কোন আশ্চর্য লুকিয়ে রয়েছে পাথুরে শহর পেত্রায়?

Ancient Ad Deir Monastery in Petra, Jordan.

আরবের একটি প্রাচীন শহর হল পেত্রা। ঐতিহাসিক তথ্য অনুসারে এই শহরটি প্রায় দুইহাজারেরও বেশি প্রাচীন। স্থাপত্য এবং শৈল্পিক ঐতিহ্যে এই শহরের গুরুত্বপূ্র্ণ তাৎপর্য রয়েছে। পেত্রাকে একটা সময়ে বলা হত ‘মহান মহানগর’। পেত্রা শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ ‘petros’ থেকে বাংলায় যার অর্থ পাথর শহরটি পাথরের তৈরি বলে এমন নামকরণ করা হয়েছে বলে ধারণা করা যেতে পারে আরবি ভাষাতে শহরটি পরিচিত আল বুত্রা নামে মিশরীয়রা আবার এই শহরের নামকরণ করেছিলেন ‘Pel, sela’  নামে এখানে sela-শব্দের অর্থ হল শিলা সুতরাং নগরটির গঠনবৈশিষ্ট্যকে সামনে রেখে এমন নামকরণ করা হয়েছে বলে ধারণা করা যায় জন উইলিয়াম বার্গান এই পেত্রা নগরীর বর্ণনা প্রসঙ্গে যে বলেছিলেন পেত্রা হল ‘A rose red city half as old as time’- কথাটি সঠিক এবং যথার্থ

অবস্থান

লোহিত সাগর থেকে প্রায় ৮০ কিমি পূর্বদিকে জর্ডানের দক্ষিণ-পশ্চিমের গ্রাম ওয়াদি মুসা-র হুর পর্বতের পাদদেশে শহরটির অবস্থান একটা সময়ে আরবে বিভিন্ন জনজাতি মানুষেরা বসবাস করতেন প্রাচীন এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে নাবাতিয়ান গোষ্ঠীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য এই নাবাতিয়ান জাতির রাজধানী হিসেবে পেত্রা শহরটি প্রসিদ্ধ এবং সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে শহরটি তৈরি হয়েছে প্রাচীন পাহাড় কেটে, পাথর কেটে নগরপরিকল্পনা এবং ভাস্কর্যশৈলী নিঃসন্দেহে উৎকৃষ্ট পুরাতাত্ত্বিক বিভিন্ন নিদর্শন থেকে জানা যায় নগরটি গড়ে উঠেছিল খ্রিস্ট পূর্ব ৩০০০ বছর আগে নগরটি একদিকে যেমন সেই সময়ের বিশিষ্ট বাণিজ্যিক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়, তেমনই অন্যদিকে সাংস্কৃতিক চর্চা এবং সাংস্কৃতিক বিকাশের ধারাটিও চোখে পড়ে পেত্রা নগরী তার ভৌগোলিক অবস্থানের জন্য ছিল অত্যন্ত সুরক্ষিত। নগরটি দুর্গ দিয়ে ঘেরা সাধারণত গুহা কেটে যাতায়াতের রাস্তা তৈরি করা হয়েছিল এই নগরীর ভিতরে বাণিজ্য ব্যবস্থায় উন্নতি ঘটলেও পরে রোমানরা যখন সমুদ্রপথে তাদের বাণিজ্য ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে তখন পেত্রার উন্নতিতে ভাটা পড়ে 

ধর্মযুদ্ধে বিধ্বস্ত

রোমান সাম্রাজ্য, পামিরাদের একাধিপত্য, পরবর্তীসময়ে ভয়াবহ ভূমিকম্পের ক্ষতিগ্রস্ততাকে পেরিয়ে সপ্তম শতকের দিকে মুসলমানরা পেত্রা দখল করে নিলে সাময়িক শান্তি এলেও পরে আবার ত্রুসেইডাররা শহরটি দখল করে এইভাবে ক্রমাগত যুদ্ধের কারণে একসময়ে শহরটি ধ্বংস হয়ে যায় পেত্রা শহরের স্থাপত্য নিদর্শনের কথা বলতে গেলে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয়  ‘খাজনেত ফিরাউন’ মন্দিরটির কথা ঐতিহাসিকেরা মনে করেন একটা সময়ে মন্দিরটিতে বিপুল পরিমাণ ধন-সম্পদ রাখা থাকত, তাই মন্দিরটি  ‘ফারাওদের মন্দির’ নামে পরিচিত হয় প্রাচীন এই নগরীতে চোখে পড়বে ৩০০০ দর্শকের জন্য উপযুক্ত নাট্যশালা… এছাড়াও স্টেডিয়াম, বিচারালয়, লাইব্রেরী এইসবেরও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন চোখে পড়ে পেত্রা প্রদেশের অধিবাসীদের ধর্মবিশ্বাস নিয়ে বিশেষ কোনও তথ্য সামনে আসেনি নাবাতিয়ানরা আরব দেব-দেবীর পুজো করত দুশরা নামে এক দেবতা, সঙ্গে তিন দেবী আল উজ্জা, আলাট এবং মানাতের পুজোর চল ছিল মনে রাখতে হবে এখানকার অধিকাংশ স্থাপত্য শিল্পেই এই ধর্মীয় নিদর্শন রয়েছে স্থাপত্য শিল্পেও আমাদের চোখে পড়েছে রোমান এবং আরব শিল্পের একপ্রকার সংমিশ্রণ

ঐতিহাসিক নিদর্শন

দীর্ঘসময় ধরে অবশ্য এই নগরীর অস্তিত্ত্ব আমাদের কাছে অজানা ছিল। ধারণা  করা হয় এটি প্রায় দুই হাজার বছর পুরনো। ১৮১২ সাল সুইস পরিব্রাজক জোহান লুডিগ বারখাট এই নগরীটি খুঁজে বার করেন এবং বিশ্ববাসীর সামনে আনেন তবে নগরীর প্রকৃত গঠনকাঠামো সম্পর্কে তাঁর প্রত্যক্ষ ধারণা ছিল না পরে ১৮২৮ সালে দুই ফরাসি লিনো বেলফুঁ এবং লিউন দ্য ল্যাবঘদের উদ্যোগে শহরটির নকশা সকলের সামনে আসে এবং ধীরে ধীরে প্রাচীন ধ্বংসস্তূপের মধ্যে থেকে প্রাচীন শহরটি উন্মোচিত হয় সকলের কাছে 

১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো এটিকে বৈশ্বিক ঐতিহ্যবাহী স্থান বলে ঘোষণা করে ২০০৭ সালে পেত্রা বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের মধ্যে একটি রূপেও মান্যতা পায় পাথুরে এই নগরীর স্থাপত্য জুড়ে রয়েছে ঐতিহাসিক নানা ঘটনা চিহ্ন, যা আজও পর্যটকদের এই শহরের সৌন্দর্যে মুগ্ধ করে

তথ্যসূত্র-উইকিপিডিয়া