ক্ষমাশীল হওয়া ঠিক কতটা উচিৎ আজকের যুগে?

আকীদাহ Contributor
ক্ষমাশীল
Fotoğraf: Kawin Harasai-Unsplash

বান্দা আল্লাহর নিকটবর্তী হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং ক্ষমার মাধ্যমে। কুরআনে মুমিনের পরিচয় দেওয়া হয়েছে এভাবে, ‘যারা তাদের ক্রোধকে সংযত রাখে এবং মানুষকে ক্ষমা করে দেয়।’

অতঃপর আল্লাহ বলেনঃ

নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদের পছন্দ করেন। (আল কুরআন-৩:১৩৪)

ঈমানের এই অবস্থান এবং বৈশিষ্ট্য অর্জন করার জন্য আমাদেরকে এমন কিছু মানুষের গল্প শুনতে হবে যাঁরা বিগত রমজানে কেবলমাত্র খাওয়া-দাওয়াই ছেড়ে দেননি বরং রাগ ও ক্ষোভ ছেড়ে দেওয়ারও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ক্ষমাশীল হয়েছেন।

এক ধর্মান্তরিত বোন তাঁর ক্ষমাশীল হওয়ার অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন

প্রায় ১০ বছর আগে আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পূর্বে আমার সামনে অনেক বাধা ছিল। আমি ভাবতাম- আমার বাবা-মা না জানি কি বলবেন? আমার ভাই বোনরাই বা কি মনে করবেন? যেখানেই যাব সেখান থেকেই কি আমি নির্বাসিত হব? আমি কখনও কল্পনাও করিনি যে, আমার সবথেকে কাছের বন্ধুগুলোও আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেবে। এটাই আমার সবচেয়ে বড় ভয় ছিল, কিন্তু অবশেষে ঠিক তাই ঘটেছিল।

আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুটি জানত যে, আমি ইসলাম সম্পর্কে খুব গভীরভাবে চিন্তা করছি। তবে সে আমাকে কিছুই বলেনি যতদিন না আমি তাকে আমার মুসলিম হওয়ার কথা বলেছি। আমার মুসলিম হওয়ার কথা শুনার পর সে আমাকে আরবদের সম্পর্কে বিভিন্ন খারাপ মন্তব্য করতে লাগল যেগুলোর সাথে না ইসলামের কোনো সম্পর্ক আছে আর না আমার। আমি তখনও ক্ষমাশীল ছিলাম।

যখন আমি তাকে ইসলামের সরল পথের কথা এবং যা আমি ইসলাম সম্পর্কে যা জেনেছি তা তাকে বলতে লাগলাম, তখন সে আমার কোনো কথাই শুনল না।

সে আমাকে বলল, সে আমার জীবনে আর এক মুহূর্তের জন্যও থাকবে না এবং আমার সাথে পুরোপুরি সম্পর্ক ছিন্ন করবে। আমি তাকে ছাড়া জীবনে অনেক শূন্যতা অনুভব করেছি এবং তার খারাপ আচরণে অনেক কষ্ট পেয়েছি। পাঁচ বছর কেটে গেল… কিন্তু তার সাথে আর কোনো কথা হলো না। অবশেষে তার সাথে আমাদের গ্রামের বাড়িতে একদিন দেখা হলো। সে এমন ভান করল যে কিছুই যেন হয়নি।

তার দ্বিমুখিতা দেখে আমি অবাক হলাম। তবে আমি ভেবেছিলাম- সে যখন তার ক্ষোভকে ভুলে যেতে রাজি, তখন আমি কেন সেই কঠোর অনুভূতিগুলোকে মনে রাখব? বিগত কয়েক বছর ধরে আমাদের জীবন কীভাবে চলছিল সে সম্পর্কে আমরা আলোচনা করলাম। আমাদের নতুন মোবাইল নম্বর এবং ইমেইল আমরা পরস্পরের সাথে আদান-প্রদান করলাম। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বাধাটি কাটিয়ে উঠতে পেরে আমি খুব উত্তেজিত ছিলাম।

ক্ষমাশীল হওয়ার উপকারঃ

কিন্তু আমি আমার মাথা থেকে সমস্ত প্রশ্ন ঝেড়ে ফেলতে পারলাম না। আমার জানতে ইচ্ছা করছিল যে, তার মধ্যে কিভাবে এমন পরিবর্তন আসল? সে কেন আমার সাথে আবার কথা বলল? সে তো জানত যে, আমি মুসলিম। তাহলে কি সেও ইসলাম সম্পর্কে জেনেছে? ইসলাম সম্পর্কে তার ভুল ধারণাগুলো কি ভেঙে গেছে? কৌতুহল আমাকে পেয়ে বসল। তাই, তৎক্ষণাৎ আমি তাকে একটি ইমেইল করলাম যে, কেন তার মধ্যে এমন পরিবর্তন দেখা দিল।

তার প্রতিক্রিয়া ছিল বেদনাদায়ক। সে আমাকে বলতে শুরু করল যে আমি এমন কিছু হওয়ার চেষ্টা করছিলাম যা আমি কখনই হতে পারি না এবং আমি কেবল একজন সন্ত্রাসী এবং মিথ্যাবাদীI আমার পায়ের তলাথেকে মাটি সরে গিয়েছিল, আমি আঘাত পেয়েছিলাম এবং ছিটকে পড়ছিলাম। দ্বিতীয়বারের মতো তাকে আমার মনে আঘাত করতে দেওয়ার জন্য নিজেকে বোকা মনে হচ্ছিল এবং আমি প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলাম যে আমি তাকে আর কখনও ক্ষমা করব না।

[তিন বছর পরে,] আমি তাকে ক্ষমা করব কিনা তা জানতে সে ফেসবুকের মাধ্যমে আমার সাথে যোগাযোগ করে। সে বলেছিল যে সে তাঁর তীব্র অ্যালকোহল আসক্তি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। আমি এটা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আমি নিজেকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে তাকে আর কখনই ক্ষমা করব না।

এবং আমি তার মেসেজটি আমার ইনবক্সে এক সপ্তাহ পড়েছিল। আমি উত্তর দিইনি। তখন রমজান মাস চলছিল এবং আমি সারা বছর ধরে আমার যে বিশ্বাস তা ভেঙ্গে যেতে দেখে ভীষণ খারাপ বোধ করছিলাম।  দুটি বিষয়ই অপ্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়েছিল যতক্ষণ না আমি কুরআনে সূরা [অধ্যায়ে] নূরের [আলো] আয়াত ২২ পড়লাম:

[…] তাদের ক্ষমা করা উচিত এবং পূর্বে চিন্তা করা উচিত। আপনি কি ভালোবাসেন না যে আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন? এবং আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (২৪:২২)

মনের পরিবর্তনঃ

আমার হৃদয় বিগলিত হল। আমি জানতাম আমাকে কী করতে হবে। আমি তাকে ম্যাসেজ দিলাম যে কুরআনের এই আয়াত না পড়া পর্যন্ত তাকে ক্ষমা করার কোনো ইচ্ছা আমার ছিল না। সে বলেছিল যে কুরআনে এত সুন্দর কিছু খুঁজে পেয়ে সে অবাক হয়েছে, আমার ভক্তি দেখে সে বিনীত এবং কৃতজ্ঞবোধ করছে। কিছু দিন পরে, সে জিজ্ঞাসা করল যে কুরআনের একটি অনুলিপি সে পেতে পারে কিনা। আমি তাকে যে কুরআন পাঠিয়েছিলাম তা গ্রহণের এক মাস পরে সে শাহাদাত [ইসলামের প্রতি বিশ্বাসের প্রমাণ] পাঠ করেছিল এবং সত্যিকারের বন্ধু ও ইসলামে আমার বোন হয়েছিল। ক্ষমাশীল হওয়ার পাঠ আমি এভাবেই পাই।

ভাইয়ের হাতে প্রতারিত হওয়া ভাই 

আমি জানি যে আমি নিখুঁত নই। কিছু মানুষ বলে যে আমার আত্ম-সম্মানজনিত সমস্যা আছে। নিজের ত্রুটি সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত সচেতনতার কারণে, আমি অনুমান করি আপনি বলতে পারেন যে আমি মোটামুটিভাবে একজন ক্ষমাশীল মানুষ। সর্বোপরি, আমার নিজের যদি এর খুব প্রয়োজন হয় তবে আমি ক্ষমা করার কে? তবে কখনও কখনও মানুষেরা ইচ্ছাকৃতভাবে এমন ক্ষতিকারক কাজ করে যে এটি আমার ক্ষমাশীল প্রকৃতির জন্য পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়।

আমার ভাই সেই মানুষদের মধ্যে একজন। সে এমন এক ব্যক্তি, আপনি বুঝতেও পারবেন না যে তাঁর উদ্দেশ্যগুলি কোথা থেকে আসছে। এক মুহুর্তে, সে যত্নশীল এবং আন্তরিক এবং পরের মুহুর্তে, সে ধূর্ত এবং কপট হয়ে উঠে। তার খারাপ উদ্দেশ্যগুলি বড় আকারে বেরিয়ে আসে কলেজে আমার শেষ বছরে। আমি দুর্দান্ত খবর পেয়েছিলাম যে আমি ভবিষ্যতে উন্নতিলাভের সম্ভাবনাপূর্ণ ইন্টার্নশিপের জন্য নির্বাচিত হয়েছি।  যা আমি কলেজের নতুন বছর থেকেই কাজ করতে চাইছিলাম। আমার ভাই যে শহরে থাকত ঠিক একই শহরে কাজটা পেয়েছিলাম আমি।

সুতরাং [আমি] গ্রীষ্মের ইন্টার্নশিপের সময় তার জায়গায় থাকার জন্য উঠে পড়েছিলাম, আমার কলেজের শেষ বছরের জন্য কিছু অর্থ সঞ্চয় করতে।

প্রথম প্রথম আমাকে পেয়ে তাকে খুশি মনে হয়েছিল। আমরা বাইরে ঘুরে বেড়িয়েছিলাম এবং একটা ভালো সময় আতিবাহিত করেছিলাম। তারপরে সে টাকা চাওয়া শুরু করল। তাকে এটি দিতে আমার কোনো সমস্যা ছিল না। তবে তাকে আমি যতই দিতাম, সে ততই চাইত।

ক্ষমাশীল হতে পারলাম কি?

তারপরে খারাপ খবরটি এল যে আমি সময় মতো স্নাতক হব না এবং আমার ডিগ্রি পেতে এবং আমার ক্যারিয়ার শুরু করার জন্য আমাকে আরও একটি সেমিস্টার লাগবে। এটি এমন এক ধাক্কা ছিল যা আমি প্রত্যাশা করছিলাম না, তবে আমার ভাই যখন জানতে পারল তখন সে পাল্টে গেল। আমার যাওয়ার কোনও জায়গা নেই এবং আমার সমস্ত টাকা তাকে দিয়ে দিয়েছিলাম তা জেনেও সে আমাকে তার বাসা থেকে বের করে দিল।

এমনকি সে আমার সাথে স্নাতক হওয়ার এক সপ্তাহ আগে পর্যন্ত কোনো কথা ও বলেনি। এটি পরিষ্কারভাবে বুঝতে পেরেছিলাম যে আমার  অর্থোপার্জনের সম্ভাবনা থাকলেই কেবল সে আমার পাশে ছিল। আমি তার ভাই এতে তার কিছু যায় আসে না, সে কেবল ভেবেছিল তার জন্য আমি কী করতে পারি।

আমি তার কাছ থেকে দূরে সরে গিয়েছিলাম। আমি আর তাকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। তবে তখন এক রমজানের শুরুতেই মনে পড়ে গেল যে আল্লাহ কুরআনে বলেছেনঃ

এবং আমরা তোমাদের মধ্যে কিছুকে [মানুষকে] অন্যের পরীক্ষারূপে পরিণত করেছি – তোমরা কি ধৈর্য ধারণ করবে? তোমার পালনকর্তা সর্বদাই দেখেন (আল কুরআন-২৫:২০)।

আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে সে আমার জন্য একটি পরীক্ষা মাত্র। এবং আমি তাকে পুরোপুরি ক্ষমা করে দিয়েছিলাম, এটা জেনে যে ক্ষমা এবং বিশ্বাস দুটি পৃথক জিনিস।

Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.