শরিয়াহ সম্মত ওয়েব পরিবেশ. আরওসন্ধানকরুন

কোথায় দেখা যায় বিশ্বের প্রথম কাগজ কল?

patrick-tomasso-Oaqk7qqNh_c-unsplash
Fotoğraf: Patrick Tomasso-Unsplash

সভ্যতার অগ্রগতির সাথে তাল মিলিয়ে না চললে মহান থেকে মহানতর সভ্যতারও পতন ঘটে। ইসলামী সভ্যতার গৌরবের দিন চলে যাওয়ার কারণও কিছু ঐতিহাসিকদের মতে সেটাই। একটা সময় ছিল যখন শিক্ষা, ধর্ম ও বাণিজ্যে মুসলমানরা ছিল সবার আগে। ইউরোপে তখনও সভ্যতার আলো প্রবেশ করেনি এবং এশিয়া ছিল আত্মমগ্ন। সেই সময় অষ্টম থেকে দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত ছিল ইসলামের স্বর্ণযুগ।

এই সময় আবিষ্কৃত হয়েছিল বহু নিত্যনতুন প্রযুক্তি যা দ্রুত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিকে উন্নতির শিখরে নিয়ে গিয়েছিল। কিছু দ্রব্য থাকে যা সভ্যতার ধারাটাকেই বদলে দেয় যেমন আজকের যুগের কম্পিউটার, মোবাইল, জিপিএস ইত্যাদি। সেই সময় এরকমই একটা বস্তু ছিল কাগজ, হ্যাঁ প্রতিদিনের ব্যবহারের এই অতিসাধারণ জিনিসটাই একসময় ছিল মহার্ঘ্য। ইসলামী শাসনে এই কাগজের ব্যবহার ও উৎপাদন দুইই অসম্ভব বেগে বৃদ্ধি পায়। কিন্তু কাগজ তো চীনে আবিষ্কৃত হয়, সুদূর মধ্যপ্রাচ্যে এটি এলো কোন পথে?

ইসলামের স্বর্ণযুগে কাগজের আবির্ভাব

কাগজ আবিষ্কৃত হয় দ্বিতীয় শতাব্দিতে চীনে। চিনারা কাগজের ব্যবহারকে ব্যক্তিগত ক্ষেত্রেই সীমিত রেখেছিল। ফলে তারা কাগজের সর্বৈব ব্যবহার প্রাথমিক ভাবে করতে পারেনি। কিন্তু চীন কাগজের ব্যবহারকে সম্পূর্ণ গোপনীয়তার সঙ্গে করত, কাগজ উৎপাদনের রহস্যকে তারা রহস্যই রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু এই উৎপাদনের কলাকৌশল হস্তান্তর হয়ে যায় আকস্মিক ভাবে।

হযরত উমার ফারুক (রাঃ) এর খিলাফতের সময় (৬৩৪-৬৪৪ খ্রিঃ) বিশাল পারস্য সাম্রাজ্য জয় করে মধ্য এশিয়ার উপকন্ঠে পৌঁছে গিয়েছিল মুসলিম বাহিনী। তাঁর মৃত্যু পরবর্তী একশ বছর অর্থাৎ খুলাফায়ে রাশেদিন (৬৪৪-৬৬১ খ্রিঃ) এবং উমাইয়া আমলে (৬৬১-৭৫০ খ্রিঃ) সেই ধারা অব্যহত ছিল। অবশ্য এ সময়ে মুসলিম বাহিনীর বিজয়ের গতি ছিল প্রথম যুগের তুলনায় মন্থর। তা সত্ত্বেও মোটামুটি অষ্টম শতাব্দীর প্রথম দুই দশকের মধ্যে সমরখন্দ, বুখারাসহ মধ্য এশিয়া; বিশেষ করে আফগানিস্তান ও উজবেকিস্তানের বিরাট অংশ মুসলিম সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত হয়। ফলে প্রাচ্য এবং মধ্য প্রাচ্যের দুই পরাশক্তির মধ্যে মোকাবিলা তখন সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। উল্লেখ্য, ৭০৫-৭১৫ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়া খলিফা আল ওয়ালিদের খিলাফতকালে সেনাপতি কুতাইবা ইবনে মুসলিমের নেতৃত্বে মুসলিমরা সেন্ট্রাল এশিয়ার বিস্তৃত অংশ জয় করেছিলেন।

৭৫১ খ্রীষ্টাব্দে একটি যুদ্ধ হয় চীনের হান বংশের সাথে আব্বাসীয় খিলাফতের, এরকম যুদ্ধ আকছারই রাজায় রাজায় হয়ে থাকত ফলে এর কোনো ঐতিহাসিক গুরুত্ব নেই। কিন্তু এই যুদ্ধের অবদান আব্বাসীয় খিলাফত তথা সমগ্র ইসলামী শাসনাধীন অঞ্চলকে প্রভাবিত করে। এই যুদ্ধের মুসলমানদের হাতে যারা বন্দি হয়েছিল তাদের মধ্যে দুজন ছিল কাগজ উৎপাদনে পটু। তাদের গুরুত্ব বুঝে পাঠিয়ে দেওয়া হয় তৎকালীন রাজধানী কুফায়। এখানেই প্রথমবার ৮০০ বছর ধরে লুকিয়ে রাখা চৈনিক শিল্প বহির্বিশ্বে উন্মুক্ত হয়।

ancient paper mill

কাগজ উৎপাদন ও বাণিজ্যিকীকরণ 

কাগজ উৎপাদন শেখার সঙ্গে সঙ্গে ৭৯৪ খ্রীষ্টাব্দে বাগদাদে (মতান্তরে সমরখন্দ) খলিফা হারুণ অর-রশিদের নির্দেশে প্রতিষ্ঠা হয় প্রথম কাগজকল। এ সময় আরবিতেও কাগজকে ফারসি শব্দ ‘কাগজ’ অবলম্বনে ‘কাঘাদ’ বলা হতো। সেই সময় শাসনকার্যে কাগজের ব্যবহার ব্যপক হারে শুরু হয়। কাগজের ব্যবহার বাড়ার সাথে কাগজ কলের পরিমাণও বাড়তে থাকে, দ্রুত দামেস্ক, লেবানন, হামা ও অন্যান্য শহরে প্রতিষ্ঠা হয় একাধিক কাগজ কল। কাগজের আগে বই লেখা হতো চামড়ায় অথবা গাছের ছালে, এই ব্যবস্থায় বইয়ের আকার হতো বিশাল। কিন্তু কাগজ আসার পর বই বহনযোগ্য হয়ে ওঠে এবং মানুষের আকর্ষণও বৃদ্ধি পায়। ফলে প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি কোরআন ও অন্যান্য পবিত্র গ্রন্থগুলির অনুলিপি করা শুরু হয়। এই শিক্ষার জোয়ারে প্রচুর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছিল এদের মধ্যে অন্যতম বাইতুল হিকমাহ। প্রথমদিকে কেবলমাত্র বাগদাদ এবং দামেস্কে কাগজের কল থাকলেও ধীরে ধীরে অন্যান্য শহরেও কাগজের কল প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। ৮৫০ সালের দিকে আফ্রিকার সর্বপ্রথম কাগজের কল প্রতিষ্ঠিত হয় মিশরে।

ইউরোপীয়রা যখন কেবলই যুদ্ধ করতে ব্যস্ত, তখন মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামী শাসনে গড়ে উঠছে একের পর এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, লেখা হচ্ছে অজস্র বই এছাড়া কাগজ রপ্তানীও চলছিল সমান তালে।

পতন 

কিন্তু অচিরেই এই বিপুল জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলে মুসলিমরা। ১৪৩৯ সালে প্রথম প্রিন্টিং প্রেস বা মুদ্রণযন্ত্র নির্মাণ করেন গুটেনবার্গ। গুটেনবার্গের মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কারের ২০-৩০ বছরের মধ্যে অটোমান সুলতানদের কাছে এর সংবাদ পৌঁছাতে শুরু করে। ছাপাখানা আবিষ্কারের ফলে যে মানুষ হাতে লেখা আর লিখবেও না পড়বেও না এটা অটোমান সাম্রাজ্য ভাবতে পারেনি। স্বভাবসুলভ অহংকারে অমুসলিমদের তৈরি বস্তুকে অস্বীকার করে তারা। এর পর বহু বছর কেটে যায়, অটোমান সাম্রাজ্য নিষেধাজ্ঞা জারি করে মুদ্রণ শিল্পের ব্যবহারে, কারণ খ্রীস্টানদের তৈরি কাগজে থাকত জলছাপ দেওয়া যিশুর প্রতিমূর্তি (যদিও এটি মুখ্য কারণ নয়)। ক্রমাগত ছাপা বই লেখা, পড়া ও কেনার উপর নিষেধাজ্ঞা চলেছিল প্রায় তিনশ বছর। ততদিনে পৃথিবীতে ঘটে যায় বহু কালজয়ী ঘটনা, ইউরোপে শুরু হয় শিল্পবিপ্লব, জন্ম নেন গ্যালিলিও, কোপারনিকাস, নিউটন, দান্তেদের মতো বিজ্ঞানী ও দার্শনিকরা।  সভ্যতার অগ্রগতির সাথে তাল না মিলিয়ে, শিক্ষার প্রসারকে ব্যহত করে পিছিয়ে যায় পৃথিবীর একসময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্য।

কিছুবলারথাকলে

যোগাযোগকরুন