কোক-পেপসির যুগে এখনও কতটা প্রাসঙ্গিক বিশ্বের প্রথম নরম পানীয়?

sherbet
ID 92274602 © Arapix | Dreamstime.com

শরবত, ফল বা ভেষজ উপাদান কিংবা ফুল পিষে তার থেকে বের করা রস দীর্ঘকাল ধরেই মুসলিম বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পানীয়। এই পানীয় লর্ড বায়রনের মতো পশ্চিমী ব্যক্তিত্বদের মন জয় করেছিল। বর্তমানে, এই ধরনের রস নানা রকমের নামে পরিচিত, ভারত থেকে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র – বিভিন্ন দেশে তা তৈরি করা হয় এবং এটি বহু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সাথে জড়িত। এই সংক্ষিপ্ত নিবন্ধের উদ্দেশ্য হল বিশ্বের প্রথম নরম পানীয়ের ইতিহাস ও বিবর্তন সম্পর্কে আলোচনা করা।

শরবত তৈরি করা হয় ফলের রস বা ফুল কিংবা ভেষজ উপাদানের নির্যাস থেকে, তার সাথে চিনি এবং জল (এবং কখনও কখনও ভিনিগার) মিশিয়ে একটি গাঢ় সিরাপ তৈরি করা হয়। পরে জল বা বরফ দিয়ে তা পাতলা করা হয়। শরবত হল মুসলিম সংস্কৃতির অবিচ্ছিন্ন অংশ — যা নিত্যদিনের ভাষার অংশও হয়ে উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ, মিশরীয় আরবিতে একে বলা হয় “দাম্মু শরবত” (“তাঁর রক্তই হল ​​শরবত”) যা এক অর্থে মধুর স্বভাবের প্রশংসা। বাচ্চাদের বলা হয়, “শারবাটাত” – যার অর্থ হল “কিউট” বা “সুইটহার্ট”। কফি বা চা পরিবেশন করা যেতে পারে “শারবাট” হিসেবে, যার অর্থ “খুব মিষ্টি”। মধ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ায় এর নামে বহু শিশুর নামকরণ করা হয় এই পানীয়র নামে। যেমন, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিনের অন্যতম জনপ্রিয় প্রচ্ছদের ছবি হল আফগানিস্তানের শরবত গুলার মুখ।

শরবতের ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণ হল বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে, তাজা ফল সংরক্ষণ এবং পরিবহণের উপায় খুব বেশি ছিল না। তাই নির্দিষ্ট এলাকায় নির্দিষ্ট মুরসুমে ফল পাওয়া যেত – তাই সেগুলি হয় শুকিয়ে কিংবা সিরাপ আকারে তরল এসেন্স হিসেবে রাখলে তা পরবর্তী সময়ে ব্যবহার করা যেত।

শরবত শব্দটি এসেছে আরবি শরিবা থেকে, যার অর্থ “পান করার জন্য”। শারিবা শব্দটি পরবর্তীকালে বিভিন্ন ভাষায় বিভিন্ন রূপ গ্রহণ করেছিল। আরবি শারবা (মূলত “একটি পানীয়”)-এর আর একটি রূপ হল, তুর্কি শারবেত (এবং ফারসি ও হিন্দিতে শরবত) এবং আমাদের ভাষায় শরবত।

অটোমান তুর্কিরা প্রত্যেক বার খাবার খাওয়ার আগে এবং খাওয়ার সময়েও শরবত পান করত। আজও ইস্তানবুলের বেওগ্লু জেলার হাসি আবদুল্লাহ রেস্তোরাঁয় বহু ঐতিহ্যবাহী অটোমান খাবারের সাথে শরবত পরিবেশন করা হয়। গ্রাহকরা প্রাচীন রীতি মেনে খেতে পারেন কারিসিক কমপোস্টো নামের শরবতটি, যা তৈরি করা হয় আপেল, নাশপাতি, পীচ এবং অ্যাপ্রিকট থেকে তৈরি ঘন, গোলাপী রঙের সিরাপ থেকে। এই সিরাপের সাথে ঠান্ডা জল মিশিয়ে এই শরবত তৈরি করা হয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভার্জিনিয়ার ম্যাকলিনে, অটোমান প্রশিক্ষিত মাস্টার শেফ আবদুল্লাহ আফেন্ডির শিক্ষার্থী শেফ জেইনেল আবিদিন উজুন পরিচালিত কাজান রেস্তোঁরায় আধুনিক অটোমান খাবারের স্বাদ নিতে পারেন। শেফ উজুন এখানে দিউগুন সার্বেটি (“বিবাহের শররত”) পরিবেশন করেন, এটি অটোমান কারিশিক কমপোস্টোর একটি আধুনিক নাম।

পূর্ব তুরস্কের গ্রামগুলিতে আজও প্রচলিত রীতি অনুসারে, যৌতুক বিষয়ে সহমত হওয়ার পরে, বরের পরিবার কনের বাড়িতে আসে এবং তাদের সাথে থাকে একটি দীর্ঘ নলযুক্ত পিতল বা তামার কলস, যাকে বলা হয় ইব্রিক। তাতে ভরা থাকে গুল সারবেটি, বা গোলাপ শরবত। কনে সেই “শরবত পান” করে বরের বাগদত্তা হওয়ার প্রস্তাব স্বীকার করেন।

কেবল বিয়ে নয়, জন্ম ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলিতেও শরবত পরিবেশন করার চাহিদা রয়েছে। যেমন, মিশরে নবজাতক সন্তানকে কেউ প্রথম বার দেখতে গেলে তাঁকে ফিনজান এরফাহ নামের এক বিশেষ ধরনের শরবত পরিবেশন করা হয়।

এছাড়া রমজান মাসে প্রতিদিন রোজা ভাঙার সময়েও শরবত পরিবেশন করা হয়।

প্রতি মার্চ মাসে পালিত হয় ইরানের নওরোজ (নববর্ষ)। এই নতুন বছরের ১৩ তম দিনে পরিবারগুলি পিকনিকে যায়, শিন বা (‘s’) অক্ষর দিয়ে শুরু হওয়া সাতটি জিনিস খায় ও পান করে, তার মধ্যে অবশ্যই থাকে চিনি, ভিনেগার এবং সেকানজেবিন নামক তাজা পুদিনা দিয়ে তৈরি এক ধরনের শরবত।

ইউরোপ এবং আমেরিকাতে শ্রাব হিসাবে পরিচিত একটি পানীয় খুবই জনপ্রিয় ছিল, যা সাধারণত রাস্পবেরি বা কারেন্ট বা চিনি ও ভিনেগারের সাথে মিশ্রিত সাইট্রাস জাতীয় ফল থেকে তৈরি করা হত। উনিশ শতকের শেষে আমেরিকার কার্বনেটেড ঔষধি পানীয় খুব জনপ্রিয় হয়। ওই পানীয় ওষুধের দোকান এবং ফার্মাসির মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। একেই কোকা-কোলার উৎস বলে মনে করা হয়। তা দ্রুত বিদেশে ছড়িয়ে পড়লে, কোকা-কোলা ১৯২৭ সালে ফিলিপিন্স এবং চীনে, ১৯৩৪ সালে সিঙ্গাপুরে, ১৯৩৬ সালে মালয়েশিয়া, ১৯৪৩ সালে মরক্কো ও তিউনিসিয়া, ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান, ১৯৬০ সালে শ্রীলঙ্কা এবং ১৯৬৫ সালে তুরস্কে উৎপাদন শুরু করে।

কিছু সময়ের জন্য, মধ্য প্রাচ্যের শরবতের দোকানগুলিতে এবং রাস্তার হকারদের কাছে পশ্চিমী ও প্রাচ্য- এই দুই ধরনের নরম পানীয় পাওয়া যেত। ধীরে ধীরে কোক এবং পেপসির মতো পশ্চিমী নরম পানীয় বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এখন এগুলি শুধুমাত্র পশ্চিমী ফাস্ট ফুড জাতীয় খাবারের সাথে নয়, চিরাচরিত খাবারের সাথেও পরিবেশন করা হয়। ফলমূল, ভেষজ এবং ফুল ভিত্তিক শরবতের ব্যবহারিক প্রয়োজন এখন আর নেই। কারণ আধুনিক যুগে সারা বিশ্বের সুপারমার্কেটে কাচের বোতল এবং টেট্রা প্যাকে “তাজা” ফ্রুট জুস পাওয়া যায়। সেগুলি অনায়াসে কিনে এসে ফ্রিজে রেখে পরে পান করা যায়।

তবুও, শরবত তার প্রতীকী শক্তি ধরে রেখেছে। এমনকী রাজনীতিতেও তার প্রভাব রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে বিরোধ চলাকালীন ১৯৯৯ সালে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছিল যে বিভক্ত সীমান্ত এলাকায় শরবত-ভিত্তিক অনুষ্ঠান উদযাপন করতে এসে “লোকজন তিনটি যুদ্ধ এবং ৫০ বছর ধরে জমে থাকা সমস্ত তিক্ততা ভুলে গিয়েছে”।