খাদিজা(রাযিঃ): রাসূল(সাঃ)-এর সবচেয়ে প্রিয়তমা স্ত্রী

নারী ০৩ মার্চ ২০২১ Contributor
ফোকাস
খাদিজা(রাযিঃ)
Photo by Pixabay from Pexels

খাদিজা(রাযিঃ) ছিলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের প্রথম স্ত্রী। সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারীও ছিলেন তিনি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনে রয়েছে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অনেক অবদান। যার সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিম্নে তুলে ধরা হলো-

জন্ম ও পরিচিতি

খাদিজা(রাযিঃ) ৫৫৫ খ্রিস্টাব্দে পবিত্র মক্কা নগরিতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন মক্কার বিখ্যাত ব্যবসায়ী খুয়াইলিদের দ্বিতীয় সন্তান। তাঁর মাতার নাম ফাতিমা বিনতে যায়িদ। তাঁর কুনিয়াত বা উপনাম ছিল ‘উম্মুল হিন্দ’ এবং উপাধি ছিল ‘তাহিরা’।

মুসলিমদের নিকট তিনি উম্মুল মু’মিনিন খাদিজা(রাযিঃ) নামেই পরিচিত। পিতৃ বংশের উর্ধ্ব পুরুষ কুসাই-এর মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে তাঁর বংশপরম্পরা মিলিত হয়েছে। উত্তরাধিকার সূত্রইে খাদিজা(রাযিঃ) ছিলেন একজন বিত্তবান, প্রভাবশালী, বুদ্ধিমতী ও বিদুষী নারী । ছিলেন খুব সুন্দরীও।

ব্যবসায়ী খাদিজা

তাঁর পিতা জীবিত থাকাবস্থাতেই তিনি পিতার ব্যবসা দেখাশুনা করতেন। যদিও তাঁর আরও দুই ভাই এবং তিন বোন ছিল। তবুও বুদ্ধিমত্তার কারণে তিনিই তাঁর পিতার ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।

রাসূল(সাঃ)-এর প্রতিভায় আকৃষ্ট খাদিজা(রাযিঃ)

তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামকে তাঁর ব্যবসার প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেন। সহযোগী হিসেবে তিনি তাঁর বিশ্বস্ত দাস মায়সারাকে রাসূল(সাঃ)-এর সঙ্গ প্রেরণ করেন। রাসূল(সাঃ) খাদিজা(রাযিঃ)-এর পণ্য-সামগ্রী নিয়ে তা বিক্রয় করে আবার মক্কার উপযোগী পণ্য ক্রয় করে মক্কায় ফিরে আসেন। এই পণ্যসামগ্রী বিক্রয় করে অন্যান্য সময়ের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি লাভবান হন।

ব্যবসায়িক সফরের সবকিছু বিশ্বস্ত দাস মায়সারার কাছ থেকে শুনে তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও গুণে মুগ্ধে হয়ে বিবাহের প্রস্তাব পাঠান। অথচ মক্কার অনেক ধনী ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিগণ ইতিপূর্বে তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব দিলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি।

বিবাহ ও সন্তানাদি

খাদিজা(রাযিঃ)-এর বয়স তখন ৪০ বছর এবং রাসূল(সাঃ)-এর বয়স ২৫ বছর। এভাবে আল্লাহ তা’আলা জাহেলি যুগের তাহিরা(পবিত্র নারী)-এর সঙ্গে আলআমিন(বিশ্বস্ত)-এর বিবাহের ব্যবস্থা করবেন। বিবাহে উভয় পক্ষের খরচ খাদিজা(রাযিঃ) নিজেই বহন করেন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঔরসেই তাঁর দুই ছেলে ও চার মেয়েসহ মোট ছয় সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। প্রথম সন্তান কাসিম অল্প বয়সে মক্কাতেই ইন্তেকাল করেন। তৃতীয় সন্তান আবদুল্লাহ রাসূল(সাঃ)-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির পর জন্মগ্রহণ করেন এবং অল্প বয়সেই ইন্তেকাল করেন। দ্বিতীয় সন্তান যয়নাব, চতুর্থ সন্তান রুকাইয়া, পঞ্চম সন্তান উম্মে কুলসুম এবং ষষ্ঠ সন্তান ফাতিমা।

রাসূল(সাঃ)-এর খেদমতে খাদিজা(রাযিঃ)

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম যে নবুওয়াত লাভ করবেন তা খাদিজা(রাযিঃ) আগে থেকেই জানতে পেরেছিলেন। সে কারণেই রাসূল(সাঃ)-এর নবুওয়াত লাভের পূর্বে হেরা গুহায় ধ্যনমগ্ন থাকাকালীন সময়ে তিনি রাসূল(সাঃ)-কে সর্বপ্রকার সহযোগিতা করতেন।

জিব্রাইল(আঃ)-এর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে রাসূল(সাঃ) ভয় পেলে খাদিজা(রাযিঃ)-ই তাঁকে অভয় দিয়ে বলেছিলেন, “আপনি কখনও কারও ক্ষতি করেননি, তাই কেউ আপনার ক্ষতি করবে না।” এমনকি তাঁকে মানসিকভাবে শক্তি যোগাতে তিনি তাঁর চাচাতো ভাই তাওরাতের বিশেষজ্ঞ ওয়ারাকা বিন নওফেলের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন।

সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী খাদিজা(রাযিঃ)

খাদিজা(রাযিঃ)-এর সাথে বিয়ের পনের বছর পর রাসূল(সাঃ) নবুওয়াত লাভ করেন। নবুওয়াত লাভের পর ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন খাদিজা(রাযিঃ)। ইসলাম গ্রহণের পর খাদিজা(রাযিঃ)তাঁর সকল ধন-সম্পদ দ্বীনের লক্ষ্যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাতে হস্তান্তর করে দেন।

ধৈর্য ও সহনশীলতা

নবুওয়াত লাভের পর রাসূল(সাঃ) ব্যবসা-বাণিজ্য ছেড়ে আল্লাহর ইবাদত এবং ইসলামের কাজে পুরোপুরিভাবে আত্মনিয়োগ করেন। সংসারের সকল আয় বন্ধ হয়ে যায়। ধৈর্য ও সহনশীলতার সঙ্গে খাদিজা(রাযিঃ) সব প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবিলা করেন।

ইসলামের দাওয়াত মুশরিকদের প্রত্যাখ্যান ও অবিশ্বাসের কারণে রাসূল(সাঃ) যে ব্যথা অনুভব করতেন, খাদিজা(রাযিঃ)-এর কাছে আসলে তাঁর সে ব্যথা-বেদনা বিদুরিত হয়ে যেত। খাদিজা(রাযিঃ) তাঁকে সান্তনা দিতেন, সাহস ও উৎসাহ যোগাতেন। এমনকি মুশরিকদের সকল নির্যাতন ও অমার্জিত আচরণ তিনি অত্যন্ত হালকা এবং তুচ্ছ বলে রাসূল(সাঃ)-এর কাছে তুলে ধরতেন। যাতে তিনি আত্মিক প্রশান্তি লাভ করেন।

স্ত্রীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খাদিজা(রাযিঃ)-এর জীবদ্দশায় কোনো বিয়ে করেননি। তিনি ছিলেন রাসূল(সাঃ)-এর প্রথম স্ত্রী। ইবরাহিম(রাযিঃ) ছাড়া রাসূলের সকল সন্তান খাদিজা(রাযিঃ)-এর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। রাসূলের সকল স্ত্রীদের মধ্যে তাঁর স্থান ছিল সর্বোচ্চ।

মৃত্যু

রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে পঁচিশ বছর দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করার পর নবুওয়াতের দশম বছরে ১০-ই রমযান ৬৫ বছর বয়সে মক্কায় এই মহিয়সী নারী ইন্তেকাল করেন। রাসূল(সাঃ) স্বয়ং নিজে তাঁর লাশ কবরে নামান। তাঁর মৃত্যুর সময় জানাযার নামাজের বিধান ছিল না বিধায় তাঁকে বিনা জানাযায় মক্কার জান্নাতুল মুয়াল্লায় দাফন করা হয়।

খাদিজার প্রতি রাসূল(সাঃ)-এর ভালোবাসা

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খাদিজা (রাযিঃ)-কে আমৃত্যু ভালোবাসতেন। অন্য সকলের চেয়ে খাদিজা(রাযিঃ)-কে তিনি বেশি বেশি স্মরণ করতেন। যার কারণে একদিন আয়িশা(রাযিঃ) তাঁকে বলেন, “আপনি একজন বৃদ্ধার কথা স্মরণ করছেন; যিনি মারা গেছেন?” জবাবে রাসূল(সাঃ) বলেন, “কখনও না আয়েশা! মানুষ যখন আমাকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিত, সে-ই তখন আমাকে সত্য বলে মেনে নিয়েছিল। সবাই যখন কাফির ছিল, সে ছিল তখন মুসলমান। কেউ যখন আমার সাহায্যে এগিয়ে আসেনি, তখন সে-ই আমাকে সাহায্য করেছে। তাঁর গর্ভেই আমার সন্তানাদি হয়েছে।”

খাদিজা(রাযিঃ)-এর মূল্যায়ন এর চেয়ে বেশি আর কি হতে পারে? এমনিভাবে খাদিজা(রাযিঃ)-এর প্রতি রাসূল(সাঃ)-এর মহব্বতের ব্যাপারে অনেক হাদিস বর্ণিত রয়েছে।