কোভিড ১৯-এর দ্বিতীয় ঢেউ: কেন, কীভাবে এবং কী করা উচিত?

স্বাস্থ্য ২২ এপ্রিল ২০২১ Contributor
জ্ঞান-বিজ্ঞান
দ্বিতীয় ঢেউ
Photo : Dreamstime

কোভিড ১৯-এর দ্বিতীয় ঢেউ-এ কাঁপছে ভারত এবং বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত এই মুহূর্তে ‘হটস্পট’। আক্রান্তের সংখ্যায় এই মুহূর্তে আমেরিকার পরেই ভারত, এবং এখানে প্রতিদিনই আক্রান্তের নতুন রেকর্ড তৈরী হচ্ছে। দিন প্রতি আক্রান্তের সংখ্যা ২.৫ লাখ ছাপিয়ে যাচ্ছে, সাথে মৃত্যু সংখ্যা একদিনে ১৫০০ জন ছাড়িয়ে গেছে। গত ২০ এপ্রিল দিল্লিতেই মৃত্যু ঘটেছে ২৪০ জনের। দেশের মধ্যে সব থেকে খারাপ অবস্থা দিল্লি, মহারাষ্ট্র, গুজরাট, উত্তরপ্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের। সর্বত্র হাসপাতালে বেডের আকাল, অক্সিজেন সিলিন্ডারের আকাল চলছে। বিজ্ঞানীরা এর জন্য দায়ী করছেন মানুষের কান্ডজ্ঞানহীনতা এবং শক্তিশালী ভাইরাসের নতুন প্রকারটিকে।

দ্বিতীয় ঢেউ এত ভয়াবহ হল কেন ভারতে?

পরিসংখ্যানের মতে, যে সংখ্যাটি অব্দি পৌঁছতে প্রথম ঢেউ এর সময় এর সময় লেগেছিলো ২০০ দিনের বেশি, সেটি এবার ৩ সপ্তাহের মধ্যে পৌঁছে গেছে। দিল্লির AIIMS এর ডিরেক্টর, ডক্টর রণদীপ গুলেরিয়া এর জন্য দায়ী করেছেন মূলতঃ মানুষের হঠকারিতা এবং তারসাথে কয়েকটি রাজ্যের ভোট কে। তাঁর মতে, বাজারে ভ্যাকসিন আসার খবর পাওয়ার পর মানুষ যেন কোনো কিছুর পরোয়া না করে করোনাবিধির পালন না করেই রাস্তায় বেরিয়েছেন। তার সাথে এই সময়ে বেশ কিছু ধর্মীয় উৎসব এবং তার সাথে কয়েক রাজ্যে ভোটার জন্য মিটিং, মিছিল, সভা হয়েছে অবাধে কোনো করোনাবিধি ভালভাবে না মেনেই।

বিজ্ঞানীরা তার সাথে দায়ী করছেন ভারতের ‘ডাবল মিউট্যান্ট’ ভাইরাস স্ট্রেন টিকে। এটি নিয়ে World Health Organization এর কোভিড কমিটির টেকনিক্যাল হেড, মারিয়া ভ্যান কারখব জানিয়েছেন, “বর্তমানে আমরা এর এই নতুন রূপান্তরটির দিকেই নজর দিয়েছি। পৃথিবীর যেখানেই হোক, এই রূপান্তরটির উপস্থিতি খুবই উদ্বেগের।” বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন এই রূপান্তরটির নাম B.1.617 এবং একে ডাবল মিউট্যান্ট বলার কারণ হচ্ছে রূপান্তরটির দুটি পরিব্যাক্তি বা মিউটেশন হয়েছে, যেগুলি হল যথাক্রমে – E484Q এবং L452R । এই রূপান্তরটি আগেকার গুলোর থেকে ক্ষেত্রবিশেষে ৫২% অব্দি বেশি শক্তিশালী। ভারতের স্বাস্থ্যমন্ত্রক ১৬ই এপ্রিল বিবৃতিতে জানিয়েছিল যে এই রূপান্তরটি ব্রাজিল, আফ্রিকা, আমেরিকা, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি ইত্যাদি দেশে ইতিমধ্যে দেখা গেছে।

এই নতুন রূপান্তর এবং তার জন্য কী কী পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে?

এই নতুন রূপান্তরটি আসার পর কিছু কিছু নতুন উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। যেমন, পেশীতে ব্যাথা, গলা ব্যাথা, খুসখুসে কাশি, চোখ ওঠা বা কঞ্জাঙ্কটিভাইটিস, মুখের ভেতর ক্রমাগত শুকিয়ে যাওয়া বা থুতু না হওয়া ইত্যাদি। এই নতুন রূপান্তরটি ইতিমধ্যে SARS-CoV-2 এর প্রামাণ্য পরীক্ষা RT-PCR এর টেস্টকেও এড়িয়ে যাচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে। ইতিমধ্যে বিশেষজ্ঞরা PCR এর পরিচালন সাইকেল বৃদ্ধি করতে পরামর্শ দিয়েছেন। এই রূপান্তরটির ক্ষেত্রে তথ্য বলছে কমবয়সীরা ব্যাপকহারে আক্রান্ত হচ্ছে। দিল্লি সরকার সম্প্রতি জানিয়েছে, মোট আক্রান্তের ৬৫% এরও বেশি রোগীর বয়স ৪৫ বছরের নীচে।

দ্বিতীয় ঢেউ-এ বিশেষজ্ঞরা কী পরামর্শ দিচ্ছেন?

প্রথমত সমস্ত করোনাবিধি অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলতে হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব বেশি করে মানুষকে ভ্যাকসিন দিতে হবে। সমীক্ষা অনুসারে কোনো জনসংখ্যার ৭৫% লোকজন ভ্যাকসিন পেলে ‘হার্ড ইম্যুনিটি’ অর্জন করা সম্ভব। সেই লক্ষ্যেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে বাজার চলতি নোভোভক্স, অস্ট্রোজেনকা ইত্যাদি কোম্পানির বানানো ভ্যাকসিন আফ্রিকান রূপান্তরের উপরে ৫০% এরও কম কার্যকরী। কিন্তু ভ্যাকসিন নিলে দেহে যে এন্টিবডি তৈরী হবে, তা SARS-CoV-2 কে দেহে মারাত্মক কোনো ক্ষতি করার আগেই রুখে দিতে পারবে। আর যারা সেরে উঠেছেন, তারা পুনরায় আক্রান্ত হলে দেহে থাকা Memory T Cells ভাইরাসটিকে চিনে নিয়ে দ্রুত তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে দেহে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। ইতিমধ্যে বিখ্যাত Lancet জার্নালে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে সেখানে দাবি করা হয়েছে SARS-CoV-2 প্রায় তিনঘন্টা বাতাসে ভেসে কার্যকরী থাকতে পারে। ভীষণ দ্রুত রূপান্তর করতে পারে এবং তা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে হলে দরকার সঠিক ভাবে সমস্ত বিধি মেনে চলা এবং দ্রুত ভ্যাকসিন নেয়া।