কোভিড-১৯ থেকে আমরা কী শিক্ষা পেলাম?

সমাজ Contributor
মতামত
কোভিড-১৯
© Anatoly Morozov | Dreamstime.com

নিঃসন্দেহে, মানব সভ্যতার ইতিহাসে নজীরবিহীন এক সময়ে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। এখনো কোভিড-১৯ এর পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান বিপর্যস্ত হচ্ছে। সেইসাথে জনসাধারণের জীবনযাপনও চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।ক্রমবর্ধমান ভয়, দুশ্চিন্তা, আতঙ্ক বয়ে আনার পাশাপাশি এই মহামারী যেন অভূতপূর্ব প্রক্রিয়ায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। ক্ষুদ্র এক অণুজীব সমগ্র মানব সম্প্রদায়কে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে।

পুরো বিশ্ব এখনও ভয়াবহ পরিস্থিতির সাথে লড়াই করছে। মাসব্যাপী দীর্ঘ লকডাউন প্রক্রিয়া থেকে সামান্য সময় কিংবা সব পুনরায় খুলে দেয়ার মাধ্যমে আমরা পরিস্থিতির সাথে নিজেদেরকে খাপ খাওয়াচ্ছি। কোনো কোনো দেশ ভাইরাসকে সাথে নিয়েই জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এ মহামারী থেকে ইসলামের আলোকে আমরা যা শিক্ষা পাই তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিম্নে উল্লেখিত হলঃ

কোভিড-১৯ ও দায়িত্ববোধ

ঘুমন্ত অবস্থা থেকে জাগিয়ে, কোভিড-১৯ যেন আমাদের মধ্যকার দায়িত্ববোধকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সবাই এখন দায়িত্বশীল হওয়ার গুরুত্ব অনুভব করছে।

ইসলামের অন্যতম সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি হলো দায়িত্ববোধ। এটি শিষ্টাচার, আচরণ এবং হঠাত উদ্ভূত পরিস্থিতি কীভাবে সামলাতে হবে তার দিকনির্দেশিকা মানুষকে প্রদান করে। সেই সাথে এটি ইসলামি বিশ্ব দর্শনেরও মূলনীতি, যার মাধ্যমে অধিকার এবং সম্পত্তি রক্ষার জন্য যথাযথ একটি কাঠামো তৈরি হয়েছে।

এই বিষয়টি দর্শন ও আধ্যাত্মিকতা – উভয়ের সমন্বয়ে সৃষ্ট। একজন সত্যিকার মুসলিম কীভাবে চিন্তা করে তা জানার পেছনে এই দুটো দিকই পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করে। সেইসাথে একজন মুসলিম কীভাবে কুরয়ান-সুন্নাহর আলোকে বিশ্বের সাথে একাত্ম হবেন তা জানতেও দর্শন ও আধ্যাত্মিকতার ভূমিকা-ই সবচেয়ে বেশি। দায়বদ্ধতা নিশ্চিতভাবেই এই ধারণাগুলোর মাঝে একটি।

দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রসমূহ

ইসলামে দায়িত্ববোধের মূল কেন্দ্র ব্যক্তি নিজে। সেই সাথে প্রত্যেকেরই অপরের প্রতি কিছু দায়বদ্ধতা রয়েছে। শরীয়াহর দৃষ্টিকোণ থেকে প্রত্যেক ব্যক্তির আইনী অধিকার গঠনের জন্য যা প্রয়োজন তা একজন ব্যক্তিকে দায়িত্ববান হিসেবে তৈরি করে। কিংবা কুরআন যেমন বলেছে, তেমন বিশ্বাসী ও যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে তৈরি করে।

আল্লাহ বলেন,

“আমি আসমান, পৃথিবী ও পর্বতমালার সামনে এই আমানত পেশ করেছিলাম, অতঃপর তারা একে বহন করতে অস্বীকার করল এবং এতে ভীত হল; কিন্তু মানুষ তা বহন করল। নিশ্চয় সে জালেম-অজ্ঞ।” (আল কুরআন-৩৩:৭২)

উপরোক্ত আয়াতটি যা নির্দেশ করে তা হলো – মানুষকে যেমন নির্দিষ্ট কিছু সম্ভাবনা ও বৈশিষ্ট্য দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে যার মাধ্যমে সে অন্যান্য সৃষ্টির তুলনায় শ্রেষ্ঠত্ব পেয়েছে, তেমনি সেই সম্ভাবনাগুলো বিকশিত করে তোলার জন্য তার নিজেরও কিছু দায়বদ্ধতা রয়েছে। মানুষের প্রতি এটাই আশা করা হয়েছে যে, সে যা বহনের প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছিল, তা পালনে সফলকাম হবে।

নৈতিকতা ও আইনি বাধ্যবাধকতা

সমাজের প্রতিটি মানুষকেই কিছু না কিছু বাধ্যবাধকতা মেনে কাজ করতে হয়। যদি কোনো কাজ সীমালঙ্ঘনের কাতারে পড়ে যায় তবে তা দণ্ডনীয় হয়ে উঠে।

তাই, এ সকল দায়বদ্ধতা মেনে চলা আপনার অধিকারভুক্ত। এগুলো আপনার ব্যক্তিগত অধিকারের পর্যায়েই পড়ে যা আপনার শরীর ও আত্মার সাথে সম্পর্কিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

“তোমার শরীরের উপর তোমার অধিকার রয়েছে, তোমার চোখের উপরও তোমার অধিকার রয়েছে।” (বুখারী)

যদি আমরা বর্তমান করোনা সংকটের সাথে মিল খুঁজতে যাই তাজলে আমরা সহজেই অবগত হতে পারব যে, ব্যক্তিগত অধিকার ও শারীরিক সুরক্ষার বিষয়ে এ সকল নির্দেশনাবলী আমাদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যিনি আসলেই দায়িত্ববান মুসলিম, তিনি পূর্ব থেকেই এগুলোর উপর সজাগ দৃষ্টি রাখতেন।

বর্তমানে করোনা ভাইরাস আমাদের বেঁচে থাকার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সংকটময় পরিস্থিতি আমাদের কাছে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মাধ্যমে আমাদের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ হয়তো আমাদের পরীক্ষা নিচ্ছেন। তিনি এ পরীক্ষার দ্বারা আমাদের বিশ্বাস, দক্ষতা, অর্জিত জ্ঞান, ধৈর্য্য সবকিছুরই পরীক্ষা নিচ্ছেন।

কীভাবে এ পরীক্ষায় পাস করবেন

মানুষ যদি তার উপর অর্পিত দায়িত্ববোধ থেকে বিচলিত হয়ে না পড়ে তাহলে তার এ যুদ্ধে জয়লাভের সুযোগ রয়েছে। আল্লাহ তা’আলা তাকে ভরসা দিয়েছেন এই সত্যটি মেনে নিয়ে মানুষ জয়লাভ করতে পারে। সুতরাং মানুষকে দায়িত্ব নেওয়ার সাথে সাথে আন্তরিকভাবে তা বিশ্বাস করতে হবে।

এই পরিস্থিতিতে বিপর্যয়, সংঘাত ইত্যাদির স্মরণ খুবই কষ্টদায়ক। মানুষ যদি দায়িত্বশীলতার সাথে এ অবস্থা মোকাবিলা করার মানসিকতা অর্জন করতো তবে সহজেই এটি দূর করা যেত।

কুরআনে বলা হয়েছে,

“যে কেউ সৎপথে চলে, তারা নিজের মঙ্গলের জন্যেই সৎ পথে চলে। আর যে পথভ্রষ্ট হয়, তারা নিজের অমঙ্গলের জন্যেই পথ ভ্রষ্ট হয়। একে অপরের বোঝা কেউ বহন করবে না।” (আল কুরআন-১৭:১৫)

আমরা দেখতে পাচ্ছি যে কোভিড-১৯ এর প্রতি অসতর্কতা বর্তমানে মৃত্যুর হার কীভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। নিজের প্রতি দায়বদ্ধতা, অসচেতনতা এই ব্যর্থতার অন্যতম একটি কারণ।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটাই সত্যি যে, মানুষ ভুল পথেই অগ্রসর হয় বেশি এবং সত্যকে উপহাস করে তারা দূরে ঠেলে দেয়। তারা এমনকিছুতে বিশ্বাস স্থাপন করে যার কোনো পরিপূর্ণ নির্দেশনা তাদের নিকটে নেই। যার ফলে তারা নিজেদের ধ্বংস ঢেকে আনে। পবিত্র কুরআনেও উল্লেখিত হয়েছে,

“যদি আমি ওদের সামনে আকাশের কোন দরজাও খুলে দেই আর তাতে ওরা দিনভর আরোহণ ও করতে থাকে; তবুও ওরা একথাই বলবে যে, আমাদের দৃষ্টির বিভ্রাট ঘটানো হয়েছে না বরং আমরা যাদুগ্রস্ত হয়ে পড়েছি.” (আল কুরআন-১৫:১৪-১৫)

একতা

মানুষ সামাজিক জীব। একে অপরের পাশে থাকা এবং একে অপরের দেখাশোনা করার মত ব্যাপারগুলো আমাদের জন্য স্বাভাবিক।

এটি ইসলামিক গুণাবলীর মধ্যেও অন্যতম। কোভিড-১৯ এর প্রকোপ ছড়িয়ে পড়ার পর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অন্যের জীবনরক্ষার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার মতো সাহসী এবং সুন্দর ছবিগুলো বারংবার আমাদের সামনে আসছে। বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং দাতা সংস্থাগুলো অন্যের প্রয়োজনে নিজেদের সর্বোচ্চ বিলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

ইসলামে শুধুমাত্র কালেমায়ে শাহাদাহ পাঠ করা কিংবা বিশ্বাসের ঘোষণা দেওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং এই সাক্ষ্য অনুযায়ী কাজেও শামিল হতে হবে। এই কাজ করার জন্য শর্ত রয়েছে। একটি হলো – ইখলাস বা বিশুদ্ধ নিয়্যাত এবং আরেকটি হলো ‘শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য’ এই মনোভাব।