খিচুড়ি নয়, এটি উত্তর আফ্রিকার জনপ্রিয় খাবার কুসকুস

couscous

উত্তর আফ্রিকার আলজিরিয়া, মরক্কো, তিউনিশিয়া, মৌরিতানিয়া এবং মিশর জুড়ে ‘কুসকুস’ পদটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। কুসকুস আসলে কী? এই প্রশ্নের খুব সহজ একটা উত্তর হতে পারে, কুসকুস হল সুজির উপরে পানি ছিটিয়ে ছোট ছোট গোল আকৃতির বল তৈরি করে প্রস্তুত করা একধরনের খাবারবিশেষ। সাধারণত ঝোল জাতীয় কোনও খাবারের সঙ্গে এটি পরিবেশিত হয়। এছাড়াও তরকারির উপরে অনেকসময়ে কুসকুস ছড়িয়ে দেওয়া হয়ে থাকে, এতে খাদ্যের গুণাগুণ বজায় থাকে। তারসঙ্গে খাবারের স্বাদও বাড়ে।

অঞ্চলভেদে কুসকুসের একাধিক নাম প্রচলিত। তবে মূল শব্দটি আরবি শব্দ ‘কাসাকাসা’ থেকে এসেছে, অনেকে আবার মনে করেন যে বারবার শব্দ ‘কেসকেস’ থেকে এই কুসকুস শব্দটির ব্যুৎপত্তি। সাধারণত এই কেসকেস শব্দটি দিয়ে কুসকুস প্রস্তুতিকরণের পাত্রটিকেও বোঝানো হয়ে থাকে। 

জনপ্রিয় এই পদটি সম্পর্কে প্রথম লিখিত তথ্য আমরা পাই ত্রয়োদশ শতকে। রান্না বিষয়ক গ্রন্থ ‘কিতাব আল তাবিখ ফি আল মাঘরিব ওয়াল আন্দালুস’ (মাগরিব এবং আন্দালুসিয়ার রান্নার বই)-তে। এই বইতে কুসকুস বানানোর যে প্রণালী দেওয়া রয়েছে তা পৃথিবীর যে কোনও দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তবে কুসকুস জনপ্রিয় এবং অন্যতম প্রধান খাদ্যে পরিণত হয়েছে উত্তর আফ্রিকাতেই। লুসি বোলেনসের মতে বার্বার জাতির মানুষেরা খ্রিপূর্ব ২৩৮-১৪৯ এই সালের মধ্যে কুসকুসকে তাদের খাবার হিসেবে গ্রহণ করেছিল। অর্থাৎ কুসকুস যে বেশ প্রাচীন একটি খাবারের পদ একথা বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না। অন্যদিকে চার্লস পেরির মতে কুসকুসের উৎপত্তিকাল যিরিদ রাজবংশের শেষ এবং আলমোহাদিয়ান রাজবংশের শুরুর মধ্যকার সময়ে, খ্রিস্টীয় একাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যে।

গ্রানাডার নাসরিদ রাজত্বকালে কুসকুস পরিচিত ছিল। সিরিয়ার একজন ইতিহাসবিদ আলেপ্পো থেকে কুসকুস সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্যসূত্রের উল্লেখ করেছেন। প্রথম দিককার এই তথ্যসূত্র থেকে জানা যায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কুসকুসের জনপ্রিয়তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছিল। ঐতিহাসিক বিভিন্ন তথ্য থেকে একথাও জানা যায় মোটামুটি ষোড়শ শতকে কুসকুস সিরিয়া থেকে তুরস্কে এসে পৌঁছয়। ক্রমে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে খাবারটির বহুল প্রচলন শুরু হয়।

ইবন বতুতার ভ্রমণ কাহিনিতেও কুসকুসের উল্লেখ রয়েছে। খুব সম্ভবত পশ্চিম আফ্রিকায় প্রস্তুত চমকপ্রদ এই পদটি প্রসঙ্গে তিনি একবার মন্তব্য করেছিলেন ‘এটা থেকে কুসকুস এবং পরিজ তৈরি করা হয়’। দশম শতকে আফ্রিকার প্রত্নতাত্ত্বিক বিভিন্ন সামগ্রীতে যে রান্না প্রস্তুতিকরণের সামগ্রী পাওয়া যায়, তার থেকে কুসকুস তৈরির পাত্রর সন্ধান মেলে। এই পাত্রটি দেখেই ইবন বতুতা এমন মন্তব্য করেছিলেন।

কুসকুসের উৎপত্তি বিষয়ে যেমন বহু মতভেদ রয়েছে, তেমনই এর অনেক নাম প্রচলিত। যেমন এটা আরবিতে কুসকুসি, মরক্কোয় সেকসু বা কেস্কসু, আলজেরিয়ায় সেকসু বা তাআম (আক্ষরিক অর্থ “খাদ্য”), তিউনিসিয়া ও লিবিয়ায় কোস্কি বা কুসেসকসি, মিশরে কুসকুসি, তুয়ারেগে কেসকেস নামে পরিচিত। 

নামভেদের মতোই এর উপকরণগত প্রভেদ। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে কুসকুস তৈরিতে সুজি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু অঞ্চলভেদে এর উপকরণেও বৈসাদৃশ্য লক্ষণীয়। সুজির বদলে কোনও কোনও সময় চালও ব্যবহার করা হয়ে থাকে। গিনির ইউকৌঙ্কৌন এবং সেনেগালে চালের কুসকুসের পাশাপাশি মাংস বা চিনাবাদামের সস দিয়ে কুসকুস রান্না করা হয়। 

দক্ষিণ আলজেরিয়ার মরুভুমিতে বসবাসকারী যাযাবর জাতি কেল আহাজ্ঞার মানুষেরা কুসকুস তৈরিতে বাজরা ব্যবহার করে। শতাব্দির পর শতাব্দি পশ্চিম আফ্রিকার সুদানে প্রচলিত এই পদ্ধতি থেকে তারা এটা শিখেছে। ইবনে বতুতা ১৩৫২ সালে মালি আসেন। তার বর্ণনা থেকে জানা যায়, যখন পর্যটক গ্রামে এসে উপস্থিত হয় তখন নিগ্রোরা বাজরা, কাঁচা দুধ, মুরগী, পদ্ম বীজের গুড়ো, চাল, ফউনি (যা সরিষা দানার মত দেখতে) নিয়ে আসে এবং তারা কুসকুস তৈরি করে। ইবন বাতুটা ১৩৫০ সালে মালিতে চালের কুসকুসের কথাও উল্লেখ করেছেন। বাজরার কুসকুস কখনও গমের কুসকুসের মতো জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি কারণ বাজরার কুসকুস রান্না করতে অনেক সময় লাগে এবং খেতে খুব সুস্বাদু নয়। 

সাধারণত খাদ্য শস্যের কঠিন অংশ থেকে কুসকুস তৈরি করা হয়ে থাকে। কঠিন এই অংশকে যাঁতায় পিষে গুড়ো তৈরি করার রীতিটি প্রাচীন। আধুনিক সময়ে কুসকুস উৎপাদন যন্ত্র নির্ভর হয়ে পড়েছে এবং বিশ্বের বিভিন্ন অংশের বাজারে কুসকুস কিনতে পাওয়া যায়। 

চলুন জেনে নিই এর রেসিপি-

যা যা প্রয়োজন-

কুসকুস- ১ কাপ গরম চিকেন স্টক বা গরম পানি- দেড় কাপ কাপ সবজি পছন্দমতো গ্রেট করা- ১ কাপ পেঁয়াজ কুচি- ১/৪ কাপ রসুন কুচি- ১ টে চামচ কাঁচামরিচ- ৩ টা তেল- ১/২ কাপ লবণ- স্বাদমতো

প্রণালি-

একটি বাটিতে ১ কাপ কুসকুস ঢেলে নিন। ফুটন্ত গরম পানি বা চিকেন স্টক নিয়ে কুসকুসের ওপর ঢেলে দিন। চুলায় রাখবেন না কিছুতেই। ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রাখুন ৫ মিনিট। ৫ মিনিট পর কাঁটাচামচ দিয়ে নেড়েচেড়ে নিন সেদ্ধ হওয়া কুসকুস।

একটা প্যানে তেল দিয়ে তাতে রসুন দিয়ে ভাজুন এক মিনিট। পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ ও সবজি দিয়ে ভাজুন কিছুক্ষণ। সবজি অল্প সেদ্ধ হয়ে এলে কুসকুস ঢেলে দিন। নেড়েচেড়ে ২ থেকে তিন মিনিট ভেজে সার্ভিং ডিসে ঢেলে পরিবেশন করুন মজাদার কুসকুস রাইস।

এই খাবারটির সাথে গ্রিল বা কাবাব জাতীয় খাবার ভালো লাগে। অনেকে শুধু সবজি দিয়েও খেয়ে থাকে। ইচ্ছে করলে খালিও খেতে পারেন মজাদার ‘কুসকুস রাইস’।

তথ্যসূত্র-উইকিপিডিয়া

 

Couscous salad with tomatoes onions and succulent meat kebabs