চতুর্দশ শতকে আফ্রিকার মুসলিমদের কেমন দেখেছিলেন ইবন বতুতা?

africa mali
ID 170208729 © Hyotographics | Dreamstime.com

ইবন বতুতাকে বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম সেরা পর্যটক এবং অভিযাত্রী হিসাবে বিবেচনা করা হয়। বাস্তবে, তিনি মাত্র ২০ বছরে প্রায় ৪৪ টি দেশের (আধুনিকসীমানা অনুসারে) মধ্যে দিয়ে প্রায় ৭৫,০০০ মাইল ভ্রমণ করেছিলেন। এই সংক্ষিপ্ত নিবন্ধে ইবন বতুতার মিশর ও মালি ভ্রমণ বৃত্তান্ত সম্পর্কে কিছু না জানা কথা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

মরোক্কার বাসিন্দা ইবন বতুতা (মৃত্যু ১৩৭৭ খ্রিস্টাব্দ) ১৩২৫ সালে মক্কায় তীর্থযাত্রা করার জন্য পিতৃপুরুষের বাড়ি ত্যাগ করেছিলেন।

ইবন বতুতা তাঁর ভ্রমণকে ‘রিহলা’ বলে বর্ণনা করেছে। তাঁর এই রচনা পরে ফরাসী ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন ডিফ্রেমেরি এবং সাঙ্গুইনেট্টি। এছাড়াও রিহলার একটি বড় অংশের ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন এইচ.আর. গিব। রিহলা হল ইবন বতুতার ভ্রমণের বিবরণ, যেখানে তিনি টাঙিয়ের থেকে উত্তর আফ্রিকা, সিরিয়া, ইরাক এবং ইরান হয়ে ১৩২৫ সালে ভারতে পৌঁছেছিলেন। ভারতে ইবন বতুতা একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারী পদে আসীন ছিলেন। তারপরে, সমুদ্রপথে তিনি চীন, জাভা এবং মালদ্বীপ ভ্রমণ করেছিলেন। জানা গিয়েছে, মক্কায় ইবন বতুতা দু’বছর কাটিয়েছিলেন। তাঁর কথায়: “আমি সর্বদা কাবার চারপাশে মিছিলগুলিতে অংশগ্রহণ করতাম, আল্লাহের সেবাই ছিল মূল উদ্দেশ্য এবং পবিত্র স্থানগুলির কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করতাম।” এই নির্মল চেতনা এবং জলহাওয়ার গুণে তিনি তাঁর পুরোনো অসুখ থেকে আরোগ্য লাভ করেছিলেন বলেই মনে করা হয়।  

কায়রো অভিমুখে যাত্রা শুরুর আগে তিনি একটি অসাধারণ স্বপ্নের কথা উল্লেখ করেছিলেন:

`সেই রাতে, আমি যখন ঘরের ছাদে ঘুমাচ্ছিলাম, আমি স্বপ্ন দেখলাম যে আমি একটি বিশাল পাখির ডানায় বসে রয়েছি। সেই পাখিটি আমাকে প্রথমে মক্কার দিকে, তারপরে ইয়েমেনের দিকে, তারপরে পূর্ব দিকে এবং তারপরে দক্ষিণের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। তার বেশ কিছু পরে পূর্ব দিকে অনেকটা ওড়ার পরে একটি অন্ধকার কিন্তু সবুজ দেশে আমাকে নামিয়ে দিয়ে পাখিটি চলে গেল। আমি এই স্বপ্ন দেখে খুবই অবাক হয়েছিলাম এবং নিজেকে বলেছিলাম, “যদি শায়খ আমার এই স্বপ্নটি ব্যাখ্যা করতে পারেন, তাহলে তিনি যা বলবেন আমি সেটাই করব।” পর দিন সকালে অন্য দর্শনার্থীরা চলে যাওয়ার পরে, তিনি আমাকে ডাকলেন। আমি তাঁকে স্বপ্নটির বর্ণনা দিলে তিনি ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন: “আপনি [মক্কায়] তীর্থযাত্রা করবেন। এরপরে আপনি ইয়েমেন, ইরাক, তুর্কিদের দেশ এবং ভারতে ভ্রমণ করবেন। আপনি সেখানে দীর্ঘকাল থাকবেন এবং সেখানে আমার ভাই দিলশাদের সাথে সাক্ষাৎ করবেন, তিনি আপনাকে একটি বিপদ থেকে উদ্ধার করবেন।” 

মুসলিম ভৌগলিকরাই কৃষ্ণ আফ্রিকান মহাদেশের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিবরণ প্রদান করেছিলেন এবং ইবন বতুতা একটি চমৎকার বর্ণনা দিয়ে নিজের বিবরণীতে লিখেছিলেন:

‘নিগ্রোদের কিছু প্রশংসনীয় গুণ রয়েছ। তাঁরা অন্যায় খুব একটা করে না, অন্য যে কোনও মানুষের চেয়ে অন্যায়কে অনেক বেশি ঘৃণা করে। তাদের সুলতান কোনও দোষী ব্যক্তিকে মায়াদয়া দেখান না। তাঁদের দেশে সুরক্ষার কোনও অভাব নেই।’ 

‘তারা প্রার্থনার সময়গুলি কঠোর ভাবে অনুসরণ করত এবং তাদের সন্তানদেরও এই বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে শেখাত। শুক্রবার, কোনও ব্যক্তি দ্রুত মসজিদে না গেলে ভিড়ের জন্য সে আর নামাজ পড়ার জন্য কোনো জায়গা খুঁজে পেত না। 

‘তাদের আরও একটি ভালো গুণ হল, শুক্রবার পরিষ্কার সাদা পোশাক পরার অভ্যাস। অপর একটি গুণ হল, মন দিয়ে কুরআন শেখার জন্য তাদের উৎসাহ। আমি উৎসবের দিন কাজির বাসায় গেছিলাম। গিয়ে দেখি তাঁর সন্তানদের শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। দেখে আমি তাঁকে প্রশ্ন করেছিলাম, “আপনি কি ওদের ছাড়বেন না?” তিনি জবাব দিয়েছিলেন, “যতক্ষণ না ওরা হৃদয় দিয়ে কুরআন শিখবে, তত ক্ষণ আমি ছাড়ব না।”

তবে তাদের কিছু খারাপ গুণও রয়েছে। যেমন, দাসী, দাসী-কন্যা এবং যুবতী মেয়েরা তাদের ঊর্ধ্বাঙ্গে কাপড় পরে না। তারা উলঙ্গ অবস্থাতেই সবার সামনে থাকে। শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসাবে তাদের মাথায় ধুলো এবং ছাই রাখার রেওয়াজ রয়েছে। এছাড়া আরেকটি নিন্দনীয় অনুশীলন হল, তাদের মধ্যে অনেকে পচা মাংস, কুকুর এবং গাধার মাংস খায়।

ইবন বতুতার রচনা থেকে জানা যায়, মালিতে তিনি এক অদ্ভুতদর্শন প্রাণী দেখেছিলেন। তাঁর কথায়, ‘মালি থেকে প্রস্থান করার সময়ে আমার সাথে আবু বকর ইবন ইয়াকুব নামে এক বণিক ছিলেন। আমরা মিমার রাস্তা ধরলাম। আমি একটি উটে চড়ে যাচ্ছিলাম, কারণ ঘোড়া ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এক সময় আমরা একটি প্রশস্ত চ্যানেলের পাশে এসে পৌঁছলাম যা নীল নদী থেকে প্রবাহিত হচ্ছিল এবং তা শুধুমাত্র নৌকোয় পার হওয়া সম্ভব। রাত ছাড়া সেই পথ পেরোনো সম্ভব নয়। আমরা একটি চাঁদনি রাতে প্রায় ৩-৪ ঘণ্টায় সেই চ্যানেল অতিক্রম করলাম। ওপাড়ে পৌঁছে ভীষণ মোটাসোটা কয়েকটি প্রাণী দেখলাম। ভেবেছিলাম, বোধহয় হাতি। কিন্তু তারপরে দেখলাম তারা নদীতে নেমে গেল। তখন আবু বকরকে জিজ্ঞাসা করলাম, “এগুলি কী ধরনের প্রাণী?” তিনি জবাব দিলেন, “এগুলি হিপ্পোপটেমাস।”