কে ছিলেন মোল্লা নাসিরউদ্দিন?

nasreddin hodja

দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিড়িয়ে রয়েছে নানা লোককথা, জনশ্রুতি এবং কিংবদন্তি কথা… অনেকসময়ে দেখা যায় লোককথা বা লোকশ্রুতির মধ্যে দিয়ে কোনও ব্যক্তিবিশেষের আখ্যান জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এমনই একটি চরিত্র হিসেবে আমরা মোল্লা নাসিরুদ্দিন হোজ্জার নাম উল্লেখ করতে পারি। শুধুমাত্র মধ্যএশিয়াতেই নয়, এই চরিত্রটির খ্যাতি চোখে পড়বে ভারতবর্ষ এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তেও। মোল্লা নাসিরুদ্দিনকে নিয়ে প্রচলিত লোককথা বা গল্পগুলো জনমানসে সুপরিচিত। বিভিন্ন সময়ে ঐতিহাসিকেরা মোল্লা নাসিরুদ্দিনের জীবন বৃত্তান্তের তথ্য খুঁজতে গিয়ে দেখেছেন যে, তাঁর জীবন সম্পর্কিত ধারাবাহিক কোনও তথ্য বা তত্ত্বের উপকরণ আপাতভাবে নেই। টুকরো টুকরো তথ্যের মধ্যে দিয়ে জানা যায় ত্রয়োদশ শতকে তাঁর জন্ম হয়েছিল তুরস্কের খার্তো গ্রামে। মোটামুটিভাবে ধারণা করা হয় যে সেলজুক শাসনামলে ইরানের বৃহত্তর খোরাসানে বসবাস করতেন তিনি। অবশ্য এই ক্ষেত্রেও নানা সংশয় রয়েছে কারণ- মধ্যপ্রাচ্য এবং মধ্য-এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ আবার মোল্লা নাসিরুদ্দিনকে তাঁদের দেশের আদি নিবাসী বলে দাবি করে থাকে। তবে, তাঁর জীবনকেন্দ্রিক গল্পগুলো কিন্তু মধ্যএশিয়ার বাইরেও বিশেষভাবে প্রচলিত। ইউরোপের গ্রিস, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া আর জার্মানিতেও তাঁর গল্পের জনপ্রিয়তা অনুবাদ সাহিত্যের মধ্যে দিয়ে  আমাদের চোখে পড়েছে। 

কোনও কোনও ঐতিহাসিক মনে করেন তাঁর জন্ম এবং কর্মস্থান ছিল চিনে। আবার একদল ঐতিহাসিকের পাওয়া তথ্য থেকে জানতে পারা যায় মধ্যএশিয়াতে মোল্লা নাসিরুদ্দিন হোজ্জা পরিচিত ছিলেন ‘এফেন্দি’ নামে। সাধারণত ওই প্রদেশে সম্মানজনক কোনও ব্যক্তিকে এই উপাধি বা পদবী প্রদানের রীতি ছিল। মোল্লা নাসিরুদ্দিনের জীবন সম্পর্কে কোনও পর্যাপ্ত নথি না থাকলেও তাঁর গল্পগুলোর মধ্যে দিয়ে বা তাঁকে কেন্দ্র করে যে গল্পগুলো লোকমুখে প্রচলিত ছিল, তার থেকে বেশ কিছু অজানা তথ্যের হদিশ পাওয়া যায়। প্রথমত তিনি ছিলেন ধার্মিক। ছিলেন জ্ঞানী। পণ্ডিতব্যক্তিত্ব। দ্বিতীয়ত, তাঁর থেকে সুপরামর্শ লাভের প্রত্যাশায় অনেকেই তাঁর কাছে আসতেন। তাঁর পেশা সম্পর্কে সঠিক কোনও তথ্য জানা না গেলেও, সুফিবাদ বা সুফিসাধনায় তিনি গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। আপাতভাবে তাঁর গল্পগুলোর মধ্যে হাস্যকৌতুকের উপকরণ থাকলেও জীবন অভিজ্ঞা দর্শনের প্রভাব তাতে প্রবলভাবেই লক্ষ করা যায়। বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক এবং সাহিত্যিক সত্যজিৎ রায় বাংলা ভাষাতে মোল্লা নাসিরুদ্দিনের গল্প সংকলন করে ‘মোল্লা নাসিরুদ্দিনের গল্প’ নামে একটি বই সম্পাদনা করেন। এই বইয়ের সম্পাদকীয়তে তিনি জানিয়েছেন, 

“অনেকের মতে এইসব গল্পের জন্ম তুরস্কদেশে, কারণ সেখানে এখনো প্রতি বছর নাসীরুদ্দীনের জন্মোৎসব পালন করা হয়।

 মোল্লা নাসিরুদ্দীন যে ঠিক কেমন লোক ছিলেন সেটা তার গল্প পড়ে বোঝা মুশকিল। এক এক সময় তাকে মনে হয় বোকা, আবার এক এক সময়ে মনে হয় ভারী বিজ্ঞ।”

প্রসঙ্গত লেখকের এই উপলব্ধি সর্বাগ্রে সঠিক। কারণ মোল্লা নাসিরুদ্দিনের গল্পগুলোকে আপাতভাবে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। এক, যেখানে তিনি চালাকি করে অন্যকে বোকা বানিয়ে থাকেন। দুই, সাধারণ প্রশ্নের উত্তরে এমনসব উত্তর দিচ্ছেন, যারফলে প্রতিপক্ষ নাস্তানাবুদ হচ্ছে। তিন, তিনি নিজেই বোকা সেজে বসে আছেন। অর্থাৎ এই তিনধরনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই রয়েছে তাঁর মধ্যে। গল্পগুলো অন্তত সে কথাই বলে। তবে, যে বিষয়টি বলা প্রয়োজন এই প্রতিটি গল্পের মধ্যে উইট, হিউমার, ফান এবং স্যাটায়ারধর্মী বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ইঙ্গিত বা ইশারায় কোনও বিষয়কে পাঠকের সামনে তুলে ধরার দৃষ্টান্তও চোখে পড়েছে।

মোল্লা নাসিরুদ্দিন বা তাঁর আখ্যানগুলোর বিশ্বজনীন হয়ে ওঠে ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্যে দিয়ে। ১৯৯৬-৯৭ সালকে আন্তর্জাতিক নাসিরউদ্দিন বছর হিসেবে ঘোষণা করেছিল ইউনেস্কো। প্রতিবছরই তুরস্কের জুলাই মাসের ৫-১০ তারিখে ‘আন্তর্জাতিক নাসিরউদ্দিন হোজ্জা উৎসব’ পালিত হয়ে থাকে।

(পাঠকদের মধ্যে যারা এখনও এই কিংবদন্তি চরিত্রটি সম্পর্কে অজ্ঞাত তারা অবশ্যই পড়ে দেখতে পারেন তাঁর গল্পগুলো।)