গৃহবন্দি প্রবীণদের শারীরিক ও মানসিক যত্ন

old age
ID 161757136 © Thodonal | Dreamstime.com

করোনাভাইরাসে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে বয়স্ক ব্যক্তিরা। এটি কতটা সঠিক আর কতটা নয়, সেদিকে অনেকেরই খেয়াল নেই।

সত্য-মিথ্যা বিবেচনা না করেই আমরা আমাদের পরিবারে থাকা মা-বাবা, দাদা-দাদি, নানা-নানি, দূরে ও কাছের আত্মীয়স্বজনের মধ্যে এটি ছড়িয়ে দিচ্ছি। এতে তাঁদের শারীরিক ও মানসিক দু’দিকেই ক্ষতি হচ্ছে। এর মধ্যে অনেকেই আছেন, যাঁরা ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনির রোগ, আলঝেইমার, আর্থরাইটিস, লিভারের জটিলতাসহ অন্যান্য রোগে ভুগছেন।

আসুন, আমরা এ সময়ে এই বয়স্ক স্বজনদের সঠিক পরিচর্যা করে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করার চেষ্টা চালাই। এ জন্য করণীয় কিছু জেনে নেওয়া যাক:

১. বয়স যখন বাড়তে থাকে, তখন শরীর ও মনের বিভিন্ন সমস্যার কারণে ঘুম কমতে থাকে। দুশ্চিন্তা, মানসিক অবসাদ এর মূল কারণ হতে পারে। পরিবারের বয়স্ক ব্যক্তিরা যেন প্রতিদিন তাঁদের চাহিদামতো ঘুমাতে পারেন, আমাদের সাহায্য করতে হবে। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর কুসুম গরম পানির সঙ্গে এক টেবিল চামচ ইসুবগুলের ভুসি দিতে পারেন, এতে ফাইবার থাকে। ফলে যাঁদের কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা রয়েছে, তা অনেকটাই লাঘব হবে।

২. যাঁরা ডায়াবেটিক ও উচ্চ রক্তচাপজনিত রোগে আক্রান্ত এবং নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস ছিল, তাঁরা অবশ্যই ঘরের ভেতরে কিছু সময় ব্যায়াম করে নিতে পারেন। ৩০ থেকে ৪৫ মিনিটের ব্যায়ামের মধ্যে অবশ্যই বিরতি নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে পরিবারের ছোট-বড় সবাই তাঁকে সাহায্য করতে পারেন। যাঁদের শারীরিক কোনো সমস্যা নেই, তাঁদেরও ব্যায়াম করতে সাহায্য করতে পারেন।

৩. সারা দিনের খাবারের সঠিক সময় অনুযায়ী খাবার সরবরাহ করতে হবে। যাঁরা ডায়াবেটিক রোগী, তাঁদের খাবারে শর্করা পরিমাণ মতো থাকতে দিতে হবে। অনেকেই রক্তে শর্করার পরিমাণ কমাতে প্রয়োজনের তুলনায় কম শর্করা গ্রহণ করে থাকেন। এটা সাময়িকভাবে তাঁদের রক্তের শর্করা কমালেও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ঝুঁকিও বাড়াবে। তাই পর্যাপ্ত শর্করাসমৃদ্ধ খাবার, বিশেষ করে জটিল শর্করা ও আঁশযুক্ত খাবার। যেমন গমের আটার রুটি, লাল চালের ভাত, সাগু ইত্যাদি তাঁদের খাবারে দেওয়ার চেষ্টা করুন।

৪. প্রোটিনের চাহিদা পূরণে প্রতিদিন একটি করে সেদ্ধ ডিম দিতে পারেন। তবে যাঁদের কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি, তাঁদের জন্য সাদা অংশ রাখতে পারেন। তাঁদের খাবারে পরিমিত পরিমাণে মাছ, বিশেষ করে ছোট মাছ দিতে পারেন। মাংসের চেয়ে এই সময়ে মাছ গ্রহণ করা ভালো, তবে যাঁদের আমিষ সীমিত গ্রহণ করতে হবে, তাঁদের ক্ষেত্রে সেই অনুযায়ী পরিমাণ ঠিক রাখুন। সীমিত পরিমাণে মাছ, মাংস, ডিম ও দুধ রাখতে পারেন কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে। তবে সব ধরনের ডাল বাদ দিতে হবে কিডনি রোগীর ক্ষেত্রে ।

৫. সবার জন্যই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রঙিন শাক-সবজি ও টক ফলের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে পারেন। যা তাঁদের পুষ্টি উপাদান পূরণের পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধেও সাহায্য করবে। কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে কম পটাশিয়ামযুক্ত ফল ও সবজি খেতে দিতে হবে। যেমন আপেল, নাশপাতি, পেয়ারা, আনারস, পাকা পেঁপে, জাম্বুরা, লেবু, আঙুর ইত্যাদি। আবার সবজির ক্ষেত্রে শসা, লাউ, চাল কুমড়া, করলা, কাঁকরোল, সবুজ বাঁধাকপি, কাঁচা টমেটো, সবুজ ক্যাপসিকাম, লালশাক, কলমি শাক, কুমড়ার শাক, লাউয়ের শাক দিতে পারেন।

৬. যাঁর যে সমস্যার জন্য ওষুধ নিয়মিত সেবন করতে হচ্ছে, তাঁদের সেই অনুসারে ওষুধ দেবেন। এ ক্ষেত্রে এমন কাউকে দায়িত্ব দিতে পারেন, যিনি এই বিষয়ে ভালো বুঝবেন।

৭. তাঁদের মানসিকভাবে প্রফুল্ল রাখার চেষ্টা করুন। বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাঁরা সক্ষম, এই উপলব্ধি তাঁদের মধ্যে তৈরি করে তাঁদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করুন। তাঁদের শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতাও নিশ্চিত করুন। তাঁর সঙ্গে পরিবারের সবাই মিলেমিশে সময় কাটানোর চেষ্টা করুন। এই সময়ে তিনি একা নন, আপনারা তাঁর পাশে আছেন, এটা তাঁকে বারবার স্মরণ করিয়ে দিন। যখনই তিনি কোনো বিষয়ে ভেঙে পড়ছেন বলে মনে করবেন, তখনই তাঁর কথা শুনুন এবং তিনি কী বোঝাতে চাইছেন, সেটি বোঝার চেষ্টা করুন। এতে তাঁরা আশ্বস্ত হয়ে নিরাপদ বোধ করবেন।

৮. সারা দিনে তাঁদের পানির চাহিদা পূরণে অল্প অল্প করে পানি পান করার কথাটি স্মরণ করিয়ে দিন।

৯. অনেকেই আছেন, যাঁরা বাইরে যেতে পছন্দ করেন, তাঁদের ঘরে থাকার গুরুত্ব বুঝিয়ে বলুন। তাঁদের নিকট–বন্ধুদের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলার ব্যবস্থা করে দিন। সারা দিনে তাঁদের নিজেদের পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতার কথা মনে করিয়ে দিন। যাঁরা সর্দি, কাশি ও জ্বরে আক্রান্ত, তাঁদের সঠিক সমস্যা বুঝে নিয়ে সেই অনুসারে চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা করুন।

১০. তাঁদের যেকোনো অসুস্থতায় চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।