গরিমা বিস্মৃত এই বাগদাদের বর্ণনা আপনাকে কেউ দেবে না

Al-Mustansiriya School.
Baghdad, Iraq – 21 April, 2020: photo for Al-Mustansiriya School in Baghdad city in Iraq, which showing Some windows and doors built in the old Abbasid style. ID 180219986 © Rasoul Ali | Dreamstime.com

শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশে প্রাচীন ইরাকের ভূমিকা তুলনারহিত। বর্তমান পরিস্থিতির বিচারে তার যুদ্ধোত্তর প্রতিকূল পরিবেশের ছবিটি আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠলেও, একটা সময়ে ঐতিহাসিক বিচার এবং পর্যালোচনার নিরিখে ইরাকের ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শিল্পকলা এবং বাণিজ্যের সম্প্রসারণে ইরাকের রাজধানী শহর বাগদাদ প্রদেশের প্রসিদ্ধি স্মরণযোগ্য।

যুদ্ধপরিস্থিতি পূর্বে মধ্যপ্রাচ্যের এই নগরীর মধ্যে লুকিয়ে ছিল একধরনের স্বর্গীয় সৌন্দর্য। এই প্রদেশের মিষ্টি পানি। আর বৃষ্টিতে ভিজে মাটির সুগন্ধ যেন আলাদা সৌন্দর্যের অভিব্যক্তি আনে। কয়েকবছর আগেই এই অঞ্চলে বসন্ত আসত অন্যরূপে। বসন্তের সময় রাস্তায় হাঁটলে পাওয়া যেত মিষ্ট ফুলের সুঘ্রাণ। সুউচ্চ খেজুর গাছের ডালে ভোরবেলা, শীতল হওয়ায় শোনা যেত পায়রা এবং নাইটিঙ্গলের কলকাকলি। যখন এক তাল গাছ থেকে অন্য গাছে খাওয়ার তাগিদে তারা উড়ে যেত, সেই দৃশ্য ছিল উপভোগ্য। প্রকৃতির পাশাপাশি পারিপার্শ্বিক পরিবেশেও যেন এক শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করত। ছোট ছোট শিশুরা একদিকে যেমন বাড়ির উঠানে খেলাধুলো করত, ঠিক তেমনই মসজিদগুলিতে শোনা যেত আজানের পবিত্র ধব্বনি। ব্যবসায়ীদের পসারে, আর ক্রেতা-বিক্রেতাদের পারস্পরিক লেন-দেনের সম্পর্কে ভরে উঠত চারপাশের বাজার হাট। বলা যায়, প্রাণময় পরিবেশ এবং আনন্দময় উপলব্ধি খুঁজে পাওয়া যেত এই নগরীর আনাচে-কানাচে।

আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগেও এই প্রদেশীয় অঞ্চলে মানুষের জীবনযাত্রার রীতি-নীতি, পদ্ধতিগত অনুশীলন ছিল অন্য অনেকটাই আলাদা। বাড়ির বাগান এবং কাছাকাছি রাস্তায় তখনও শিশুরা খেলত। দৌড়াদৌড়ি, জগিং, দড়ি ছেড়ে যাওয়া, ছোট ছোট বল দিয়ে জাগলিং-এই সবের মধ্যে দিয়েই ছোট শিশুরা খুঁজে পেত এক অনাবিল আনন্দের স্রোত। তখন কোনও স্মার্টফোন ছিল না… বিজ্ঞানের উন্নত প্রযুক্তির সাহচর্য না পাওয়া গেলেও জীবন ছিল অনেকখানি সহজ এবং আয়ত্তের মধ্যেই। গরমের দিনে আইসক্রিম বিক্রি করতে পাড়ায় পাড়ায় আসত আইসক্রিমওয়ালারা, সঙ্গে থাকত তাঁর ছোট হুইলব্যারোটি। ছোট ছোট ছেলেমেয়ারা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গেই আইসক্রিম খেত। শীতকালে আসত গরম হুমুস নিয়ে। ছোট ছোট এই আনন্দগুলোর সঙ্গেই মিশে ছিল অনেক অনেক বেশি আনন্দের স্রোত। তখন সবকিছুই অনেক সস্তা ছিল, সাধারণ মানুষের আয়ত্তের মধ্যেই ছিল অনেক বিষয়।

উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম ইরাকের প্রায় সর্বত্রই ছড়িয়ে রয়েছে সৌন্দর্যের অপার বিস্ময়। দক্ষিণের সুন্দর শহরগুলি নিঃসন্দেহে উপভোগ্য। সমুদ্রের উপর অপূর্ব দর্শনীয় স্থান, বসরা… শাত-আল-আরব নদীর সঙ্গে সংযুক্ত এই স্থানটির কথা উল্লেখ করতেই হবে। তবে, সেই সৌন্দর্য আজ কোথায়? যুদ্ধ, রাজনৈতিক নানাবিধ দ্বন্দ্ব-সংঘাতের জেরে প্রকৃতির আদি রূপ ও পরিস্থিতি আজ ম্রিয়মাণ, ক্ষয়িষ্ণু।

ইরাকের দুটি প্রধান নদীর নাম হল টাইগ্রিস এবং ইউফ্রেটিস। দু’টি নদীর সম্মিলিত স্থানটি অর্থাৎ এই শহরের যেখানে তারা মিলিত হয়েছিল তা ‘আল-কুরনা’ নামে পরিচিত। উরের প্রাচীন জিগগুরাট শহরের ঐতিহ্য নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। যেসকল স্থানের সৌন্দর্য পর্যটকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে তা হল মায়সান, এল মুথানা, ব্যাবিলোনিয়া। ব্যাবিলোনিয়া, আব্বাসীয় খেলাফত স্মৃতি সমৃদ্ধ প্রাচীন এই ইরাকের ঐতিহ্য বর্ণনায় প্রামাণিক তথ্যের প্রয়োজন নেই। কিন্তু হতাশ হতে হয় এই দেখে যে, শক্তিশালী ইরাক এবং ইরাকের প্রাচীন গরিমা সম্পর্কে অনেকেই বিস্মৃত। অনেক তথ্যই বহু মানুষের কাছেই অজানা বলেই মনে হয়।

ইরাক প্রদেশীয় জনগণের একটি সুন্দর বিষয় হ’ল তাদের উদারতা। যখন কেউ ক্ষুধার্ত বোধ করে থাকে, তখন তাকে তারা প্রাণপণ সাহায্য করবে… প্রয়োজনে নিজের ভাগের খাবারটুকু দিতেও দ্বিধাবোধ করবে না। প্রিয়জনকে হারিয়ে ফেলার কঠিন মুহূর্তেও প্রতিবেশীরা সবসময় একে অপরের পাশে থাকে… কারওর অশ্রু শুকিয়ে গেলে এবং জানাজার ব্যবস্থাতেও একে অপরকে তারা সহায়তা করবে। তবে সুখের সময়েও লোকেরা একে অপরের জন্য সুখী হবে। তারা নাচবে, তারা আনন্দ ভাগ করবে। ঠিক যেমন রমজান মাসে খাবার ভাগ করে নেওয়ার রীতি আছে, ঠিক যেমন রমজান মাসে একে অপরকে দাওয়াত দিয়ে থাকা হয়… এমনই উষ্ণ আন্তরিকতার মানুষ হলেন ইরাকের মানুষজন।

বাগদাদের সৌন্দর্য এবং ঐতিহ্য আরও বিস্ময়কর… আশ্চর্য সব ইতিহাসের সাক্ষ্য প্রবহমান থেকেছে তার মধ্যে। পুরনো আরবি বাজার, সরু পাকা রাস্তা, তামা বাজারের জমজমাটি পরিবেশ, সেখানে সুন্দর রঙের পোশাক এবং পুরানো কার্পেট ঝুলছে। তবে পুরাতন আল রাশেদ রাস্তায় উজ্জ্বল রঙ-লাইটের সাথে মিশ্রিত লেল্যান্ডের ডাবল ডেক বাসগুলি তাদের সুন্দর লাল রঙের সাথে রাস্তা পার করার দৃশ্য সত্যিই অপরূপ। শুধুমাত্র তাই নয়, ইরাক প্রদেশীয় মানুষজন ছিলেন কষ্টসহিষ্ণু। অতিরিক্ত গরমের কারণে বাড়ির ছাদে তাঁরা ঘুমোতেন। কিন্তু এই কষ্টের মধ্যেও প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, সৃষ্টিকর্তার অপরূপ সৃষ্টি তাঁদেরকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করে। সৃষ্টিকর্তার প্রতি তাঁদের কৃতজ্ঞতা বরাবরই প্রকাশ পেয়েছে তাঁদের শৈল্পিক রচনায়।