কেন মুখে দিলেই গলে যায় গলৌটি কাবাব?

peshwari kebab

ভারতের উত্তরপ্রদেশের রাজধানী শহর লখনউ আজও নবাবি সাম্রাজ্যের ঐতিহ্যকে রন্ধ্রে রন্ধ্রে বয়ে নিয়ে চলেছে। স্থাপত্য-শিল্প-ভাস্কর্য এমনকী রসনাশিল্পেও নবাবী মেজাজের ঝাঁজ আর শাহী মশলার সুগন্ধ দুইই বর্তমান। লখনউ শহরকে আজও ঐতিহাসিকেরা চিহ্নিত করে থাকেন ‘City of Nawabs and Kababs’  এই নামে। এই শহরের অলিগলিতে মিশে রয়েছে রকমারি কাবাবের সুগন্ধ… এই শহরের গলিগুঁজি যেন ভোজনরসিকদের সেরা ঠিকানা।

কাবাবের জন্মস্থান

পশ্চিম ও মধ্য এশিয়ার ঐতিহ্যবাহী খাবার হল কাবাব। শোনা যায় পারস্য শব্দ কম ও আব অর্থাৎ ‘কমপানি’ থেকে কাবাবের জন্ম। কাবাব তৈরিতে পানি লাগে না বলেই হয়তো এমন নামকরণ। মরোক্কান পরিব্রাজক ইবন বতুতার লেখাতেও এই কাবারের উল্লেখ পাওয়া যায়। জানা যায় মোঘল সম্রাটদের পছন্দের খাবারের তালিকাতে ছিল কাবাব এবং আফগান রাঁধুনিরা অত্যন্ত যত্ন সহকারেই কাবাব রান্না করে সম্রাটদের পরিবেশন করতেন। 

কাবারের কথা বলতে বলতে আমাদের অবশ্যই উল্লেখ করতে হয় বেশ কিছু বাহারি পদের কাবাবের নাম যেমন- শামি কাবাব, হরিয়ালি কাবাব, টিক্কা কাবাব, সুলতি কাবাব, পাত্থর কে কাবাব এবং অন্যান্য আরও অনেক। তবে লখনউয়ের রাস্তায় খাবারের সন্ধানে বেরোলে বিশেষ করে আপনি যদি কাবাবের সন্ধান করে থাকেন তাহলে অবশ্যই জনপ্রিয় এবং লোকপ্রিয় খাবারের তালিকাতে পাবেন গলৌটি কাবাব এবং তুন্ডাই কাবাবের নাম। গলৌটি কাবাবের জনপ্রিয়তা এখন নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। কম-বেশি সব রেস্তোরাঁতেই এই পদটি পাওয়া যায়। তবে লখনউয়ের রাস্তা ঘুরে ঘুরে এই খাবারটি চেখে দেখবার আনন্দই আলাদাই। 

গলে যাওয়ার আনন্দ

উর্দূ শব্দ ‘গলাওয়াত’ থেকে গলৌটি কথাটি এসেছে। কথাটির অর্থ Fusion বা মিশ্রণ বা যা নিমেশেই গলে যাওয়া। আমরা যারা গলৌটি কাবাব খেয়েছি তারা দেখেছি যে এই কাবাব এতটাই নরম এবং সুস্বাদু যে মুখে দেওয়া মাত্রই গলে যায়। এর কারণ হল এক্ষেত্রে কাবার তৈরিতে মাংসের টুকরো সরাসরি ব্যবহার করা হয় না। বরং মাংসটিকে ভাল করে বিভিন্ন মশলা সহযোগে মিশিয়ে মসৃণ পেস্ট তৈরি করে কাবাব বানানোর প্রক্রিয়া মেনে চলা হয়। গলৌটি কাবাবের এমন ভিন্নতর উপকরণ প্রণালী এবং রন্ধন প্রক্রিয়ার মূলেও রয়েছে একটা আস্ত ইতিহাস। 

লখনউয়ের অলিগলিতে বিশেষ করে হজরতগঞ্জ কিংবা কাইজ়ারবাগের বনেদি মোঘলাই খাবারের তত্ত্বতালাশ করতে বেরোলে বোধহয় এর সূত্রটি খুঁজে পাওয়া যাবে। মোটামুটিভাবে গল্পের কাঠামো কিছুটা এরকম। অষ্টাদশ শতকের শেষভাগ থেকে মোঘল সাম্রাজ্যের ক্ষয় শুরু হয়। সেই সময়ে আওয়াদ হয়ে ওঠে এক অন্যতম সমৃদ্ধশালী রাজ্য। এই রাজ্যেরই রাজধানী শহর লখনউ। ঐতিহাসিকদের মতে সুজা উদ দৌল্লা এর পুত্র আসাদ-উদ-দৌল্লা ১৭৭৫ সালে আওয়াদের সিংহাসনে বসলে রাজধানী ফৈজাবাদ থেকে লখনউতে স্থানান্তরিত হয়। তিনি লখনউয়ের স্থাপত্য-শিল্পের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন।

ঐতিহাসিক নরম কাবাব তৈরি

তাঁর আমলেই তৈরি হয় বড় ইমামবাড়া, আসফি মসজিদ। ৬০ ফুট উঁচু রুমি দরওয়াজা ইস্তানবুলের বাব-ই-হুমায়ুনের আদল অনুসরণ করে তৈরি করা হয়েছিল। শিল্পরসিকের পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন খাদ্যরসিকও… আর এখান থেকেই গল্পের আসল শুরু। তাঁর সময়ে কিংবদন্তি শেফ ছিলেন হাজি মুহম্মদ ফকর-এ-আলম। জনশ্রুতি অনুসারে নবাব আসাদ-উদ্-দৌল্লার দাঁত তেমন পোক্ত ছিল না। মাংস খেতে তাঁর যথেষ্টই সমস্যা হচ্ছিল, অথচ মাংস খাবারের তালিকাতে না থাকলে নিতান্তই সমস্যাজনক, কাজেই সেই সমস্যারও একপ্রকার সমাধান পাওয়া গেল শেফের উদ্যোগে। তিনিই প্রথম কাবার তৈরির মাংস দিয়ে কিমা প্রস্তুত করলেন, প্রায় ১৫০ রকমের মশলা এবং কাঁচা পেঁপের রস মিশিয়ে সেই মিশ্রণ দিয়ে তৈরি করলেন নতুন একধরনের নরম, সুস্বাদু কাবাব- যা মুখে দিলে অনায়াসেই গলে যায়… এই থেকেই এর নাম হয়ে গেল গলৌটি কাবাব। নবাব বাবুর্চির রন্ধনশিল্পে রীতিমতো মুগ্ধ হন। প্রতিদিনের খাবারের তালিকাতে জুড়ে যায় এই পদটির নাম। পরে অবশ্য ওয়াজেদ আলি শাহও এই কাবাবের ভক্ত ছিলেন।

(পাঠকদের মধ্যে যারা এরপরে আওয়াদি খাবার রেস্তোরাঁ বা খাস লখনউতে বসেই চেখে দেখতে চাইবেন তারা এই কাবাবটি খেতে ভুলবেন না যেন!)