কেন মোঘল সাম্রাজ্যের শক্তিকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল ফতেপুর সিকরি?

fatehpur sikri
Fatehpur Sikri - Courtyard Palace with TombsPhoto 31913705 © - Dreamstime.com

মধ্যযুগে ভারতবর্ষে বেশ কিছু শহর গড়ে উঠেছিল। এক্ষেত্রে ইসলামি শাসকদের ভূমিকা অবশ্য উল্লেখ্য। মনে রাখা প্রয়োজন ‘শহর’ শব্দটি একটি ফারসি শব্দ। আর তাছাড়া মধ্যযুগে আমরা যে সকল শহরের উল্লেখ পেয়ে থাকি তাদের বেশিরভাগই ছিল এক একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যনগরী। মধ্যযুগে রাজধানীকে কেন্দ্র করেও শহর গড়ে উঠত। সুলতান এবং বাদশাগণ অনেক সময় নতুন নতুন রাজধানী শহর তৈরি করেও থাকতেন। সুলতান মহম্মদ বিন তুঘলক দিল্লি থেকে দৌলতাবাদে রাজধানী স্থানান্তরিত করেছিলেন। মোঘল আমলে আমরা দেখতে পাব আগ্রা, ফতেপুর সিকরি, শাহাজাহানাবাদ প্রভৃতি শহর গড়ে ওঠে। সুলতানি আমলে ভারতের প্রধান শাসনকেন্দ্র ছিল দিল্লি। তাই ভারতের সুলতানি শাসনকে ‘দিল্লি সুলতানি’ বলা হত। তবে সুলতানি আমলের প্রথম দিল্লি বা কুতুবদিল্লি পরবর্তীকালে পুরনো দিল্লি নামে পরিচিতি পায়।

ঐতিহাসিক বিভিন্ন তথ্য এবং তত্ত্বের নিরিখে জানা যায় পুরনো দিল্লির ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়েছিল। রয়েছে তার বেশ কিছু কারণ। এক, সুলতানদের পরবর্তীকালে মোঘল শাসকগণ দিল্লি থেকে বিভিন্ন জায়গায় রাজধানী স্থানান্তরিত করেছিল। দিল্লি থেকে রাজধানী স্থানান্তরকরণের বেশ কিছু কারণও ছিল। দিল্লি শহর গড়ে উঠেছিল আরাবল্লি শৈলশিরার এক প্রান্তে। আরাবল্লির পাথুরে এলাকাতে ছিল জলের সমস্যা। দিল্লির জনসংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছিল। বিশেষত বাগদাদের অবক্ষয়ের পরে মধ্য ও পশ্চিম এশিয়া থেকে অনেক লোক এসে দিল্লিতে স্থায়িভাবে থাকতে শুরু করে। ফলে জলের সমস্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকছিল। বর্ষার জল ধরে রাখার মাধ্যমেও সেই সংকট পূরণ করা যায়নি। সুলতানরা কয়েকটি হৌজ বা পুকুর খনন করলেও তা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট কম। তাই মোঘল আমলে দিল্লির পরিবর্তে আগ্রা, ফতেপুর সিকরি, শাহজাহানাবাদ রাজধানীর মর্যাদা লাভ করেছিল। 

মোঘল আমলে এই প্রত্যেকটি শহরই ছিল বিশেষভাবে সুরক্ষিত, প্রায়-দুর্ভেদ্য দুর্গনগরী অথবা শাসনকেন্দ্র। ষোড়শ শতকে বিশেষত আকবরের শাসনামলে এই শহরগুলোর ঐতিহ্য এবং গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। শেখ সেলিম চিশতির স্মৃতিধন্য সিকরি গ্রামে সম্রাট আকবর তৈরি করেন নতুন রাজধানী ফতেপুর। উত্তরপ্রদেশের আগ্রা জেলার একটি শহরই হল ফতেহপুর। এই প্রসঙ্গে অবশ্য উল্লেখ আগ্রা দুর্গশহর হলেও এই শহরের গুরুত্ব কিন্তু কখনওই কমে যায়নি। সম্রাট বাবরও ফতেপুর সিকরি খুব পছন্দ করতেন। তার সৈন্যেরা এখানকার শুকরি ঝিলের জল ব্যবহার করতেন তাই বাবর জায়গাটির নাম দিয়েছিলেন শুকরি। বাবর সিকরিকে বিনোদনের জন্য ব্যবহার করতেন এবং এর সীমান্ত-অঞ্চলে মহারানা সংগ্রাম সিংহকে পরাজিত করেছিলেন। 

অ্যানেট বেভারিজ-এর বাবরনামা-র অনুবাদ থেকে জানা যায়, বাবর সিকরিকে শুকরি বলতেন। তার স্মৃতিচারণাতে বাবর লিখেছেন, তিনি রাণা সংগ্রাম সিংকে পরাজিত করার পরে এখানে ‘বিজয়ের উদ্যান’ নামে এক বাগান বানিয়েছিলেন। গুলবদন বেগমের হুমায়ুননামা-তে লেখা আছে, বাবর সেই বাগানে একটি আটকোণা চাতাল বানিয়েছিলেন যা তিনি বিনোদন ও লেখার জন্যে ব্যবহার করতেন। একটি নিকটবর্তী ঝিলের মাঝখানে তিনি একটি বেদী নির্মাণ করেন। হিরণ মিনার থেকে এক কিমি দূরে একটি পাথরের চড়াই ছিল যার তলায় বাওলি ছিল। এখানে একটি পাথরের ফলকে খোদাঈ করা ছিল বাবরের বিজয়ের ইতিহাস।

১৫৬৯ সালে সিকরিতে জাহাঙ্গীরের জন্মের আগে পর্যন্ত আকবর নিঃসন্তান ছিলেন এবং এর পরে সন্ত শেখ সেলিম চিশতি জাহাঙ্গীরের জন্মের সফল ভবিষ্যদ্বাণী করলে তার সম্মানার্থে একটি ধর্মীয় প্রাঙ্গণ নির্মাণ করেন। জাহাঙ্গীরের দু’বছর পূর্ণ হওয়ার পরে তার সহনশক্তি পরীক্ষা করার জন্য আকবর প্রাচীর-ঘেরা শহর ও প্রাসাদ নির্মাণ শুরু করেন। শেখ সেলিমের খানকাতে নিজের রাজধানী স্থাপন করে আকবর নিজেকে এবং নিজের রাজ্যকে সুফি রীতি-নীতির অন্তর্ভুক্ত করেন। 

জলের অভাবে আকবর ফতেপুর সিকরি ছেড়ে লাহোর চলে যান। সময়টা ১৫৮৫ সাল। সেখান থেকে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে নজর রাখাও বেশি সুবিধাজনক ছিল। আবার পরে ১৫৯৬ সাল নাগাদ থেকে আগ্রা থেকেই মোঘল শাসন পরিচালিত হয়েছিল।

ভৌগোলিক অবস্থান ছিল এই স্থানে যথেষ্ট মনোরম। গঙ্গা-যমুনার সন্ধিস্থলে বানানো এলাহাবাদ দুর্গ থেকে গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চলের উপরে নজরদারি করা যেত। রাজপুতানার আজমের এবং উত্তর-পশ্চিমে সিন্ধু নদের পাড়ে তৈরি আটক দুর্গ ও তার কিছুটা পূর্বে রোহ্টাস দুর্গ ছিল উল্লেখযোগ্য। এই কেন্দ্রগুলোর সাহায্যে সংলগ্ন অববাহিকা অঞ্চল, সমতল অংশের জনগণ, কৃষি-শিল্প এবং বাণিজ্যব্যবস্থার উপর নজর রাখা যেত। মোঘল আমলে আমরা জানি বুন্দেলখন্ডের প্রধান দুর্গনগরী গোয়ালিয়র, রাজপুতানার চিতোর ও রণথম্ভোর এবং দাক্ষিণাত্যের অসিরগড় দুর্গও মোঘলরা দখল করেছিল. তবে উত্তরভারতের দুর্গগুলোর উপরেই ছিল তাঁদের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ… 

ষোড়শ শতকে মোঘল সাম্রাজ্যে এইভাবেই আগ্রা ফতেপুর সিকরি এইভাবেই উল্লেখযোগ্য শক্তিকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল, যার ঐতিহাসিক প্রাসঙ্গিকতা আজও চোখে পড়ে।

তথ্যসূত্র- উইকিপিডিয়া এবং অন্যান্য