কেমন ছিল সুলতানি আমলে ভারতের গ্রন্থাগার চিত্র?

qutub minar
ID 83289561 © Rui Baião | Dreamstime.com

ভারতবর্ষে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা এবং আধিপত্য স্থাপনের প্রসঙ্গে বারবারই উল্লেখ করতে হয় সুলতানি শাসন এবং সাম্রাজ্যের এক বিস্তৃত অধ্যায়কে। শুধুমাত্র সাম্রাজ্যের পরিধি বিস্তার এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সুলতানি শাসকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল এমনটা বলা যায় না… শিল্প-স্থাপত্যকলার বিকাশেও তাঁদের ভূমিকা ছিল যথাযথ। শিক্ষাব্যবস্থা তদুপরি বই পড়ার ক্ষেত্রেও কোনও কোনও শাসক উৎসাহিত করেছিলেন আপামর জনতাকে। নির্মাণ করেছিলেন এক বা একাধিক গ্রন্থাগার। বহু গুরুত্বপূর্ণ বইসমৃদ্ধ এই পাঠাগারগুলি সেই সময়ে এবং এখনও ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে বিশেষ প্রাধান্য পেয়ে থাকে।

দিল্লিতে সুলতানি শাসকদের কথা বলতে গিয়ে আমরা উল্লেখ করব সুলতান রাজিয়ার কথা। রাজিয়া সুলতান ছিলেন ভারতের মধ্যযুগের একমাত্র নারী যিনি দিল্লির সুলতানি সিংহাসনে আরোহণ করেন। সুলতান রাজিয়া ১২৩৬ থেকে ১২৪০ এই সময় পর্যন্ত অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গেই তাঁর শাসনকাজ পরিচালনা করেছিলেন। ঐতিহাসিক নিজামি বলেছেন যে, রাজিয়া ছিলেন ইলতুতমিশের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম।

শাসনকাজের পরিচালনা, যুদ্ধবিদ্যা, প্রজাবাৎসল্য। বলা যায় একজন শাসকের প্রতিটি ভূমিকাতেই তিনি ছিলেন বিশেষভাবে পারদর্শী। প্রথম মহিলা শাসক হিসেবে সুলতান রাজিয়া উত্তর ভারত জুড়ে স্কুল এবং গ্রন্থাগার স্থাপন করেছিলেন। শিক্ষাব্যবস্থার পরিসর প্রসারের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন প্রধান কাণ্ডারী। তাঁকে আলেম নওয়াজ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল। তত্কালীন বিশিষ্ট ধর্মীয় পন্ডিত মাওলানা মিনহাজ-এ-সিরাজ জুজ্জানী, যিনি ২৩ খণ্ড বিশিষ্ট ইসলামী ইতিহাস গ্রন্থ তাবকাত-এ-নাসিরির লেখক (১২৬০ সালে সমাপ্ত) তিনি রাজিয়াকে এই উপাধিতে সম্মানিত করেছিলেন।

ত্রয়োদশ এবং চতুর্দশ শতাব্দীর সময়কালে তৎকালীন সমস্ত শাসকদের সঙ্গে রাজকুমারীর ব্যক্তিগত আলাপচারিতা এবং রাজনৈতিক সখ্যতা বজায় ছিল। সেই সময়ে তাঁরা প্রত্যেকেই রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক কাজের সমাপ্ত শেষে তাঁদের ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে প্রতিদিন সময় ব্যয় করতেন, শিক্ষাসংক্রান্ত-সংস্কৃতি সংক্রান্ত বহু বিষয় নিয়ে তাঁরা চর্চা এবং আলোচনা করতেন। এই বিষয়টি তাঁদের পক্ষে বেশ সাধারণ ছিল। গ্রন্থাগারের জন্য আলাদা কোনও বিল্ডিং নির্দিষ্ট করা হয়নি; এটি প্রাসাদের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসাবে ব্যবহৃত হত, যদিও এটি কখনও কখনও মসজিদের সাথে সংযুক্ত ছিল। অন্যদিকে খিলজি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা সুলতান জালাল-উদ-দীন খিলজি (১২৯৬) দিল্লিতে ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং বিশিষ্ট পন্ডিত আমির খুসরাউকে (১৩২৫) গ্রন্থাগারিক হিসাবে নিয়োগ করেছিলেন। গ্রন্থাগারিকের অফিসটি ছিল বিশেষ সম্মানজনক, মর্যাদাসম্পন্ন এবং এর দখলকারীকে একটি মূল্যবান কর্মকর্তা হিসাবে বিবেচনা করা হত। সুফি সাধক নিজাম আল-দীন আউলিয়া (১৩২৫) পাবলিক অনুদানের মাধ্যমে দিল্লিতে তাঁর খানকায় একটি গ্রন্থাগার স্থাপন করেছিলেন। এই একটি পাবলিক গ্রন্থাগার ছিল বিপুল পরিমাণে পাণ্ডুলিপি সমৃদ্ধ।

সুতরাং এই কথাটি বেশ ভাল ভাবেই বোঝা যায় যে সুলতানি শাসকদের আমলে সাম্রাজ্য স্থাপনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক প্রসারের প্রতি তাঁরা বিশেষভাবে আগ্রহী ছিলেন.