যে প্রেক্ষাপটে নবীজি( সাঃ)-এর জন্ম ও বেড়ে ওঠা

পর্ব- ০১

সোমবার ১২ রবিউল আউয়াল, ৫৭১ খ্রিষ্টাব্দ। কোরাইশদের বনু হাশিম গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন এক এতিম শিশু। বাবা আবদুল্লাহ মারা যান শিশুর জন্মের ছয় মাস আগে। মৃত্যুকালে তিনি পরিবারের জন্যে রেখে যান পাঁচটি উট, ডজন তিনেক ছাগল এবং একজন দাসী। নবজাতক ছেলে হওয়ায় দাদা আবদুল মুত্তালিব শিশুকে কাবায় নিয়ে গিয়ে নাম রাখেন ‘মুহাম্মদ’। মায়ের পর শিশুকে প্রথম দুগ্ধ পান করান চাচা আবু লাহাবের দাসী সুয়াইবা। এদিকে তদানীন্তন রীতি অনুসারে জন্মের সপ্তম দিনে আবদুল মুত্তালিব শিশুর খতনা করান এবং কাবা প্রাঙ্গণে ভোজ দেন। মা আমিনা প্রচলিত প্রথা অনুসারে ধাত্রীদের আগমনের অপেক্ষা করতে থাকেন।

ধাত্রীদের অবজ্ঞা

তিন মাস পর বনু সাদ গোত্রের ধাত্রীরা এলো। কিন্তু তাদের কেউই এই এতিমকে লালনের ব্যাপারে কোনো আগ্রহ দেখাল না। হালিমাও প্রথমবার তাকে নিতে আগ্রহী হননি। কিন্তু গোত্রের অন্য ধাত্রীরা শিশু পেলেও হ্যাংলা-পাতলা বলে তাকে কেউই লালনপালনের জন্যে শিশু দিতে আগ্রহী হয়নি। অগত্যা খালি কোলে ফিরে যাওয়ার চেয়ে তিনি এই পিতৃহীন শিশুকে কোলে তুলে নেন। শিশুর হাসিতে ভুলে যান তার কষ্ট। হালিমা অর্থ মমতাময়ী। শিশুটিকে পালনের ক্ষেত্রে তিনি অবশ্য তার নামের অর্থের সার্থকতার প্রমাণ দেন।

ভূমিষ্ঠ হওয়ার চতুর্থ মাসেই হালিমার কোলে শিশুটির যাত্রা শুরু হয় তপ্ত মরুর পথে। গাধার পিঠে চেপে তারা নয় দিনের পথ পেরিয়ে পৌঁছান ৫০০০ ফুট উঁচু নজদ উপত্যকার শুষ্ক নদীতটে বনু সাদ গোত্রের আবাসস্থলে। মোটা কাপড় আর ছাগলের চামড়ার বুননে তৈরি কালো ও ধূসর রঙের লম্বাটে নিচু তাঁবুতে হালিমার দুই মেয়ে এবং দুগ্ধপোষ্য ছেলের সাথে আস্তে আস্তে বেড়ে ওঠেন তিনি। তার সখ্যতা গড়ে ওঠে মেষশাবক, ছাগলছানা আর আধাবুনো বিড়াল এর সাথে।

তেজদীপ্ত সাহসী শিশু

মরুভূমির প্রতিকূল পরিবেশ, দারিদ্রতা, আরবেদুইনদের স্বাধীন সহজ-সরল নির্ভীক পরিবেশ তাকে করে তোলে কষ্টসহিষ্ণু, সাহসী ও সুঠাম। হালিমা তাকে মা আমিনার কাছে নিয়ে এলেন যখন তার বয়স ২ বছর। মক্কায় তখন রোগের প্রাদুর্ভাব। শঙ্কিত আমিনা ছেলেকে আবারো মরুর বুকে ফিরিয়ে দিলেন। যেহেতু বনু সাদ কথা বলতো বিশুদ্ধ আরবিতে, তাই তিনি শিশুকালেই শুদ্ধ আরবি শিখে গিয়েছিলেন।

পাঁচ বছর বয়সে এই শান্ত তেজোদীপ্ত সুঠাম ও সাহসী শিশুটি মক্কায় মায়ের কাছে ফিরে যান। তার খেলার সঙ্গী হলেন প্রায় সমবয়সী চাচা হামজা ও ফুফু সাফিয়া। ওই সময়ে বিধবাদের বিয়ে করার ব্যাপারে আগ্রহী যুবকের কোন অভাব ছিল না। বিশেষ করে অভিজাত পরিবারের বিধবাদের বিষয়ে। আমিনা এই ধরনের প্রস্তাব পুরোপুরি এড়িয়ে যান পুত্রের প্রতি তাঁর পুরো মনোযোগ ছিল আজীবন। পুত্রের প্রতি মমতায় প্রধান উপায় তার কাছে। আমিনা তার পুত্রকে আত্মীয়-স্বজনের সাথে পরিচয় করানোর উদ্দেশ্যে মদিনার খাজরাজ গোত্রের মাঝেই নিয়ে যান। সেখানে তাঁর পুত্র ঘুড়ি ওড়াতে এবং সাঁতার কাটতে শেখে।

শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল না

মায়ের সাথের এই আনন্দ আর বেশি দিন তিনি পাননি। বাবা আব্দুল্লাহর কবর জিয়ারত শেষে মক্কায় ফেরার পথে মা অসুস্থ হয়ে আবওয়া নামক স্থানে মারা গেলেন। মরুভূমির বুকে মাকে কবরস্থ করে ৬ বছরের শিশু ফিরে এলেন মায়ের হাবশি দাসী বারাকার সাথে। মায়ের পুরো স্নেহ দিয়েই বারাকা যত্ন নিয়েছেন এই শিশুর। তিনি তাই বলতেন মায়ের পর বারাকাই আমার মা। এরপর এই এতিম শিশুটির অভিভাবকত্ব গ্রহণ করলেন দাদা আবদুল মুত্তালিব। দাদা হিসেবে মহানবীর প্রতি তার আদর যত্নের কোন অভাব ছিল না। ওই সময় মক্কার সমাজে সবাই তখন টাকার ধান্ধায় ব্যস্ত। দাদার মাথায় তাই শিশু মুহাম্মদের লেখাপড়ার চিন্তা আসেনি। তাই তিনি নিরক্ষরই থেকে গেলেন। দাদা আবদুল মুত্তালিব ৮২ বছর বয়সে মারা গেলেন, তখন তার বয়স মাত্র ৮ ।

(চলবে)