শরিয়াহ সম্মত ওয়েব পরিবেশ. আরওসন্ধানকরুন

ক্যামেরার তাৎপর্য প্রথম বিশ্লেষণ করেন আরব পদার্থবিজ্ঞানী ইবনে হাইসাম

Ibn Al-Haytham
Arab scholar Alhazen also known as Ibn al-Haytham portrait from ten old dinars Iraq banknote. dreamstime_xs_117582332

আজকের এ বিশ্বকে যে সকল মুসলিম বিজ্ঞানী স্ব-স্ব অবদানের দ্বারা সমৃদ্ধ করে স্বরণীয়-বরণীয় হয়ে আছেন; হাসান ইবনে হাইসাম তাঁদের অন্যতম। তাঁর পুরো নাম আল হাসান ইবনে আল হাইসাম। কিন্তু তিনি পশ্চিমা বিশ্বে আল হাজেন নামেই সুপরিচিত। তিনি ছিলেন বিজ্ঞানের এক উজ্জল আলোকবর্তিকা। দৃষ্টিবিজ্ঞান, আলোকবিজ্ঞান এবং আলো সম্পর্কে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।

ইসলামি সভ্যতার সোনালি যুগ ৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন বিজ্ঞানী ইবনুল হাইসাম। এ সোনালি যুগে জন্মগ্রহণ করে তিনি আলোকবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত, আবহাওয়াবিজ্ঞান, দৃষ্টি সম্বন্ধীয় বিষয় এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

বহুমুখী প্রতিভাধর এ বিজ্ঞানী বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় দুইশত গ্রন্থ রচনা করেন। এর মধ্যে অন্যান্য বিষয় ছাড়া অংকে ৪১টি, জ্যামিতিতে ২৬টি এবং ইস্তাম্বুলের অধ্যাপক ইসমাইল পাশা’র তথ্য অনুযায়ী পদার্থবিদ্যায় ১১টি গ্রন্থ রচনা করেন। এছাড়াও বিভিন্ন লাইব্রেরিতে তাঁর ১৩টি পদার্থবিজ্ঞানের বই পাওয়া গেছে। পদার্থবিদ্যায় তাঁর রচিত গ্রন্থ তুলনামূলক কম হলেও আলোকবিজ্ঞানের উপর রচিত ‘কিতাবুল মানাজির’ তাঁকে বিশিষ্ট স্থান দান করেছে। যার জন্য মধ্যযুগের ইউরোপে তাঁকে দ্বিতীয় টলেমি কিংবা কেবল পদার্থবিদ নামে সম্মানিত করা হয়।
পদার্থ বিজ্ঞানের সব শাখাতেই ইবনুল হাইসামের অবদান রয়েছে। তবে আলোকবিজ্ঞানের অবদানই তাঁকে আজ স্বরণীয় করে রেখেছে। তিনি আলোর প্রতিফলন, প্রতিসরণ এবং এই প্রতিফলন-প্রতিসরণের ফলে সৃষ্ট নানাবিধ দৃষ্টি বিভ্রম ও মরীচিকা সম্মন্ধে বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রদান করেন। আলোর সম্মন্ধে টলেমির থিওরিকে তিনি ভুল প্রমাণ করে দেখান যে, এটি কেবল ক্ষুদ্র কোণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, বৃহৎ কোণের বেলায় এটা খাটে না। ইবনুল হাইসামের মতে, একটি হালকা স্বচ্ছ মাধ্যম থেকে অপেক্ষাকৃত ভারী স্বচ্ছ মাধ্যমে প্রবেশ করার সময় আলোর যে দিক পরিবর্তন হয়, বিভিন্ন মাধ্যমে আলোর বেগের তারতম্যই তার কারণ।

ড. রাজী উদ্দিন সিদ্দিকীর মতে, বর্তমানে স্নেলের সূত্র নামে পরিচিত আলোর প্রতিফলন ও প্রতিসরণের নিয়ম ইবনুল হাইসাম আবিষ্কার করেন। তিনি আলোর আপতন ও প্রতিসরণ পথ এবং এই দুই মাধ্যমের অন্তর্বর্তী সমতলের উপর অঙ্কিত সরলরেখা একই সমতল ক্ষেত্রের উপর অবস্থিত এ পর্যন্ত আবিষ্কার করেন। বর্তমানে ইংরেজি লেন্স শব্দটি ইবনুল হাইসামের আরবিতে ব্যবহৃত ‘আদাসা’ থেকে উদ্ভূত হয়েছে। ‘আদাসা’ অর্থ মসুরের ডাল, চোখের লেন্স মসুরের ডালের মতো। তাই ল্যাটিন অনুবাদকরা এই আদাসাকে Lenticulum বলে অনুবাদ করেন। এই শব্দটি আজ lens নামে পরিচিত হচ্ছে। পদার্থ বিদ্যার আলোর শাখায় তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান ‘কিতাবুল মানাজির’। এই গ্রন্থে তাঁর প্রস্তাবিত তাত্তিক মতবাদ বিজ্ঞানে নতুন পথ খুলে দেয়। এতে তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, চোখ থেকে আলোকরশ্মি বস্তুর উপরে পড়লেই সে বস্তুটা দেখা যায় না। বরং বস্তু থেকে আলো আমাদের চোখে এসে পড়লেই তবে সে বস্তু আমরা দেখতে পাই। তাঁর ‘কিতাবুল মানাজির’ গ্রন্থটি জিরার্ড ও উইটেলে কতৃক ল্যাটিনে অনূদিত হওয়ার ফলে এটি পড়ে তৎকালীন বহু পণ্ডিত অপটিকস বা আলোকবিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট হন। তাঁদের মধ্যে ফ্রান্সিস বেকন, রজার বেকন, লিউনার্দো দ্য ভিঞ্চি, পেকহাম, কেপলার, গ্যালিলিও গ্যালিলিই উল্লেখযোগ্য।

ইবনুল হাইসাম পিনহোল ক্যামেরা নামে একটি ক্যামেরা তৈরি করেছিলেন, যাকে পৃথিবীর প্রথম ক্যামেরা হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এটি ছিল আলো নিরোধক একটি কাঠের বাক্স। এর কোনো এক পৃষ্ঠে ছোট একটি ছিদ্র হতো, একটি পিন দিয়ে ছিদ্র করলে যতটুকু ছিদ্র হয় ঠিক ততটুকু। তাই এই ক্যামেরার নাম ছিল পিনহোল ক্যামেরা। অন্ধকার ঘরে আলোর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য এবং নিরাপদ উপায়ে সূর্যগ্রহণ দেখার জন্য তিনি এটি ব্যবহার করতেন।

তার ছোট-বড় অবদান রয়েছে অ্যানাটমি বা অঙ্গব্যবচ্ছেদবিজ্ঞান, জোতির্বিজ্ঞান, গণিত, চিকিৎসাবিজ্ঞান, প্রকৌশলবিদ্যা, চক্ষুবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, অর্থনীতি, দর্শন এবং সর্বোপরি বৈজ্ঞানিক গবেষণার পদ্ধতিগত উন্নয়নে!

প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা, সবই তিনি বাগদাদে লাভ করেন। তিনি ছিলেন ধনী পরিবারের সন্তান। সে সময়ে অধিক ব্যয়বহুল হওয়ায় কেবল সমাজের ধনীক শ্রেণীই উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারতো। অন্যান্য মুসলিম পরিবারগুলোর মতো ইবনে আল হাইসামেরও শিক্ষা জীবন শুরু হয় বসরার একটি মক্তব থেকে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে।

তার জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে কায়রোতে তৎকালীন খলিফা হাকিমের রাজ্যে ভ্রমণ। খলিফা হাকিম তাকে নীলনদের বন্যা নিয়ন্ত্রণের উপায় বের করার দায়িত্ব দেন। উচ্চাভিলাষী এক পরিকল্পনা তৈরি করে কাজ শুরু করার পর ইবনে আল হাইথাম বুঝতে পারেন যে, তখনকার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা দিয়ে সেই প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। অগত্যা সে পরিকল্পনা থেকে তাকে বেরিয়ে আসতে হয়েছিল। তবে এখানে একটি প্রচলিত গল্প রয়েছে। কাজে ব্যর্থ হয়ে হাইথাম খলিফার ক্রোধ থেকে বাঁচতে নাকি পাগলের ভান করেছিলেন এবং গৃহবন্দী হয়ে থেকেছিলেন একেবারে খলিফা হাকিমের মৃত্যু পর্যন্ত! আর এই গৃহবন্দী অবস্থায়ই তিনি লিখেছিলেন তার সেরা বই, ‘বুক অব অপটিকস’, যাকে কিনা নিউটনের প্রিন্সিপিয়া ম্যাথম্যাটিকার সাথে পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী বই গণ্য করা হয়। ১০৪০ খ্রিস্টাব্দে কায়রোতেই মৃত্যুবরণ করেন ইবনে আল হাইথাম। তার ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার, বিয়ে, সন্তান সম্বন্ধে কিছুই জানা যায় না। তবে তিনি ইতিহাসে জীবন্ত হয়ে আছেন তার কাজের দ্বারা।

কিছুবলারথাকলে

যোগাযোগকরুন