কোন প্রেক্ষাপটে ঘটেছিল বখতিয়ার খিলজির বাংলা বিজয়?

ID 7536837 © William Rossin | Dreamstime.com

ইতিহাসের গতি একরৈখিক নয়… তা বহুরৈখিক। ঘটনা এবং বিবরণীর এক বিশ্বাসযোগ্য নথি। ঐতিহাসিকের মূল দায়িত্বই হল ইতিহাস চর্চার মধ্যে দিয়ে অতীতে ঘটে যাওয়া কোনও ঘটনার নির্যাস পাঠকের সামনে তুলে ধরা।

এমনই এক ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে জানা যায় ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই সিরাজের লেখা ‘তবকাত-ই-নাসিরি’ বই থেকে। ভারতে তথা বাংলায় তুর্কি বিজয়ের প্রায় চল্লিশ বছর পরে এসে তিনি ইখতিয়ারউদ্দিন মহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির অভিযানের কাহিনি শুনিয়েছিলেন। তাঁর লেখা উল্লেখিত গ্রন্থটি থেকে জানা যায় যে বখতিয়ার খিলজি ও তাঁর তুর্কি বাহিনি ঘোড়া ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে নদিয়াতে ঢুকেছিলেন। সে সময়ে বাংলা থেকে উত্তর দিকে তিব্বত পর্যন্ত ঘোড়ার ব্যবসা বেশ চালু ছিল। কাজেই তাঁদের সাম্রাজ্য বিস্তার এবং নদিয়া জেলার সংলগ্ন অঞ্চলটি জয় করতে খুব বেশি সমস্যা হয়নি।

এই নদিয়ার ভৌগোলিক বিস্তৃতি ঠিক কতদূর পর্যন্ত ছিল?

সম্ভবত এই নদিয়া ছিল বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে ভাগীরথী নদীর তীরে, যা আজ নদীর তলায় চলে গেছে। অথবা হয়তো বর্তমান বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার নৌদা গ্রামই হল সেকালের নদিয়া। তুর্কি আক্রমণের সময় বাংলায় লক্ষ্মণ সেনের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত ছিল। প্রচলিত লোকশ্রুতি থেকে জানা যায় বখতিয়ারের সঙ্গে মাত্র সতেরো জন সৈন্য ছিল। পরে অবশ্য অনেক ঐতিহাসিকই এই সত্যের যাচাই করে দেখেছে বিষয়টি একেবারেই ঠিক নয়। সেকালে উত্তর ভারত থেকে বাংলায় আসার একাধিক রাস্তা ছিল।

সাধারণত বিহার থেকে বাংলায় আসার সময়ে রাজমহল পাহাড়ের উত্তর দিকের পথ ধরেই আসা হত। রাজা লক্ষ্মণসেনও ওই পথে তুর্কি আক্রমণ ঠেকানোর জন্য সৈন্য মোতায়ন করেছিলেন। কিন্তু বখতিয়ার খিলজি তাঁর সৈন্যদের অনেকগুলো ছোট ছোট দলে ভাগ করে ঝাড়খন্ডের দুর্গম জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এসেছিলেন। শোনা যায় দুপুরবেলা লক্ষ্মণ সেন যখন খেতে বসেছিলেন, তখন অতর্কিত আক্রমণ প্রতিরোধ করতে না পারার জন্য তিনি পূর্ববঙ্গের দিকে চলে গিয়েছিলেন। একটা বিষয় স্পষ্ট যে বখতিয়ার খিলজি ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ। রণনিপুণ। তাঁর পূর্বাপর ইতিহাস সম্পর্কে দু-চারটে কথা বলা যেতে পারে এই প্রসঙ্গে।

কে ছিলেন বখতিয়ার খিলজী?

আফগানিস্তানের বখতিয়ার খলজি ভাগ্যান্বেষণে ঘুরতে ঘুরতে গজনি হয়ে দিল্লিতে আসেন। তিনি প্রথমে বদায়ুন ও পরে অযোধ্যার শাসনকর্তা হুসামউদ্দিনের অধীনে চাকরি করেন। ১২০৩ সালে তিনি কুতুবুদ্দিন আইবককে প্রচুর উপহার দিয়ে সন্তুষ্ট করেন এবং বাংলা জয়ের পরিকল্পনা করেন। তুর্কিরা প্রায় বিনা যুদ্ধেই নদিয়া জয় করে। এরপর বখতিয়ার নদীয়া ছেড়ে লক্ষ্মণাবতী অধিকার করে নিজের রাজধানী স্থাপন করেন। এই শহরকে সমকালীন ঐতিহাসিকরা ‘লখনৌতি’ বলে উল্লেখ করে থাকেন।

বখতিয়ার খিলজি নিজের নতুন রাজ্যকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে প্রত্যেক ভাগের জন্য একজন করে শাসনকর্তা নিয়োগ করেছিলেন। সেনাপতি ছিলেন এইসকল শাসনকর্তাদের অধিকাংশই। বখতিয়ার খিলজি লখনৌতিতে মসজিদ, মাদ্রাসা এবং সুফি সাধকদের জন্য নির্দিষ্ট নিবাস তৈরি করেন। লখনৌতি রাজ্যের সীমানা উত্তরে দিনাজপুর জেলার দেবকোট থেকে রংপুর শহর, দক্ষিণে পদ্মা নদী, পূর্বে তিস্তা ও করতোয়া নদী এবং পশ্চিমে বিহার বখতিয়ার খিলজির অধীনে ছিল।

সেই আমলের প্রশাসনিক নীতি

বখতিয়ার খিলজি একজন সুশাসক ছিলেন। তিনি তাঁর রাজ্যকে কয়েকটি জেলায় বিভক্ত করেন এবং সেগুলির শাসনভার তাঁর প্রধান অমাত্য ও সামরিক প্রধানদের ওপর ন্যস্ত করেন। তাঁদেরকে শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষা করা, রাজস্ব আদায় করা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করা এবং জনগণের পার্থিব ও নৈতিক উন্নতির দিকে লক্ষ্য রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

তিনি লখনৌতিতে রাজধানী স্থাপনের পর খুৎবা পাঠ করেন এবং দিল্লীর সুলতান মোহাম্মদ ঘুরীর নামে মুদ্রা প্রবর্তন করেন। তিনি দিনাজপুর ও রংপুরের নিকট দুটি ছাউনি শহর নির্মাণ করেন। তাঁর সময়ে প্রচলিত প্রশাসনিক বিভাগকে ইকতা এবং এর শাসনকর্তাকে মুকতা বলা হতো। তিনি মসজিদ, মাদ্রাসা ও খানকাহ নির্মাণ করেন। এরপর বখতিয়ার খিলজি তিব্বত আক্রমণ করে রাজ্যবিস্তার করার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেই চেষ্টা সফল হয়নি। তবে বাংলার ইতিহাসে তাঁর রাজ্যপাট নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।

তথ্যসূত্র- বাংলাপিডিয়া এবং অন্যান্য