SalamWebToday নিউজলেটার
Sign up to get weekly SalamWebToday articles!
আমরা দুঃখিত কোনো কারণে ত্রুটি দেখা গিয়েছে:
সম্মতি জানানোর অর্থ, আপনি Salamweb-এর শর্তাবলী এবং গোপনীয়তার নীতি মেনে নিচ্ছেন
নিউজলেটার শিল্প

ক্যান্সারের চিকিৎসায় ভরসা রেডিওথেরাপি-র নতুন দিক ব্র্যাকিথেরাপি

স্বাস্থ্য ১২ ফেব্রু. ২০২১
জানা-অজানা
রেডিওথেরাপি
© Thomashecker | Dreamstime.com 2 4

ক্যান্সার, এই মারণরোগের চিকিৎসা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনও গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। সেই অর্থে ক্যান্সারের কোনও ওষুধ এখনও বেরোয়নি। তাই বলে কি এই অসুখের চিকিৎসা হয় না? অবশ্যই হয়, আর সেই চিকিৎসার অন্যতম ভিত্তি রেডিওথেরাপি । ২০১৫ সালে যখন প্রোস্টেট ক্যান্সারের নতুন চিকিৎসা ব্র্যাকিথেরাপির জন্য থ্রিডি প্রিন্টেড আবরণ আবিষ্কার করলেন বিজ্ঞানীরা, তখন রেডিওথেরাপি-র গুরুত্ব যেন আরেকবার প্রমাণিত হল। বর্তমানে বিশ্বে যে কজন ক্যান্সারের রুগী রয়েছেন তাঁদের প্রায় দুই তৃতীয়াংশকে রেডিওথেরাপির মাধ্যমে নিয়মিত চিকিৎসা করা হয়।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, উইলহেলম রন্টজেন এক্স রে আবিষ্কারের প্রায় তিরিশ বছর পর প্রথম ক্যান্সারের চিকিৎসায় রেডিওথেরাপির সূচনা। এমিল গ্রুবে নামক এক ডাক্তারি ছাত্র তাঁর প্রফেসরকে অনুরোধ করেন ব্রেস্ট ক্যান্সারের এক রোগিণীর উপর রেডিওথেরাপির প্রয়োগ করতে। এই বিশেষ রোগিণী ক্যান্সারের এমন এক স্তরে ছিলেন যেখানে তৎকালীন প্রচলিত কোনও চিকিৎসাব্যবস্থাই কাজ করছিল না। অদ্ভুত ভাবে, রেডিওথেরাপি প্রয়োগ করার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর অসুখের খানিক উপশম হয়। এই এমিল গ্রুবে পরবর্তীকালে বিশ্বের প্রথম রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট হিসাবে পরিচিত হন। এর কয়েক বছরের মধ্যেই ইউনাইটেড স্টেটস, ইউরোপ হয়ে সারা বিশ্বে এই থেরাপির জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে।

রেডিওথেরাপি আসলে কী?

রেডিওথেরাপি আসলে এমন এক চিকিৎসা যেখানে উচ্চশক্তিসম্পন্ন এক্স রে বা গামা রে ব্যবহার করে ক্যান্সার আক্রান্ত কোশকে ধ্বংস করা হয়। কখনও কখনও এই কোশের বৃদ্ধি ও বিভাজনও ধ্বংস করা হয়। সাধারণত মেশিনের সাহায্যেই সরাসরি বিকিরণের মাধ্যমে এই চিকিৎসা করা হত। কিন্তু কালক্রমে চিকিৎসকরা এই পদ্ধতির কিছু কুফল দেখতে পান।

প্রচলিত রেডিওথেরাপি-র কিছু কুফল

প্রচলিত রেডিয়েশন বা রেডিওথেরাপির সবচেয়ে বড় সমস্যা হল এটি ক্যান্সার আক্রান্ত কোশ ও সুস্থ কোশের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। ফলে, যে সমস্ত টিউমার শরীরের অনেকটা গভীরে রয়েছে সেগুলোকে সঠিকভাবে ধ্বংস করা এই রেডিওথেরাপির পক্ষে সম্ভব হয় না। উপরন্তু, সুস্থ কোশ ও টিস্যুর ক্ষতি হয় অনেকাংশেই। এছাড়া, ক্রমাগত চামড়া ওঠা, চুল ওঠা, ত্বকে ক্ষত, পেশিতে ক্লান্তি ও কাঠিন্য এগুলো তো রয়েইছে। আনুষঙ্গিক খিদে চলে যাওয়া, ক্রমাগত ক্লান্তি ও বমিভাব এগুলোর সম্মুখীনও অনেকসময় হন অনেক মানুষ। বর্তমানে উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার ফলে এই কুফল অনেকাংশে দূর করা গেলেও চিকিৎসকরা ধীরে ধীরে রেডিওথেরাপির অন্য একটি পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছেন।

রেডিওথেরাপি-র নতুন পদ্ধতি

এক্স রশ্মি বা গামা রশ্মি তো আসলে কৃত্রিম ভাবে তৈরি তেজস্ক্রিয় রশ্মি। প্রকৃতিতে এমন অনেক তেজস্ক্রিয় পদার্থ রয়েছে যেগুলি নিজে নিজেই তেজস্ক্রিয় অণু বিকিরণ করে। এগুলি হল পোলনিয়াম, রেডিয়াম, আয়োডিন-১২৫ ও প্যালাডিয়াম-১৩১। ১৯২০ সালে অনেক চিকিৎসকই এই ধরনের প্রাকৃতিক তেজস্ক্রিয় পদার্থকে ক্যান্সার কোশের কাছে রেখে বা প্রবেশ করিয়ে চিকিৎসার পক্ষপাতী ছিলেন। এই পদ্ধতিকে বলা হয় ব্র্যাকিথেরাপি। বিশেষ করে সারভাইকাল ও ইউটেরিয়ান ক্যান্সারে এর বিশেষ জনপ্রিয়তা ছিল। সেই ব্র্যাকিথেরাপিকেই এবার প্রোস্টেট ক্যান্সারের ক্ষেত্রে ফিরিয়ে আনলেন বিজ্ঞানীরা।

ভ্যাঙ্কুভার ক্যান্সার সেন্টারের গবেষকরা জানিয়েছেন আক্রান্ত প্রোস্টেটে খুব অল্প পরিমাণ পোলনিয়াম ‘সিড’ প্রবেশ করিয়ে বা ইমপ্ল্যান্ট করিয়ে দেখা গিয়েছে রোগের প্রকোপ কমছে। শুধু তাই নয়, যে সমস্ত রুগী রেডিয়েশন ইমপ্ল্যান্ট নিয়েছেন তাঁরা প্রচলিত রেডিয়েশন চিকিৎসার থেকে অনেক দ্রুত সামলে নিচ্ছেন। ব্র্যাকিথেরাপি আসলেই ভীষণভাবে সাহায্য করছে বিজ্ঞানীদের।

তাঁরা ৩৯৮ জন মানুষের উপর এই গবেষণাটি চালিয়েছেন যারা আর কোনও রকম প্রচলিত চিকিৎসাতেই সাড়া দিচ্ছিলেন না। এঁদের প্রোস্টেটের কাছে পোলনিয়াম বা প্যালাডিয়ামের একটি ‘সিড’ ইমপ্ল্যান্ট করে দেন। এই মৌল থেকে নির্গত তেজস্ক্রিয় অণু ধীরে ধীরে ক্যান্সার কোশকে আক্রমণ করে রোগের প্রকোপ কমিয়ে আনে।

কিন্তু এতেও সুস্থ কোশের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিজ্ঞানী জেমস মরিসের মতে, এই তেজস্ক্রিয় ‘সিড’ বিভিন্ন দিকে তেজস্ক্রিয়তা বিকিরণ করে। ফলে নানা সমস্যা দেখা যায়। বিশেষ করে এই ক্ষেত্রে আক্রান্তরা মলদ্বারে ক্ষত, মূত্রনালির সমস্যা ইত্যাদির সম্মুখীন হন।

আবরণের আবিষ্কার

তাই বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছিলেন এমন এক পদ্ধতি বের করার যেখানে ‘সিড; সরাসরি আক্রান্ত কোশ বা টিউমারে ইমপ্ল্যান্ট করা যায় একটি আবরণের আবৃত করে। অতঃপর, ২০১৫ তে থ্রিডি প্রিন্টিং টেকনোলজির সাহায্যে ঐ ‘সিড’-এর এমন এক শিল্ড বা আবরণ তৈরি করা গিয়েছে যা সুস্থ কোশকে আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা করবে। জৈব প্লাস্টিক ও বেরিয়াম সালফেট ব্যবহার করে এই আবরণ তৈরি করা হচ্ছে। বেরিয়াম সালফেট মানবদেহে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ প্রতিরোধ করে। সুতরাং এই আবরণের মধ্যে যে তেজস্ক্রিয় সিড দেওয়া হয় তা আক্রান্ত কোশের বাইরে কিছুতেই বিকিরণ হতে পারবে না।

এই পদ্ধতি ছাড়াও আরও অন্য পদ্ধতিতে রেডিয়েশন দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে এখন। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, থাইরয়েডের ক্যান্সারে ইনজেকশন ও তরল ওষুধের মাধ্যমে তেজস্ক্রিয় আয়োডিন প্রদান করা হচ্ছে আক্রান্তদের। থাইরয়েড গ্রন্থি আমাদের দেহ থেকে আয়োডিন শোষণ করে। এই আয়োডিন থাইরয়েড গ্রন্থিতে সঞ্চিত হয়ে ক্যান্সারের কোশকে ধ্বংস করছে।

যদিও বেরিয়াম সালফেটের আবরণে আবৃত তেজস্ক্রিয় ‘সিড’ ব্র্যাকিথেরাপি এখনও সমস্ত ক্যান্সারের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়নি, তবে এটা বলা যায় প্রোস্টেট ক্যান্সারে নিঃসন্দেহে ভরসা জাগাচ্ছে এই চিকিৎসা।