চাঁদ দেখে রমযান শুরু ও শেষ করা সম্পর্কে ইসলামের বিধান

আকীদাহ Contributor
মতামত
চাঁদ দেখে রমযান
Photo : Dreamstime

চাঁদ দেখে রমযান শুরু হয়। কেন? যেকোনো আমল আল্লাহর নিকট কবুল হওয়ার জন্য শর্ত হচ্ছে, সেটি শরিয়তের নির্দেশনা মোতাবেক হওয়া। মনগড়া পদ্ধতিতে কোনো আমল করলে সেটা যত বড় আমলই হোক না কেন, আল্লাহর কাছে তা গৃহীত হবে না। রমযান মাসের রোযাও এর ব্যতিক্রম নয়। এ মাসের শুরু ও শেষ নির্ভর করবে চাঁদ দেখার ওপর। এ প্রসঙ্গে হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “(রমযানের) চাঁদ না দেখা পর্যন্ত রোযা রাখবে না এবং (শাওয়ালের) চাঁদ না দেখা পর্যন্ত রোযা রাখা বন্ধ করবে না।” (মুসলিম)

অন্য আরেকটি হাদিসে এসেছে, “(শাবানের ২৯ দিন পূর্ণ করার পর) তোমরা যদি রমযানের চাঁদ না দেখতে পাও তাহলে শাবান মাস ৩০ দিন পূর্ণ করবে।” (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক)

এ হাদিসদ্বয়ের আলোকে রমযান শুরু ও শেষ হওয়া সংক্রান্ত কিছু মাস’আলা নিম্নে উল্লেখ করা হল-

চাঁদ দেখে রমযান শুরু ও শেষ হবে, জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাবে নয়

রমযানের শুরু ও শেষ নির্ণয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাব গ্রহণযোগ্য নয়, কেননা এ সংক্রান্ত হাদিসগুলোতে স্পষ্টত স্বচক্ষে ‘চাঁদ দেখা’-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অতএব চোখে চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করেই রমযানসহ অন্য যেকোনো চান্দ্রমাসের শুরু ও শেষ নির্ধারিত হবে, অন্য কোনোভাবে নয়।

তবে যদি ২৮ দিন পর শাওয়ালের চাঁদ দেখা যায়, সেক্ষেত্রে বুঝতে হবে যে, রমযানের শুরু নির্ণয়ে ভুল হয়েছিল। তাই পরবর্তীতে একদিনের রোযা সকলকে কাযা করে নিতে হবে, কেননা চান্দ্রমাস কখনও ২৯ দিনের কম হওয়া সম্ভব নয়।

চান্দ্রমাস ২৯ বা ৩০ দিনের হয়ে থাকে

আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “মাস কখনও ত্রিশ দিন, আবার কখনও ঊনত্রিশ দিনের হয়ে থাকে।” (বুখারী, মুসলিম)

আবদুল্লাহ ইবনে মাস’ঊদ (রাযিঃ) বলেন, “আমরা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে ত্রিশ দিনের তুলনায় অধিক সময় ঊনত্রিশ দিন রোযা পালন করেছি।”

সুতরাং,এ সকল হাদিসের আলোকে স্পষ্টত বুঝা গেল যে, চান্দ্রমাস কখনো ত্রিশ, আবার কখনো ঊনত্রিশ দিনের হয়। এদিকে মাস অসম্পূর্ণ হলেও আল্লাহ পরিপূর্ণ সওয়াব দান করেন।

এছাড়া উপরোক্ত হাদিসগুলো জ্যোতিষ ও গণকদের ধারণাও প্রত্যাখ্যান করে। এ হাদিস আরও প্রমাণ করে যে, শরীয়তের বিধান যেমন রোযা, ফিতর, ঈদ, হজ্জ্ব ইত্যাদি চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল, গণনার ওপর নয়।

চাঁদ দেখে রমযান শুরু ও শেষ সম্পর্কে দ্বীনদার ব্যক্তির সাক্ষ্য গৃহীত হবে

আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলে রোযা শুরুর জন্য এমন একজন ব্যক্তির চাঁদ দেখাই যথেষ্ট হবে, যার দ্বীনদার হওয়া প্রমাণিত কিংবা অন্তত বাহ্যিকভাবে তাকে সবাই দ্বীনদার বলে জানে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) বলেন, “একজন মরুবাসী ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট (রমযানের) চাঁদ দেখার সাক্ষ্য দিল। তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কি এ কথার সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মা’বুদ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল?’ সে বলল, ‘হ্যাঁ, ইয়া রাসুলুল্লাহ।’ এ কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম তখন সকলকে রোযা রাখার নির্দেশ দিলেন।” (হাকিম)

তবে আকাশ যদি পরিষ্কার থাকে তবে একজনের খবর যথেষ্ট নয়; বরং এত লোকের খবর প্রয়োজন, যার দ্বারা প্রবল বিশ্বাস জন্মে যে, প্রকৃতপক্ষেই চাঁদ দেখা গেছে। কেননা, যে বিষয়ে অনেকের সংশ্লিষ্টতা থাকে তাতে দু’একজনের খবরের ওপর নির্ভর করা যায় না।

কেউ একাকি চাঁদ দেখলে এবং তার সাক্ষ্য গৃহিত না হলে

কোনো ব্যক্তি একাকি চাঁদ দেখেছে, কিন্তু তার সাক্ষ্য গৃহিত হয়নি, এক্ষেত্রে তার জন্য ব্যক্তিগতভাবে রোযা রাখা জরুরি নয়। কেননা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “রোযা শুরু হবে সেদিন, যেদিন সকলে রোযা রাখে। আর ইফতার হল সেদিন, যেদিন সকলে ইফতার করে। আর কোরবানি হলো সেদিন, যেদিন সকলে পশু জবেহ করে।” (তিরমিযী)

ভিনদেশে চাঁদ দেখার বিধান

যে দেশে চাঁদ দেখা যাবে, তার অধিবাসীদের ওপর রোযা রাখা ফরজ হবে। যে দেশে চাঁদ দেখা যায়নি, তার অধিবাসীদের ওপর রোযা রাখা ফরজ হবে না। কারণ রোযার সম্পর্ক চাঁদ দেখার সাথে, দ্বিতীয়ত চাঁদের কক্ষপথ বিভিন্ন দেশে বিভিন্নরকম। সারাবিশ্বে একই দিনে রোযা পালন ও ঈদ উদযাপনের বিষয়ে মতবিরোধ থাকলেও এ বিষয়ে রাবেতার ইসলামি ফিকহ কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত হল, মুসলিম উম্মাহর চাঁদ দেখা ও ঈদ উদযাপনকে একদিনে করার দাবি অপ্রয়োজনীয়। কেননা ঈদের দিন এক হওয়া মুসলিম উম্মতের ঐক্যবদ্ধতার নিশ্চয়তা নয়। বরং চাঁদ দেখার বিষয়টি মুসলিম দেশগুলোর সরকার, নিজ নিজ ফতোয়া ও আইন বিভাগের হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত। কেননা তা সার্বজনীন দ্বীনি কল্যাণের অধিক নিকটবর্তী। আর উম্মতের ঐক্যবদ্ধতার নিশ্চয়তা নিহিত রয়েছে সকল ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহ্ অনুযায়ী আমল করার মাঝে।

অমুসলিম দেশে বসবাসকারী মুসলিমগণ সেখানকার ইসলামিক সেন্টার কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্তের অনুসরণ করবেন। যদি এ রকম কোনো মুসলিম জনগোষ্ঠী চাঁদ দেখতে সক্ষম না হয়, তবে তারা এমন দেশের চাঁদ দেখার অনুসরণ করবেন যে দেশের চাঁদের উদয়াচল ও অস্তাচল তাদের অনুরূপ। যদি এরূপ কোনো মুসলিম দেশ পাওয়া না যায়, তবে তারা তাদের নিকটতম মুসলিম দেশের অনুসরণ করবেন।