দুই প্রাচীন মুসলমান পরিবার রক্ষা করেন খ্রিস্টধর্মের পবিত্র গির্জা

ইতিহাস Contributor
ফোকাস
প্রাচীন মুসলমান পরিবার
Picture of Greek calvary and the Latin calvary in Church of the Holy Sepulchre at early morning. Orthodox Greek calvary with golden decorations is on the left, Latin calvary with prayers and decorative vault is on the right. Jerusalem, Israel © Sarkao | Dreamstime.com

আমাদের পবিত্র ইসলাম ধর্ম সবসময় অন্য ধর্মের প্রতি সহনশীল ও শ্রদ্ধাপূর্ণ। প্রমাণ হিসেবে বলা যায়, জেরুজালেমের পবিত্র সেপালকার গির্জা দেখাশোনা করেন কিন্তু দুটি প্রাচীন মুসলমান পরিবার । আর এর মধ্যে কিন্তু কোনও বৈরিতা নেই।

খ্রিস্টধর্ম যাঁরা পালন করেন, তাঁরা সকলেই জানেন জেরুজালেমের সেপালকার গির্জা কতখানি পবিত্র। এই ধর্ম অনুসারে এই পবিত্র স্থানেই প্রভু যিশুকে ক্রুশবিদ্ধ করে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। আবার এই স্থানেই তাঁর পুনর্জাগরণ হয়। সারাবিশ্বে ক্যাথলিক ও মুসলমানদের মধ্যে অজস্র লড়াই হয়ে গিয়েছে, আর এখানে, প্রভু যিশুর দেহাবশেষ ও সমাধিকে যত্ন করে আগলে রাখেন ইসলাম ধর্মাবলম্বি নুশাইবা ও জোউদে, এই দুই প্রাচীন মুসলমান পরিবার ।

পবিত্র সেপালকার গির্জার ইতিহাস

চতুর্থ শতকে বাইজান্টিয়াম সম্রাট কনস্টান্টাইনের শাসনকালে এই গির্জার পত্তন হয়। যদিও, ১১ শতকে ফাতিমিদ গোষ্ঠীর হাতে এই গির্জা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে বাইজান্টিয়রা পুনরায় এটিকে গড়ে তোলে।

তবে, গির্জার গুরুত্ব ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে ১০৯৯ অব্দে, যখন ধর্মযুদ্ধ বা ক্রুসেডের ফলে ক্যাথলিকরা জেরুজালেম দখল করে নিয়েছিল।

তারপর থেকে ১৯ শতক পর্যন্ত এই গির্জার দেখাশোনার ভার ছিল গ্রিক, রোম্যান ও আর্মেনিয় খ্রিস্টান প্রতিষ্ঠানের হাতে। ১৯ শতকের পরে, মিশর, সিরিয়া ও ইথিওপিয়ার ক্যাথলিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিও এই দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে সব ঠিকঠাক চললেও, প্রত্যেকটি দায়িত্বগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের ধর্মবিশ্বাস ও বোধের মধ্যে সূক্ষ্ম ফারাক ছিল বরাবর। এই ফারাক থাকার ফলেই সেপালকার গির্জার রক্ষ্ণা বেক্ষণ নিয়ে প্রায়শই মতান্তর হত।

১৯ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে এই মতান্তর ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। এবং, আলোচনা করে সেই মতান্তর ঠিক করার বদলে শুরু হয় রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম। এই সংগ্রামের ফলে খ্রিস্টধর্মের অখণ্ডতা আহত হয়, সেপালকার গির্জার অযত্ন শুরু হয়।

ঐতিহাসিকদের মতে, সম্ভবত সেই কারণেই দায়িত্বভার আস্তে আস্তে এই দুই মুসলমান পরিবারের হাতে এসে পৌঁছয়।

ইসলামের জেরুজালেম বিজয় ও মুসলমান পরিবার তত্ত্বাবধায়ক

ক্রুসেডের আগে, ৬৩৭ অব্দে, খলিফা ওমর (রা.) জেরুজালেম জয় করেন। তিনি ছিলেন পরধর্মসহিষ্ণু। সেপালকার গির্জার ঐতিহ্য ও গুরুত্ব তিনি অনুধাবন করেছিলেন। এটাও অনুভব করেছিলেন এই গির্জার সঠিক দেখাশোনার প্রয়োজন। ফলত, তাঁর নির্দেশে নুশাইবা পরিবারের হাতে দেখাশোনার ভার অর্পিত হয়। এই নুশাইবা পরিবারের সূচনা পবিত্র মদিনা শহরে। শুধু তাই নয়, কথিত আছে, এই পরিবারের সঙ্গে আমাদের প্রিয় নবী রাসুল(সাঃ)-এর রক্তের সম্পর্ক রয়েছে।

এরপরেই ঘটে যায় ক্রুসেড। যে রক্তক্ষয়ী ধর্মযুদ্ধ পৃথিবীর ইতিহাস, রাজনীতি ও ধর্মনীতির পটপরিবর্তন ঘটিয়েছিল। কিন্তু ১১৮৭ অব্দে সুলতান সালাদিন পুনরায় জেরুজালেম দখল করেন। তিনিও নুশাইবাদের আবার গির্জার দেখাশোনা করার অনুমতি দেন। ঐতিহাসিকরা বলেন, সালাদিন গির্জার দ্বিতীয় প্রবেশপথটি অর্গলবদ্ধ করে সেটির চাবি অর্পণ করেছিলেন নুশাইবা পরিবারের তৎকালীন কর্তার হাতে।

জোউদে পরিবারের সংযোজন

নুশাইবাদের থেকে জানা যায়, ১৬ শতকে, যখন জেরুজালেমের শাসনকর্তা ছিল অটোমানরা, তখন জোউদে পরিবারকে সহ- তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। যদিও জোউদেরা দাবী করেন তাঁদেরকেও সুলতান সালাদিন নিয়োগ করেছিলেন। এছাড়াও, কথিত আছে, জোউদে পরিবারে প্রথম যে কর্তাকে চাবি দেওয়া হয়েছিল তিনি ছিলেন মহান শেখ। ফলে, নুশাইবা পরিবারের মানুষরাই চিরকাল সেপালকার গির্জার দরজা খুলে গিয়েছেন। আর জোউদে পরিবার অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে গির্জার মূল প্রবেশদ্বারের চাবি রক্ষা করে গিয়েছেন।

সেই ঐতিহ্য এখনও বর্তমান। তবে, এখন গির্জায় প্রবেশ করার জন্য দুটি চাবি রয়েছে। প্রথমটি প্রায় ৮৫০ বছরের পুরনো, অবশ্য সম্প্রতি সেটি ভেঙ্গে যাওয়ায় আর ব্যবহারের যোগ্য নেই। দ্বিতীয় চাবিটি প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো। আর এই চাবির মাধ্যমেই সেপালকার গির্জায় প্রবেশ করা যায়।

প্রতিবছর, ভ্যাটিকান সিটি আয়োজিত এক জাঁকজমক পূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নতুন করে অর্পণ করা হয় এই দুই প্রাচীন মুসলমান পরিবার-কে ।