনা করার পর কালাসাদি উত্তর আফ্রিকা ভ্রমণে বেরোন। প্রায় পনেরো বছর ধরে ঘুরে বহু জ্ঞানী পন্ডিতদের সাথে পরিচয় হয় তাঁর। এঁদের মধ্যে একজন ছিলেন প্রখ্যাত হাদিসবিদ ইবন হাজার আলআসকালানি। মিশরে থাকাকালীন এনার সান্নিধ্য কালাসাদিকে জ্ঞানার্জনের আরও সুযোগ দেয়। এরপর তিনি ফিরে আসেন স্পেনে এবং গ্রানাডাতেই নিজের জ্ঞানচর্চা জারি রাখেন, প্রধান বিষয় হিসাবে রাখেন গণিত, দর্শন আইন।

গণিতশাস্ত্রে কালাসাদির পান্ডিত্য ছিল অগাধ, লিখেছেন ১১টি গবেষণাপত্র। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোতফসির ফিল ইলম আলহিসাবঅর্থাৎপাটিগণিত এবং তার পিছনে থাকা বিজ্ঞানের উপর মন্তব্য।এই গবেষণাপত্রতে কালাসাদি নিয়ে আসেন নয়া বেশ কিছু বীজগাণিতিক চিহ্ন। প্রাথমিক বীজগণিতের চিহ্নকে পিছনে ফেলে উন্নততর কিছু উপস্থাপন করেন। এক্ষেত্রে জেনে রাখা ভালো যে কালাসাদি ইতিহাসে প্রথম যিনি একাধিক নতুন চিহ্ন আবিষ্কারও করেছেন এবং গাণিতিক পদ্ধতিতে তার সঠিক ব্যবহারও শিখিয়েছেন। 

তিনি প্রথমচিহ্নটিকে সমান চিহ্ন (=) হিসাবে ব্যবহার করেন। আরবী কে বর্গমান হিসাবে ব্যবহার করেন এবং আরবী কে ঘনমান বোঝাতে ব্যবহার করেন। এছাড়াও গাণিতিক বিভিন্ন আরবী প্রতিশব্দও তৈরি করেন কালাসাদি, ‘ওয়াশব্দটি যোগের ক্ষেত্রে, ‘ইল্লাবিয়োগ, ‘ফিগুণ এবংআলাশব্দটি ভাগের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেন। 

কালাসাদির কর্মকান্ড এখানেই শেষ হয় না। কলনবিদ্যা বা ক্যালকুলাসের জগতেও তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। বহুলপ্রচলিত সাক্সেসিভ অ্যাপ্রোক্সিমেশন পদ্ধতি তিনিই প্রচলন করে এবং এর দ্বারা তিনি একটি অসমান বর্গের বীজ নির্ণয় করেন। 

গণিতবিদ হলেও কালাসাদি সাহিত্য এবং শিল্পকেও গুরুতাব দিয়েছেন জীবনে। এমনকে তিনি বীজগণিতের নিয়মকে কবিতার মধ্যে লিখে আস্ত একটা বইও রচনা করেছেন। এছাড়া তিনি ব্যকরণ এবং ভাষার উপর নয়টি এবং ইসলামী আইনশাস্ত্র মহানবী মুহম্মদ (সাঃ)-এর সংস্কৃতি নিয়ে এগারোটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। 

কালাসাদির জীবন এবং গবেষণায় সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো তিনি সবচেয়ে গভীরে যা পড়াশোনা করেছেন তা হলো কোরআন। সেখান থেকে তাঁর জ্ঞানের মহিমা অন্যদিক ছড়িয়েছে। কিন্তু মুসলিম জাতির চিরাচরিত বিশ্বাস যে কেউ ধর্মচর্চা শুরু করলে তার অন্য কিছু আর করা হয় না, বলা যেতে পারে ধর্মচর্চা মানুষকে একরকম বাইরের বিশাল জগৎ থেকে আলাদা করে দেয়। 

কালাসাদি প্রমাণ করে গেছেন, ধর্ম নিয়ে সারাটা জীবন গবেষণা করলেও তা অন্যান্য বিষয়ে কাজ করায় কোনো বাধা সৃষ্টি করে না উল্টে সাহায্য করে।