কেন হয় গর্ভপাত? কীভাবে সুরক্ষিত রাখবেন নিজেকে?

কথায় বলে মা হওয়া নয় মুখের কথা, আর সন্তান জন্মের আনন্দের সঙ্গে আর কিছুরই প্রায় তুলনা হয় না। একটি মেয়ে যখন প্রথম জানতে পারে সে মা হতে চলেছে তখন তার আনন্দের ইয়ত্তা থাকে না। সে নিজের স্বামী, পরিবার, পরিজনকে একে একে জানায় সেই আনন্দের খবর। বন্ধুরা জেনে শুভেচ্ছা জানায়। বাড়ি ও পরিবারজুড়ে তখন আনন্দের মহরত। কিন্তু তারপর একদিন সকালে উঠে যখন সে টের পায় তার শরীর অসুস্থ লাগছে। তলপেটে অস্বস্তি, ক্র্যাম্প এবং ক্রমশ ব্লিডিং শুরু হচ্ছে। ডাক্তারের কাছে গিয়ে জানতে পারে তার গর্ভাবস্থা আর ঠিক নেই। তার গর্ভের মধ্যে থাকা ভ্রূণের মৃত্যু হয়েছে। ওষুধ ও সার্জারির মাধ্যমে তাকে আবার গর্ভাবস্থার পূর্ব অবস্থায় ফিরে আসতে হবে। 

এই প্রবল যন্ত্রণাদায়ক অধ্যায়টিকে সাধারণভাবে গর্ভপাত বলা হয়। ডাক্তারদের মতে পৃথিবীতে  চারজন গর্ভবতী রমণীর একজন গর্ভপাতের সম্মুখীন হন। তারপর সেই পরিবারটি যে কী অসম্ভব মানসিক কষ্টের মধ্যে দিয়ে যায় তা আর কহতব্য নয়। মেয়েটির মনের জোর আর থাকে না। শারীরিক অবস্থার অবনতি তো হয়ই। পরিবারের সকলেই তখন মুহ্যমান থাকে। কখনও কখনও তো মেয়েটি তো প্রশ্নই করে ফেলে যে তার সঙ্গেই এমন কেন হল?

কখনও কখনও গর্ভপাত সংক্রান্ত নানা কুসংস্কারের সম্মুখীন হতে হয় মেয়েটিকে। কেউ বলে ভয়ের ছবি দেখলে, ভয়ের লেখা পড়লে বা দুঃস্বপ্ন দেখলে গর্ভপাত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কেউ বলে কোনও বিশেষ জায়গায় হাঁটলে , কোনও বিশেষ স্থানে বসলে, নিজের লজ্জাস্থানের যত্ন না নিলে গর্ভপাত হওয়া অবসম্ভাবি। কেউ কেউ বলে কোনও বিশেষ খাবার খেলে বা কেউ যদি তুকতাক করে তাহলে গর্ভপাত হয়। এই সমস্ত প্রচলিত কুসংস্কারের জন্য মেয়েটিকে ভীষণভাবে দোষারোপ করা হয়। কিন্তু আদতে গর্ভপাতের কারণ সম্পূর্ণভাবে প্রাকৃতিক, মেডিক্যাল ও বায়োলজিকাল। 

নিম্নলিখিত কারণগুলি ভীষণভাবে গুরুত্বপূর্ণ,

জিনগত সমস্যা 

কখনও কখনও গর্ভিণীর যদি জিনগত সমস্যা থাকে তাহলে ভ্রূণের গঠনে সমস্যা হয়। সেই সমস্যা থেকেই গর্ভপাত হয়। এই ধরনের সমস্যা কখনও সাধারণ আল্ট্রাসোনোগ্রাফিতে ধরা পড়ে না , বিশেষ প্রকারের রক্তপরীক্ষার মাধ্যমেই একমাত্র করা যায়। সেটা একান্তভাবেই চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত। 

এন্ডোমেট্রিওসিস

প্রতি পাঁচজন মেয়ের মধ্যে একজনের এই অসুখটি থাকে। শতকরা ৪৩ শতাংশ মহিলা সারাজীবনে এই অসুখটায় ভোগেন। এই অসুখের ফলে ভ্রূণ কখনোই বেড়ে উঠতে পারে না ও অকালেই বিনষ্ট হয়।

লুটিয়াল ফেজ ডিফেক্ট

এই অসুখটি থাকলে খুব সহজেই গর্ভপাত ঘটে যেতে পারে। দৈহিক অবস্থা, বিশেষ করে জরায়ুর অবস্থা এমন হয় যে ভ্রূণ ধারণ করে রাখা আর সম্ভব হয় না।

জরায়ুর সমস্যা

কারোর যদি জরায়ুর গঠনগত সমস্যা থাকে তাহলে গর্ভাধান করতে ভীষণ সমস্যা হবে। জরায়ুর দুর্বলতা থাকলে গর্ভপাত অবসম্ভাবি।

সিস্ট ও অ্যাডহেশনস

জরায়ুর মধ্যে যদি লাম্প, সিস্ট ইত্যাদি হয়ে থাকে তবে তা গর্ভপাতের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে।

ফাইব্রয়েড 
অনেক সময় জরায়ুর মধ্যে মাংসপেশীর গঠন অদ্ভুতভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এর ফলে গর্ভপাতের সম্ভাবনা বাড়ে। 

সার্ভিক্সের সমস্যা

গর্ভপাতের অন্যতম কারণ সার্ভিক্সের সমস্যা। যদি সার্ভিক্সের গঠনে সমস্যা থাকে তাহলে অবশ্যই গর্ভপাত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। 

এই সমস্ত ডাক্তারি কারণ ছাড়াও অনেকসময় সংক্রমণ, আঘাত, ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসা ইত্যাদির জন্যও গর্ভপাত হতে পারে।  সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে ২০০ মিলিগ্রামের বেশি ক্যাফিন খেলে গর্ভপাতের সম্ভাবনা বাড়ে। অনেক সময় ৩৫ এর বেশি বয়সে গর্ভবতী হলে জরায়ুর ভ্রূণ ধরে রাখার ক্ষমতা কমতে থাকে।

গর্ভপাত আটকানোর উপায়

কিছু কিছু রিস্ক ফ্যাক্টর থেকেই যায় শুরু থেকে, কারোর যদি আগে গর্ভপাত হয়ে থাকে, তাহলে পরের গর্ভাধানেও গর্ভপাতের সম্ভাবনা বাড়তে থাকে। তাই গর্ভবতী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রভূত যত্ন নিতে হবে। প্রথম তিনমাস খুব সাবধানে খাওয়া দাওয়া করতে হবে।

ডাক্তাররা এই অবস্থায় সাধারণত ফলিক অ্যাসিড ও জিঙ্ক সাপ্লিমেন্ট খেতে বলে। ধূমপান ও মদ্যপানের মতো হারাম জিনিস থেকে দূরে থাকতে বলেন। ওজন ঠিক রাখতে বলে, কারণ স্থূলত্ব মিসক্যারেজের অন্যতম কারণ। কাঁচা মাছ ও সবজি এই সময় কম খাওয়াই ভাল। সুসিদ্ধ রান্না খেলে শরীর ভাল থাকবে।

ঘর পরিষ্কারের সামগ্রী ব্যবহার, পোষ্যর যত্ন এই অবস্থায় না করাই ভাল। অনেক সময় পক্স বা রুবেলার মতো অসুখ গর্ভপাত ঘটাতে পারে। সেই বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

সন্তান আল্লাহর দেওয়া রহমত, তার আসার পথ সুগম করে তোলা ইমানদার বাবা মায়ের অবশ্যকর্তব্য।