কেমন করে হয়েছিল মহানবী (সাঃ)-এর দাম্পত্য জীবনের সূচনা?

ring in flower

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ব্যবসায়িক জীবনের সততা, নিষ্ঠা , ব্যবসায়িক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বিত্তশালী বিধবা খাদিজা বিনতে খোয়াইলিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে । খাদিজা (রাঃ) বনু আসাদ গোত্রের বিত্তশালী বাবার কন্যা। তামিম গোত্রের আবু হালা ইবনে জারারার সাথে তার প্রথম বিয়ে হয়। জননী হন দুই পুত্রের। একজনের নাম হিন্দ। অপরজনের নাম হালা। প্রথম স্বামীর মৃত্যুর পর বিয়ে হয় বনু মখজুম গোত্রের আতিক ইবনে আয়াজের সাথে। এখানেও এক কন্যা জন্মগ্রহণ করে। যার নামও ছিল হিন্দ। দ্বিতীয় স্বামীর মৃত্যুর পর বিপুল ধনসম্পদ আসে তার হাতে। মক্কার ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটে একটা বিশাল বিনিয়োগই ছিল তার। খাদিজা বাণিজ্য কাফেলা পরিচালনায় তার নিযুক্ত এজেন্টদের নির্ধারিত লভ্যাংশ প্রদান করতেন। তিনি এবার সিরিয়ার পথে বাণিজ্য কাফেলা পরিচালনার জন্যে মুহাম্মদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হলেন। সততা ও দক্ষতার অপূর্ব সমন্বয় ঘটার কারণে এই বাণিজ্য কাফেলায় খাদিজার প্রত্যাশার চেয়ে দ্বিগুন লাভ হয়। খাদিজা প্রতিশ্রুত লভ্যাংশের চেয়ে দ্বিগুণ লভ্যাংশ সততার সহিত ব্যবসা পরিচালনাকারী মোহাম্মদকে প্রদান করলেন।

বিত্তবান, সম্ভ্রান্ত, সুন্দরী, বুদ্ধিমতী বিধবা খাদিজার বিয়ের ব্যাপারে অনেকর আগ্রহের কোনো কমতি ছিল না। সকলের প্রতিটি প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। কারণ তিনি জানতেন এ প্রস্তাবগুলো যারা নিয়ে এসেছে তারা মূলত তার ধন সম্পদের লোভে এই প্রস্তাব নিয়ে এসেছে। তিনি একজন সৎ চরিত্রবান অর্থাৎ একজন ভালো মানুষ খুঁজছিলেন। বাণিজ্য কাফেলা ফিরে আসার পর মায়সারা মুহাম্মদের চরিত্র-বৈশিষ্ট্য আচার-আচরণ লেনদেন সবকিছুর সবিস্তার বর্ণনা দিলেন খাদিজার কাছে। শুনে খাদিজা মুগ্ধ হলেন। তবে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে তিনি পরামর্শ নেয়ার জন্যে প্রাজ্ঞ ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের কাছে গেলেন। ওয়ারাকা এই যুবকের বর্ণাঢ্য ভবিষ্যতের কথা বললেন। খাদিজা এরপর তার বান্ধবী নুফাইসার পরামর্শ নিলেন। নুফাইসা নিজেই মুহাম্মদের সাথে দেখা করলেন। খাদিজাকে বিয়ে করার ব্যাপারে তার মতামত জানতে চাইলেন। তিনি সম্মতি দিলেন।

তিনি খাদিজার চাচা আমর ইবনে আসাদের কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন চাচা হামজাকে সাথে নিয়ে। খাদিজার চাচাই ছিলেন তার অভিভাবক। কারণ খাদিজার বাবা খোয়াইলিদ ফুজ্জার যুদ্ধে মারা যান। এরপর থেকে তার চাচাই তার অভিভাবক হন। এরপর ইতিহাসের এক অসাধারণ বিয়ে হল। যখন বিয়ে অনুষ্ঠিত হয় তখন মোহাম্মদ (সাঃ) এর বয়স ছিল ২৫, দেনমোহর ধার্য করা হয়েছিল ৪০০ দিরহাম এবং ২০টি উট। ইতিহাসের অসাধারণ এক বিয়ে।

একজন বিত্তবান ব্যবসায়ী নারী কি পরিমানে স্বামী ভক্ত হতে পারে তার উদাহরণ হচ্ছেন খাদিজা (রাঃ)। স্বামীর প্রতি তার ভালোবাসা ছিল অত্যন্ত গভীর, বিশ্বাস ছিল শতভাগ, আস্থা ছিল শতভাগ। নবীজি(সাঃ)-র সামাজিক বৈষম্য ও গরিবদের বঞ্চনার ব্যাপারে যে দৃষ্টিভঙ্গি ছিল খাদিজা (রাঃ) তা পুরোটাই ধারণ করেছিলেন। তিনিও মক্কার সামাজিক বৈষম্য ও গরিবদের বঞ্চনার ব্যাপারে স্বামীর মতই ব্যথিত ছিলেন। তাদের দাম্পত্য জীবনের পুরোটা সময়ই ছিল এর ছোঁয়া। সম্ভ্রান্ত, বিত্তবান ধনী ব্যবসায়ী খাদিজা বিয়ের পর তিনিও তার স্বামীর মত সাধারন মোটা সুতি কাপড় ব্যবহার করতে শুরু করেন। অভিজাত্যের সিল্ক তিনি এড়িয়ে চলতেন সযত্নে। নতুন পোশাক কেনার পরিবর্তে তিনি তার স্বামীকে অনুসরণ করে পুরাতন পোশাক সেলাই অথবা তাতে তালি দিয়ে ব্যবহার করতে শুরু করলেন। এবং তিনি তা পছন্দ করতেন। যেহেতু তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী ছিলেন, তাই তিনি তার ব্যবসার লাভের প্রায় পুরোটাই গরিবদের মধ্যে খাবার ও সাহায্য হিসেবে দান করতেন। আসলে ২৫  বছরের দাম্পত্য জীবনে তারা ছিলেন একে অন্যের পোশাক। সুখে দুঃখে, আনন্দ বেদনায়, সংগ্রামে সহযোদ্ধা হিসেবে একজন আরেকজনকে সমর্থন দিয়ে গেছেন। আদর্শ দাম্পত্য হিসাবে সারা পৃথিবীর কাছে তারা অনুসরণীয় অনুকরণীয়। মহান রাব্বুল আলামিন আমাদের সকলের দাম্পত্য জীবন দাম্পত্য জীবনের মত করে দিন।