চিকন সূচীশিল্পের সঙ্গে কি ঢাকার যোগসূত্র রয়েছে?

chikankari embroidery

তয়পচী, খাটোয়া, বুখিয়া, মুড়ী, ফাঁড়া এবং জালি… নামগুলোর সঙ্গে কোনও কোনও পাঠক পরিচিত, আবার কারওর কারওর কাছে নামগুলো হয়তো বেশ অজানা। সংক্ষেপে বলে নেওয়া প্রয়োজন এই ছয়টিই হল চিকনের কাজের প্রকারভেদ। চিকন হল একধরনের সূচীশিল্প বা বয়নশিল্প। প্রথমদিকে জনপ্রিয় এই বস্ত্রবয়নশিল্পটি সাদা মসলিন কাপড়ের উপর করা হয়ে থাকলেও পরবর্তী সময়ে রঙিন মসলিন কাপড়ের উপরে সূচীশিল্পের কাজ বিশেষভাবে চোখে পড়ে।

লখনৌর চিকন না ঢাকার

চিকন কাজের জন্য লখনৌ শহরের জনপ্রিয়তা নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। তবে লখনৌ শহরেই যে এই বস্ত্রবয়নশিল্পের প্রসার ঘটেছিল এমনটা কিন্তু নয়। ঐতিহাসিক বিচারে ভারতে প্রথম চিকনের কাজ শুরু হয়েছিল ঢাকা শহরে, মুসলিম নবাবদের আমলে। সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতকে ঢাকা শহরে অত্যন্ত উৎকৃষ্ট চিকনের কাজ হত। মূলত এই ঢাকা শহর থেকেই দিল্লি, রামপুর এবং লখনৌ অঞ্চলে চিকনের জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে। সূচীশিল্পটির কাজ এতটাই সূক্ষ্ম এবং সুন্দর যে অনেকেই এই কাজের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে থাকে।

চিকনশিল্প সম্পর্কে আরেকটি তথ্য আমরা জানতে পারি মেগাস্থিনিসের লেখা থেকে। সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতক। তাঁর বর্ণনা থেকে ওই সময়ে ভারতীয়দের মসলিন ব্যবহারের কথা জানা যায়। তবে এই মসলিন কাপড়ে যে অলংকরণ করা হত, তা চিকন কাজের মতো নিখুঁত এবং সুন্দর ছিল না। সূচ এবং সুতো ব্যবহারের ক্ষেত্রেও পদ্ধতিগত তারতম্য অবশ্যই ছিল। পরবর্তীকালে মোঘল শাসকদের ইতিহাস থেকে জানা যায় ভারতবর্ষে চিকনশিল্পের বিকাশে মোঘল সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের ভূমিকা ছিল অন্যতম। সুতরাং, একই ইতিহাসের নানা তথ্য এবং সংযোগসূত্র পাওয়া যায় বিভিন্ন উপাদান সামগ্রীর মধ্যে দিয়ে।

পারস্যের শিল্প

অনেকে মনে করেন ঢাকার নবাবেরা মূলত পারস্য থেকে এই শিল্পের প্রচলন ভারতবর্ষে নিয়ে আসে। আবার অনেকের মতে এই শিল্পের প্রসার ঘটেছে মোঘলদের সাহচর্যে। আবার আরবের সঙ্গেও এই সময়ে ভারতের ব্যবসা-বাণিজ্য মোটামুটি ভাল অবস্থাতেই ছিল, কাজেই তাদের হাত ধরে ভারতে চিকন শিল্পের সূচনা হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়, এমন মতামতও পাওয়া যায়। চিকন শব্দটির বিভিন্ন অর্থ রয়েছে। ফার্সিতে ‘চিকণ’ অর্থ সূচীকর্ম; তেলেগুতে ‘চিককণি’ অর্থে সুন্দর, ‘চিকণ গাঁথনে বাড়িল বেলা।’ সূক্ষ্ম,পাতলা (fine) অর্থে, এছাড়াও সংস্কৃতে ‘চিক্কণ’,হিন্দিতে  ‘চিকনা’, মারাঠীতে  ‘চিকণ’, গুজরাটিতে ‘চিকণু’ এবং মৈথিলীতে ‘চিকন’ অর্থে মসৃণ, স্নিগ্ধ বা চকচকে বোঝায়।

চিকনের কারুকার্য আমরা বিভিন্ন স্থানেই দেখে থাকি। বিভিন্ন পাজামা-পাঞ্জাবি, সালোয়ার-চুড়িদার তৈরির কাপড়, দোপাট্টা, টেবিল ক্লথ, রুমাল এবং অন্যান্য অনেক কিছুতেই এই সূচীশিল্পের ব্যবহার বিশেষভাবে চোখে পড়ে।

চিকনের যে ছয়প্রকার কাজের সঙ্গে আমরা পরিচিত, তাদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর কাজ হল বুখিয়া। এছাড়া সাধারণ বা সিম্পল কাজের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল তয়পচী। শনা যায় লখনৌ শহরে চিকনের কাজের জনপ্রিয়তা প্রায় ২০০ বছরেরও বেশি পুরনো। কথিত আছে প্রখ্যাত চিকন-শিল্পী ফইয়াজ খান যিনি চিকন শিল্পের উপর উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য ১৯৬৪-৬৫ সালে জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন, তার জনৈক পূর্বপুরুষ ওস্তাদ মহম্মদ শের খাঁ লখনৌ শহরে আগত এক বিদেশী পর্যটক চিকন-শিল্পীর নিকট এই কাজ শেখেন।

এই প্রসঙ্গে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উল্লেখ করতে হয়। ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাস লখনৌকে GI (GEOGRAPHICAL INDICATION) ট্যাগ দেওয়া হয় চিকন বস্ত্রবয়নশিল্পের জন্য।

 

তথ্যসূত্র- উইকিপিডিয়া