কোনো মিথ্যাবাদী কখনো প্রকৃত মুমিন হতে পারে না

liar and lie
ID 154963598 © M-sur | Dreamstime.com

মিথ্যা ভয়াবহ গুনাহ। মিথ্যা থেকে বেঁচে থাকতে ইসলাম দৃঢ়ভাবে সতর্ক করেছে। ইসলামে মিথ্যার সামান্যতম আশ্রয় বা সুযোগ নেই। কোরআন ও হাদিসের মাধ্যমে প্রমাণিত যে, এটা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম ও গর্হিত। মিথ্যাবাদীর পরিণাম দুনিয়া ও আখেরাতে খুবই নিন্দনীয়। মিথ্যা বলা অশোভনীয় ও অত্যন্ত ঘৃণিত কাজ। চারিত্রিক স্খলনের কারণে অনেকে মিথ্যায় জড়িয়ে যায়। মনুষ্যত্ববোধ ও রুচিশীলতা লোপ পেলেও অনেকে মিথ্যার বেসাতি তৈরি করে। কিন্তু সুস্থ ও সঠিক মন-মস্তিষ্ক কোনোক্রমেই মিথ্যা সমর্থন দিতে পারে না।

সত্যতা ও সততা ইসলামের মূল চালিকা শক্তি। মুমিন বা মুসলিম হলো সত্যের অনুসারী। জীবনের সব ক্ষেত্রে, সর্বাবস্থায় সত্যের অনুসরণ করাই হলো ইমান ও ইসলাম। আল্লাহ তাআলা কোরআন কারিমে বলেন, ‘তুমি বলো: সত্য এসেছে, মিথ্যা অপসৃত হয়েছে; নিশ্চয় মিথ্যা দূরীভূত হবেই’ (১৭: ৮১)। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরও বলেন, ‘তোমরা সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে সংমিশ্রণ করো না এবং জেনেশুনে সত্য গোপন করো না’ (২: ৪২)।

যে কারণে আজকের যুগে সংবাদ যাচাই জরুরী। সঠিক তথ্য বা সংবাদ জ্ঞানের উৎস অবশ্যই বিচার্য। তাই কোনো বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার আগে তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ, ভুল তথ্যের ওপর নেওয়া সিদ্ধান্তও ভুল হবে এবং এর পরিণতি দুনিয়া ও আখিরাতে ভয়াবহ হবে। এ বিষয়ে মুমিনদের সতর্ক করে আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! যদি তোমাদের কাছে কোনো ফাসিক ব্যক্তি কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তখন তোমরা তা যাচাই-বাছাই করো (তথ্যানুসন্ধান ও সঠিক সূত্র সন্ধান করো), না হলে তোমরা (এ অসত্য তথ্যের ভিত্তিতে) অজ্ঞতাবশত কারও প্রতি আক্রমণ করে বসবে (যা যথাযথ নয়), ফলে তোমরা পরে তোমাদের স্বীয় কর্মের জন্য লজ্জিত হতে হবে’ (৪৯: ৬)। সত্য-সুন্দর হলো ইসলাম, মিথ্যা হলো কুফর এবং জাহেলিয়াত বা মূর্খতা হলো অন্ধকার। মিথ্যার ভয়াবহতা সম্পর্কে হাদিসে আছে, ‘মিথ্যা সব পাপের জননী’ (বুখারি)। স্বরচিত মিথ্যাকে ‘ইফতিরা’ বলা হয়। তথ্য যাচাই-বাছাই না করে অসত্য তথ্য বা ভুল সংবাদ প্রচার করাও মিথ্যার শামিল এবং প্রচারকারী ব্যক্তি মিথ্যাবাদী হিসেবে পরিগণিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কোনো মানুষ মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে সে যা শুনে (সত্যাসত্য যাচাই না করে) তাই বলতে বা প্রচার করতে থাকে’ (বুখারি)। কোনো মিথ্যাবাদী কখনো প্রকৃত মুমিন হতে পারে না।

মুসলিম মনীষীরা বলেছেন, সবচেয়ে বড় মিথ্যা হলো আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.) এর ওপর মিথ্যারোপ করা। এর শাস্তি অত্যন্ত ভয়াবহ। কেউ কেউ এ জাতীয় মিথ্যুককে কাফের পর্যন্ত বলেছেন। আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘আর তোমাদের জিহ্বা দ্বারা বানানো মিথ্যার ওপর নির্ভর করে বলো না যে, এটা হালাল এবং এটা হারাম, আল্লাহর ওপর মিথ্যা রটানোর জন্য। নিশ্চয় যারা আল্লাহর নামে মিথ্যা রটায়, তারা সফল হবে না।’ (সুরা নাহাল, আয়াত : ১১৬)। আলী (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা আমার ওপর মিথ্যা বলবে না, যে আমার ওপর মিথ্যা বলবে, সে যেন জাহান্নামে প্রবেশ করে।’ (বুখারি, হাদিস নং : ১০৬)

ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন, ‘এর অর্থ হচ্ছে যে রাসূল সা. এর ওপর মিথ্যা বলবে সে যেন নিজ স্থায়ী ঠিকানা জাহান্নাম বানিয়ে নেয়।’ (তারিকুল হিজরাতাইন : ১৬৯) । আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের সঙ্গে সাক্ষ্যদানকারী হিসেবে সদা দণ্ডায়মান হও। কোনো কওমের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদেরকে কোনোভাবে প্ররোচিত না করে যে, তোমরা ইনসাফ করবে না। তোমরা ইনসাফ করো, তা তাকওয়ার নিকটতর।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত : ৮)। হাফস ইবন আসেম থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেনে, ‘ব্যক্তির মিথ্যুক হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শুনবে তাই বলবে।’ (মুসলিম : ৫) ইমাম নববি (রহ.) বলেন, ‘এ সব হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয়, যা যা শোনা যায় তার সব কিছু বলা নিষেধ। কারণ, প্রতিনিয়ত সত্য-মিথ্যা অনেক কিছুই শোনা যায়, অতএব যে ব্যক্তি সব কিছু বলে বেড়াবে—তার দ্বারা মিথ্যা প্রচারিত হওয়াই স্বাভাবিক, যার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক থাকবে না। আর এটাই হচ্ছে মিথ্যা, মিথ্যার জন্য ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো দখল নেই। হ্যাঁ, গোনাহগার হওয়ার ইচ্ছা শর্ত। আল্লাই ভাল জানেন।’ (শরহু মুসলিম : ১/৭৫)