কোন ‘শাহি’ জাদু রয়েছে মোঘলাই মশলায়?

spices indian
ID 134686704 © Oksana Kolodiy | Dreamstime.com

মোঘলাই খাবার বললেই আমাদের মনে পড়ে লোভনীয় এবং উপাদেয় বেশ কিছু খাবারের নাম। খাবারের তালিকাতে একদিকে যেমন রয়েছে বিরিয়ানি, হালিম, নানারকমের কাবাব, নিহারি, চিকেন টিক্কা… তেমনই অন্যদিকে রয়েছে ডিম আর মশলার পুর ভরা মোঘলাই পরোটার মচমচে সুস্বাদু আস্বাদ।

ভারত কিংবা ভারতের বাইরে মোঘলাই খাবারের চল বেশ পুরনো বলতে হবে, একইসঙ্গে মোঘলাই খাবারের প্রতি আলাদা আকর্ষণ রয়েছে আট থেকে আশি সববয়সের মানুষের মধ্যে। মোঘলাই খাবারের বিষয়ে কথা বলতে বলতেই আমাদের উল্লেখ করতে হয় উত্তর ভারতীয় রন্ধনপ্রণালীর কথা। বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে জানা যায় যে উত্তর ভারতীয় রন্ধনপ্রণালীর ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি পরিমাণে মশলাযুক্ত খাবার রান্নার চল রয়েছে। এই মশলার তালিকাতে আমরা কী কী দেখতে পাই?

তালিকাতে রয়েছে মরিচ, লবঙ্গ, এলাচ, দারচিনি, জায়ফল, গোটা জিরে, কালো জিরে, তেজপাতা, গোটা সরষে, মৌরি, শুকনো লঙ্কা এবং অন্যান্য মশলা। মোঘল শাসকদের খাবারের নিয়মের সঙ্গে ভারতীয় পদ্ধতির মিশ্রণের কথা আমরা সকলেই জানি। মূলত ভারতীয় ও পারস্য দেশের রন্ধন প্রণালীর সংমিশ্রণেই তৈরি হয় উত্তর ভারতীয় খাবার। এই প্রসঙ্গে আরও একটা ঐতিহাসিক তথ্যের কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন।

মোঘল সম্রাট আকবরের হাত ধরেই ভারতবর্ষে প্রথম হিং এবং জাফরানের চাষ শুরু হয়। মোঘলাই খাবারে বিশেষ করে বিরিয়ানি প্রস্তুতিতে একটা অন্যতম প্রচলিত উপকরণ হল জাফরান… খাবারের স্বাদ এবং গন্ধ দুইয়ের মাত্রা বাড়াতেই এই উপকরণের জুড়ি মেলা ভার। ফিরে দেখতে পারি ঐতিহাসিক বিভিন্ন তথ্য কথা। এ দেশের মাটিতে যখন মোঘল সাম্রাজ্যের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে তখন প্রথম মোঘল সম্রাট বাবর পারস্যের বিভিন্ন পদ রান্না তৈরি করতে এই দেশের রাঁধুনিদের নিযুক্ত করেছিলেন।

বাবরের জন্মস্থান উজবেকিস্তান এবং উত্তর ভারতের তাপমাত্রা এবং আবহাওয়া পরিবেশ কখনওই এক ছিল না, যে কারণে খাবার নিয়ে নানা সমস্যা দেখা যায়। ভারতের তাপমাত্রা অপেক্ষাকৃত বেশি হওয়ার কারণে খাবারগুলো তাড়াতাড়িই খারাপ হয়ে যেত। সেই সময়ে শীততপ নিয়ন্ত্রণে খাবার সংরক্ষণের ব্যবস্থাও ছিল না কিন্তু দিনের পর দিন তো এই সমস্যা নিয়ে চলাটা মুশকিল। তাই শাহি দরবার থেকেই সমাধানের পথ খুঁজে বের করা হল। কী সেই উপায়? বেশি মশলা দিয়ে বানানো হল খাবার। বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে, মশলা খাবার নষ্ট হওয়ার থেকে বাঁচায়। এবং সেই কারণেই উত্তর ভারতীয় খাবারগুলিও এত মশলাযুক্ত করেই রান্না করা হয়। ব্যাকটেরিয়া এবং খাবারের অন্যান্য জীবাণু গরম পরিবেশে বেঁচে থাকতে পারে না ফলত মশলা জাতীয় খাবারে ব্যাকটেরিয়া সংক্রামিত হয় না। গরম জলবায়ুর দেশে তুলনামূলকভাবে বেশি মশলাদার রন্ধনপ্রণালীই দেখা যায়। 

শুধুমাত্র মশলা জাতীয় খাবারই নয়, মোঘল-শাহী খাবারে অনেক বেশি পরিমাণে তেল এবং মাখন ব্যবহারের একটা প্রচলন লক্ষ করা গেল। যদিও আগে খাবার নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচাতেই বেশি তেল দেওয়া হত। শোনা যায় যে,  মোঘল সম্রাট শাহজাহান, আগ্রা থেকে দিল্লিতে তাঁর রাজধানী স্থানান্তর করার আগে তাঁর সমস্ত মন্ত্রীদের সাথে আলোচনা করেন। তবে তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সাথে পরামর্শ করতে পারেননি। নতুন রাজধানীতে যাওয়ার পর, সম্রাট দেখলেন যে আগ্রার থেকে দিল্লিতে যমুনা নদীর জল অনেক বেশি দূষিত। তাই দূষিত জলের ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য জীবাণু থেকে খাদ্যকে বাঁচাতে অত্যধিক তেল ব্যবহার করা হত। এইভাবেই রান্নার তালিকার একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে ওঠে তেল আর মাখন।

মোঘল রান্নাতেই বিভিন্ন মশলা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা আমাদের চোখে পড়েছে… যেমন বিভিন্ন মশলার সমন্বয়ে তৈরি বিরিয়ানি মশলা কিংবা তন্দুরি মশলা যে কোনও রান্নাতেই আলাদা এসেন্স এনে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট. রসুন, পেঁয়াজ, অলস্পাইস এবং অরিগানো ব্যাকটেরিয়া নাশক বলেই পরিচিত। পেঁয়াজ প্রচুর পরিমাণে ফসফরাস তন্তু ,পটাসিয়াম ভিটামিন বি, ভিটামিন সি, সমৃদ্ধ যারফলে এটি দেহের চর্বি , সোডিয়াম ও কোলেস্টেরল কমাতেও সাহায্য করে থাকে। অন্যদিকে রসুনে থাকে ভিটামিন এ ,ভিটামিন সি।  রসুনের অ্যান্টিসেপটিক ক্ষমতা আছে। রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ রাখতে রসুন ব্যবহৃত হয়। লবঙ্গে থাকে ব্যাকটেরিয়ানাশক ইউজিনাল যৌগ। ব্যাকটেরিয়া নাশক রূপে কাজ করার পাশাপাশি এটি দাঁতের যন্ত্রণা উপশমেও বিশেষভাবে সাহায্য করে।

রাঁধুনি, দারুচিনি, স্টারণীশ এবং জিরা ৪০ শতাংশ ব্যাকটেরিয়া মেরে ফেলতে পারে। ক্যাপসিকাম এবং অন্যান্য ঝাল লঙ্কা ৭৫ শতাংশ ব্যাকটেরিয়া নষ্ট করে দেয়। কালো মরিচ, আদা, স্টারানিজ এবং লেবুর রস প্রায় ২৫ শতাংশ জীবাণু নষ্ট করে। উত্তরভারতীয় মিষ্টি জাতীয় খাবারে মৌরি ব্যবহার করা হয়, এই মৌরিরও উপকারিতা রয়েছে মৌরি চর্বি দূর করতে, নিম্ন রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে, হজম শক্তি বাড়াতে , চোখের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে, সাইনাসের সমস্যা দূর করে, এছাড়াও মৌরি হাম ,ক্যানসার সহ অন্যান্য রোগের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় । বিভিন্ন মশলাসমৃদ্ধ খাবার কেবলমাত্র সুপাচ্যই হয় এমনটাই নয় বিভিন্ন থনিজ পদার্থ, পর্যাপ্ত ভিটামিন সমৃদ্ধ এই মশলাগুলো এবং মশলাসমৃদ্ধ খাবারগুলো শারীরিক ঘাটতি পূরণ করতেও আমাদের সাহায্য করে থাকে। তবে এখন আধুনিক সময়ে আমাদের জীবনযাত্রার বদল ঘটেছে যার প্রভাবে অনেক ক্ষেত্রেই বেশি মশলাযুক্ত খাবার না খাওয়ারই পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা।