কোন কোন সংস্কৃতির মিশেল ঘটেছে জনপ্রিয় ফিরনিতে?

Traditional Indian Sweet. Phirni, pudding.

সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলি একবার কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘ইংরেজদের বাড়ি, হিন্দুদের শাড়ি আর মুসলমানদের হাঁড়ি…’ বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না কথাসাহিত্যিক এই তিনেরই সদর্থক গুণাগুণ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। শিল্প-সংস্কৃতির ধারাবাহিক বিকাশে এই তিনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ভারতবর্ষে বা ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামি রন্ধন শিল্পের ধারাবাহিকতা মূলত এসেছে মোঘলদের হাত ধরেই। মোঘলদের শাহী রকমারি খাবারের বাহার ভোজনরসিকদের রসনাকে কেবলমাত্র তৃপ্ত করে না, একইসঙ্গে এর আস্বাদ মনকেও অনেকাংশে পরিতৃপ্ত করে। 

মোঘল খাবারের তালিকাতে একদিকে যেমন রয়েছে মোঘলাই পরোটা, রকমারি কাবাব এবং বিরিয়ানির বাহারি পদ… তেমনই রয়েছে লোভনীয় এবং উপাদেয় মিষ্টিপদের আয়োজন। যাকে ডেজার্ট বলাও যেতে পারে। শাহী টুকরা এবং ফিরনি এই দুইয়ের নাম এখানে অবশ্যই বলতে হবে। দুইয়ের মধ্যেই মোঘলদের শাহী মেজাজ এবং আমেজ রয়েছে। শাহী টুকরাতে যদি আপনি পান জাফরান আর এলাচের সুমিষ্ট স্বাদ, তাহলে ফিরনি খেতে খেতে অবশ্যই পাবেন কাজু, পেস্তা, আমন্ডের উপাদেয় স্বাদ, সঙ্গে এলাচের গন্ধ তো রয়েছেই।

আজ আমরা আলোচনা করব ফিরনি নামক এই মিষ্টি পদটি নিয়ে। ফিরনি নিয়ে অনেকের মনেই অনেক প্রশ্ন থাকে। কেউ কেউ মনে করেন ক্ষীর এবং পায়েসের মতোই একটি পদ হল ‘ফিরনি’। তবে এই ধারণা সম্পূর্ণ সঠিক নয়। ফিরনি এবং পায়েসের প্রধান পার্থক্যের মধ্যেই রয়েছে উপকরণগত পার্থক্য। পায়েস প্রস্তুত করতে সাধারণত গোটা চাল ব্যবহার করা হয়, অন্যদিকে ফিরনি তৈরি করতে গুড়ো চালের ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ফিরনি তৈরি করার সময়ে চালকে গুড়ো করার একটা বিশেষ প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হয়ে থাকে। সাধারণত এক্ষেত্রে চাল ভেঙে প্রায় চারটুকরো হয়, তাই ফিরনি খেতে গিয়ে আমরা দেখছি এর দানাগুলো সুজির দানার থেকে সামান্য বড়।

ভারতীয় উপমহাদেশে ফিরনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে মোঘল বাদশাহদের হাত ধরেই। ঐতিহাসিকদের মতে ফিরনি হল আরবের খাবার। আরব প্রদেশ থেকে ইরান হয়ে এই খাবার এসে পৌঁছেছে ভারতে। ঐতিহাসিক সংযোগসূত্র রয়েছে এই প্রসঙ্গে। সম্রাট হুমায়ুন শেরশাহের সঙ্গে ১৫৩৯ সালে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে দিল্লি ছেড়ে ইরানে চলে যান। সঙ্গে যায় তাঁর নিয়োজিত শাহী বাবুর্চিরা। ইরানে গিয়ে তিনি ইরানের বাদশাহকে খাওয়ান শাহী বাবুর্চিদের হাতে তৈরি ভারতীয় খিচুড়ি। ইরানের বাদশাহ এই খাবার খেয়ে অত্যন্ত খুশি হন এবং হুমায়ুনকে খাওয়ান ‘ফিরনি’। ১৫৫৫সালে মোঘল সম্রাট হুমায়ুন যখন পুনরায় দিল্লির সিংহাসনে বসেন তখন তিনি ইরানের এই বিশিষ্ট পদটির প্রচলন করেন ভারতবর্ষে। নাম ছিল ‘ইরানি ফিরনি’। 

তবে এই মিষ্টিজাতীয় পদটির জনপ্রিয়তা প্রসঙ্গে আর একটি ধারণা চলে আসছে। মনে করা হয় এদেশে পায়েস অর্থাৎ চাল এবং দুধ একসঙ্গে রান্না করার চল অনেকদিন ধরেই ছিল, সুগন্ধ আনার জন্য কর্পূর ব্যবহার করা হয়ে থাকত। পরে অবশ্য মোঘল রন্ধনশৈলীর অনুসরণে কর্পূরের বদলে যুক্ত হয় গোলাপ জল। কাশ্মীরি কায়দা যুক্ত হলে পায়েসের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে বাদাম, নানা জাতের বাদাম এবং কিশমিশ। বাদামের কোনোটা ব্যবহৃত হয় রান্নার সময়, কোনোটা ব্যবহৃত হয় সাজ-সজ্জার কাজে। এখন অবশ্য পায়েসের সাজ-সজ্জায় ডালিমের লাল দানা ছড়াতেও দেখা যায়। এতে খাবারটির আভিজাত্য, স্বাদ ও বর্ণ সবই বাড়ে। ফিরনি হল পায়েসের পারস্য সংস্করণ, সঙ্গে কাশ্মীরি রান্নার একধরনের ফিউশন। তবে, এই মিষ্টি পদটির জন্ম পশ্চিম এশিয়ায় এবং ডাকনাম ‘ফেরনি’ এই মতটিই বেশি প্রাধান্য পেয়ে থাকে।

সাধারণত ফিরনি প্রস্তুত করতে দুধ, বাসমতি চাল, এলাচ গুড়ো, চিনি, কাজু, পেস্তা এই উপকরণগুলোর প্রয়োজন হয়। উপকরণ ভেদে আবার ফিরনির নানা নাম যেমন-কেশর ফিরনি, আম ফিরনি, শাহী ফিরনি। 

তথ্যসূত্র- বিভিন্ন প্রতিবেদন এবং ‘বাঙালি উতসবে পায়েস ফিরনি’(মোহসীন আব্বাস)