শরিয়াহ সম্মত ওয়েব পরিবেশ. আরওসন্ধানকরুন

গণিতের ধাঁধা আর কবির কল্পনা- মিশ্রণের নাম ওমর খৈয়াম

omar khayyam
Omar Khayyam engraved vector portrait with ink contours. Persian mathematician, astronomer, and poet.ID 127998625 © Mariia Domnikova | Dreamstime.com

নশ্বর এই ধরনীতে অবিনশ্বর কিছু নেই বলেই, শহর-বন্দর, নদী-নালা, খাল-বিল, প্রকৃতি, জীবন, যৌবন, সৌন্দর্য সবকিছুই একদিন নিঃশেষ হয়ে যাবে। অতল সাগরের মতো নশ্বর স্রোতের পথ ধরে অহরহ বিদায় নিয়েছে পৃথিবীর বুকে যারা শাসন করেছে, শোষণ করেছে, নির্যাতিত আর নিষ্পেষিত হয়েছে। রথী-মহারথী, ধর্মগুরু, আস্তিক-নাস্তিক কারো রেহাই নেই মৃত্যু নামক কঠিন সত্যের করাল গ্রাস থেকে। এই বিদায়ের ক্ষণে আমরা যাঁদের হারিয়েছে কখনো কখনো তাদের জন্য আমাদের বোধোদয়ে ও অন্তপুরে নেমে আসে হাহাকার, আফসোসের কালো ছায়া একই সাথে শ্রদ্ধা ও ভক্তি। অবশ্যই এর মূলে কাজ করে তাঁদের সৃষ্টিকর্ম। বিদায়ের অমোঘ নির্মলা সত্য ও অনিবার্য ক্ষণই আমাদের মনে করিয়ে দেয় হৃতগৌরব।

যেই গৌরবান্বিত ইতিহাস বলে মধ্যযুগের ইসলামী সভ্যতা এক প্রভাব বিস্তারকারী অধ্যায়। মধ্য এশিয়া থেকে স্পেন পর্যন্ত বিস্তৃত এই সভ্যতা একদিকে যেমন তৎকালীন বিশ্বের সামনে জ্ঞানের আলোকবর্তিকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে, তেমনিভাবে বিশ্বের সকল দেশের সকল মানুষকে এই সভ্যতায় সমান অংশীদার হিসেবে আপন করে নেওয়া হয়েছে। কোন প্রকার দেশ, জাতি, গোষ্ঠী বা অন্য কোন পার্থক্যের ভিত্তিতে এই সভ্যতায় মানুষকে পৃথক করে রাখা হয়নি।

তাইতো ইতিহাসের পাতা উল্টিয়ে আমরা দেখতে পাই, এই সভ্যতার বির্নিমাণে ভিন্ন ভিন্ন বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর  মানুষ সমানভাবে অবদান রেখেছে। শুধু আরবদেরই নয়, পারসিক, তুর্কি, ভারতীয়, চীনা, আফ্রিকান, ইউরোপীয় প্রভৃতি বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষের সম্মিলিত অবদানের ভিত্তিতেই গঠিত হয়েছে ইসলামী সভ্যতার অবকাঠামো। জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য, সংস্কৃতি প্রভৃতি বিভিন্ন দিক থেকে এই মানুষেরা সমৃদ্ধ করেছে স্বর্ণযুগীয় এই সভ্যতাকে। মধ্যযুগীয় ইসলামী সভ্যতাকে বিভিন্ন দিক থেকে সমৃদ্ধকারী এরূপ একজন ব্যক্তিত্ব ওমর খৈয়াম।

পারস্য অধিবাসী ওমর খৈয়ামের মূল নাম আবুল ফাতিহ গিয়াস উদ্দীন ওমর ইবনে ইবরাহীম আল-খৈয়াম আল-নিশাপুরী। মূলত পারস্যের নিশাপুরে জন্মগ্রহণের কারণে তার নামের শেষে নিশাপুরী শব্দটি যোগ করা হয়েছে।

তিনি তার সময়ের চেয়ে আধুনিক ছিলেন। তিনি প্রচলিত ধ্যান-ধারণা ও জরাজীর্ণ ইতিহাস বদলে দিয়ে নিজেই রচনা করে গেছেন নতুন ইতিহাস। যদিও তিনি আমাদের কাছে অন্যতম সেরা মুসলিম কবি হিসেবে পরিচিত, কিন্তু তিনি ছিলেন একাধারে একজন দার্শনিক, গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিদ, হাকিম ও শিক্ষক। তিনি অত্যন্ত জটিল গণিত নিয়ে কাজ করেছেন। সেই তিনিই আবার লিখেছেন আধ্যাত্মিক, প্রেম ও দ্রোহের মধুর সব কবিতা। তিনি জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে কাজ করেছেন এবং প্রণয়ন করেছেন একটি পূর্ণাঙ্গ বর্ষপঞ্জিকা। আবার কখনো চতুষ্পদী কবিতার অমর সঙ্কলন ‘রুবাইয়াত’ রচনা করেছেন। আধুনিক বীজগণিতের ভিত্তি তৈরি হয়েছে তার হাতে, কাজ করেছেন ইউক্লিডিয় জ্যামিতি নিয়েও। ভূগোল, বলবিদ্যা, খনিজবিজ্ঞান, আইন, এমনকি সঙ্গীতও বাদ যায়নি তার জ্ঞানপিপাসার তালিকা থেকে। জীবনের শেষ দিকে এসে হয়েছেন শিক্ষক। শিক্ষাদান করেছেন ইবনে সিনার দর্শন ও গণিত বিষয়ে। তার ছিল তীব্র জ্ঞানপিপাসা, তাই প্রচুর বই পড়তেন। বই পড়ার ব্যাপারে তার কোনো বাছবিচার ছিল না। যেকোনো বিষয়ের বই তার কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ছিল। বলা হয়ে থাকে, তার বই পড়ার নেশার কারণেই তিনি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী হতে পেরেছিলেন।

দার্শনিক বারট্রান্ড রাসেলের মতে, ওমর খৈয়ামই বিশ্বের একমাত্র ব্যক্তি, যিনি একইসাথে গণিতবিদ ও কবি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। গণিত বিশেষত বীজগণিতের ক্ষেত্রে ওমর খৈয়াম মৌলিক অবদান রাখেন। তিনি বীজগণিতের বিভিন্ন সমীকরণকে শ্রেণীকরণ করেন এবং ঘন সমীকরণের মাঝে তেরো প্রকার ভিন্ন ভিন্ন সমীকরণ নির্দেশ করেন। পাশাপাশি তিনি বীজগাণিতিক সমীকরণ সমাধানের জন্য জ্যামিতিক পদ্ধতির উন্নতি করেন। তিনিই প্রথম উপবৃত্ত ও বৃত্তের ছেদকের ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান করেন। গণিত বিষয়ক তার রচিত ‘মাকালাত ফিল জাবের ওয়াল মুকাবিলা’তে তিনি এসকল বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিসেবেও তার সময়কালে তিনি পরিচিতি লাভ করেছিলেন। ১০৭৪ সালে সেলজুক সুলতান জালাল-উদ-দৌলা মালিক শাহ তাকে তার রাজধানী ইসফাহানে আমন্ত্রণ করেন এবং ইরানী সৌরক্যালেন্ডার সংস্কারের জন্য তাকে দায়িত্ব প্রদান করেন। বর্তমান তেহরানের দক্ষিণে রায়ের মানমন্দিরে বসে তিনি এই  ক্যালেন্ডারের সংশোধনের কাজ শুরু করেন। তার সংশোধিত ক্যালেন্ডারটি বর্তমানে প্রচলিত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার থেকে অধিক ত্রুটিমুক্ত। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে যেখানে ৩৩০০ বছরে একদিনের ত্রুটি রয়েছে, সেখানে তার সংশোধিত ক্যালেন্ডারে ৫০০০ বছরে একদিনের ত্রুটি রয়েছে। সুলতান জালালউদ্দীন মালিক শাহের সম্মানে তিনি তার সংশোধিত ক্যালেন্ডারের নাম রাখেন ‘আত-তারিখ আল-জালালী’ বা জালালী ক্যালেন্ডার। এছাড়া তিনি একটি অ্যাস্ট্রোনোমিকাল টেবিলও তৈরি করেছিলেন, যেটির নাম রাখা হয় ‘যিজ মালিক শাহ’ (মালিক শাহ অ্যাস্ট্রোনোমিকাল টেবিল)।

ওমর খৈয়াম একজন অসাধারণ কবি ছিলেন। তার ‘রুবাইয়াত’ পড়লে যে কেউ মুগ্ধ হতে বাধ্য। এটি একটি কবিতা নয়, শত শত কবিতার সঙ্কলন ইতিহাসবিদ সাঈদ নাফসির মতে, ‘রুবাইয়াতে’ প্রায় দুই হাজার চতুষ্পদী কবিতা আছে, যেগুলোর সব বর্তমানে পাওয়া যায় না। তবে সর্বনিম্ন সংখ্যাটিও বলে, ওমর প্রায় বারোশ’ এর মতো চতুষ্পদী কবিতা লিখেছেন। তার এই কবিতার সঙ্কলন উনিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত অবহেলিতই ছিল। ১৮৫৯ সালে এডওয়ার্ড ফিটজগেরাল্ড এই কবিতা সঙ্কলনের ইংরেজি অনুবাদ ‘রুবাইয়াত অব ওমর’ প্রকাশ করলে ওমরের কবি খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। তার কবিতাগুলো পশ্চিমা বিশ্বে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়। এমনকি তার নিজ দেশের চেয়েও বেশি। কাজী নজরুল ইসলামের বাংলা অনুবাদে ‘রুবাইয়াত-ই-ওমর খৈয়াম’ বইটি ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত হয়। সৈয়দ মুজতবা আলী এর ভূমিকায় লিখেন, ‘জীবনবাদী ওমর খৈয়াম নজরুলকে খুব আকর্ষিত করেছিলেন। এ অনুবাদে অত্যন্ত চমৎকার ভাষাভঙ্গি ব্যবহৃত হয়। অন্যান্য অনুবাদকারের চেয়ে নজরুলের অনুবাদ অনুভূতির পরশে, যথাযথ শব্দের পারিপাট্যে উজ্জ্বল থাকবে এটাই স্বাভাবিক।’

১১৩১ সালের ৪ ডিসেম্বর ওমর খৈয়াম তার জন্মস্থান নিশাপুরে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি মৃত্যুর আগে এমন একটি বাগানে তাকে সমাহিত করার কথা বলে গিয়েছিলেন, যেখানে বছরে দু’বার ফুল ফোটে। সেখানেই তাকে সমাহিত করা হয়েছিল। দীর্ঘকাল তার কবরের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ১৯৬৩ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে তার কবর খুঁজে পাওয়া যায় এবং তা নিশাপুরে স্থানান্তরিত করা হয়। বর্তমানে সে স্থানটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে।

 

কিছুবলারথাকলে

যোগাযোগকরুন