গঠনমূলক সংলাপকে গুরুত্ব দেয় ইসলাম

Musulmans rassemblés dans une mosquée discutant des affaires
Un groupe d'amis Musulmans assis sur un tapis d'une mosquée

মহান আল্লাহ তা’আলা মানুষকে তার সকল সৃষ্টির সেরা সৃষ্টি হিসেবে তৈরি করেছেন। সকল জীবের সেরা জীব হচ্ছে মানুষ। মানুষদেরকে উত্তম শারীরিক গঠন, জ্ঞান-বুদ্ধি, বিচার-বিবেচনা ও সর্বোত্তম সৃজনশীলতা দিয়ে তৈরি করেছেন। এ কারণে স্বভাবগতভাবেই একজন তার জীবনের চিন্তা-চেতনা বিশ্বাস ও মতের দিক থেকে আরেকজনের থেকে আলাদা হয়ে থাকে। এই ভিন্নতার কারনে কখনো কখনো মতপার্থক্য এবং তার থেকে সংঘাতের রূপ নেয়। এই অবস্থায় বিরোধীদের সাথে আচরণ করতে গেলে সামনে দুটি রাস্তা খোলা থাকে। প্রথমটি হচ্ছে কঠোরতা বা শক্তি প্রদর্শন করা এবং প্রয়োগ করা। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে সংলাপ অর্থাৎ সর্বোত্তম পন্থায় বিনয়ের সাথে নিজের মতামত যুক্তিতর্ক পেশ করা।

যেকোনো বিবেক বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ প্রথম পদ্ধতিকে সবসময়ই পাশ কাটিয়ে যেতে চান। তিনি সবসময় প্রথমেই সংলাপের পথটি বেছে নেন। কারণ সংলাপ এমন একটি বিষয় যা দ্বারা যে কোন দুশমনের সাথে দুশমনি রক্তপাতহীনভাবে সমাধান করা যায়।

সংলাপ বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে অত্যন্ত সফল একটি কার্যকরী মাধ্যম। সংলাপ হচ্ছে অনুধাবনের রাস্তা, সফলতার রাস্তা, পারস্পরিক সম্মতির এবং ঐক্যমত্যের মূল ফটক। আমরা বিভিন্ন সময় লক্ষ্য করে থাকি যে ইসলামের বিরুদ্ধে কেউ কেউ উস্কানিমূলক আচরণ অথবা ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে মিথ্যা ছড়িয়ে থাকে। যারা সত্যিকারের জ্ঞানের অভাবে এই ধরনের কার্যকলাপে লিপ্ত থাকে তাদের সাথে সংলাপে হতে পারে সবচেয়ে কার্যকরী মাধ্যম। যুক্তি, মমতা, সঠিক তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে তাদের ভুলগুলোকে ধরিয়ে দিয়ে সঠিক পথে আনার দিকে সংলাপ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

পবিত্র কোরআন শরীফে সংলাপে কে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে তিন জায়গায় শব্দটি এসেছে। সূরা কাহাফের দুই জায়গায় তথা আয়াত ৩৪ এবং ৩৭, আর সূরা মুজাদালার প্রথম আয়াতে। কোরআনে কারীমে সংলাপের বহুমুখী ব্যবহার স্থান পেয়েছে। তার কয়েকটি তুলে ধরা হলো :

১. ফিরিশতাদের সাথে আল্লাহ তা‘আলার সংলাপ। (সূরা বাক্বারা : ৩০-৩৩)

২. নবী-রাসূলগণের সাথে আল্লাহ তা’আলার সংলাপ। (সূরা বাক্বারা : ২৬০)

৩. নিজ কওমের সাথে নবী-রাসূলগণের সংলাপ। (সূরা ইবরাহীম : ৯-১২)

৪. জান্নাত ও জাহান্নামীদের পারস্পরিক সংলাপ। (সূরা আরাফ : ৪৪)

৫. পাখির সাথে মানুষের সংলাপ। (সূরা নামল : ২০-২৫)

৬. নবী-রাসূলগণের সাথে আল্লাহ তা’আলার সংলাপ, যাতে তিনি শেষ নবীর জন্য বাইআ‘ত-এর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। (সূরা আল ইমরান : ৮১)

এ জাতীয় বিভিন্ন রকমের সংলাপ পবিত্র কোরআনে স্থান পেয়েছে।

আমরা নবীজির জীবনের দিকে তাকালে দেখতে পাই যে, সুদূর প্রসারী লক্ষ্যকে বাস্তবায়ন করার জন্য তিনি বারবার গঠনমূলক সংলাপ কে গুরুত্ব দিয়েছেন। এমনকি শত্রুর সাথে যেকোনো বিষয়ে নিষ্পত্তির জন্য তিনি প্রথমেই সংলাপের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছেন। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে : ১. হাদীসে জিব্রিল, যা হজরত ওমর বিন খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। (মুসলিম : ৯) ২. হোসাইন বিন ইয়াবুদের সাথে প্রিয় নবীর সংলাপ, যা তিনি তাকে ইসলামের প্রতি উদ্বুদ্ধ করার জন্য করেছেন। হুদাইবিয়ার সন্ধি ছিল রাসূল (সা.) সংলাপের চূড়ান্ত রূপ। ইমরান বিন হোসাইন থেকে বর্ণিত : তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার পিতাকে বলেছেন : হে হোসাইন! এক দিনে কতজন মাবুদের ইবাদত কর? আমার পিতা বললেন, সাতজনের। ছয় জন জমিনের, আর একজন আসমানের। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন : এদের কাকে মনে কর তোমার আশা-আকাক্সক্ষা পূরণ করতে পারবে? তিনি বললেন : যিনি আসমানে আছেন তিনি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : হে হোসাইন! তুমি যদি ইসলাম গ্রহণ কর, তাহলে তোমাকে এমন দুটো কথা শেখাব, যা তোমার অনেক উপকার করবে। ইমরান বলেন, হোসাইন ইসলাম গ্রহণ করার পর রাসূলের নিকট থেকে কথা শিখতে চাইলেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বলো- ‘আল্লাহুম্মা আলহামানী রুশদী ওয়া আ’য়াজ্জানী মিন শার্রি নাফসী’।

পবিত্র কোরআন শরীফে মহান আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ “ হে নবী! তুমি তোমার প্রতিপালকের পথে মানুষকে ডাকো প্রজ্ঞাপূর্ণ সুবচনে। তাদের সাথে আলোচনা করো মমতাভরা যুক্তিতে। ” (সূরা আন-নহল, আয়াত-১২৫)। সুতরাং আমরা একথা পরিশেষে বলতেই পারি যে, যে কোন শত্রুতা বা প্রতিপক্ষর সাথে আলোচনার অর্থাৎ সংলাপের পথ সবসময় উন্মুক্ত রাখতে হবে। এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, মমতার পরিপূর্ণ অন্তর, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সত্য সুন্দর যুক্তিতর্ক নিয়ে জয় করতে হবে অন্যের অন্তর। রব্বুল আলামীন আমাদেরকে তার রহমতের ছায়ায় থাকার তৌফিক দিন।