SalamWebToday নিউজলেটার
Sign up to get weekly SalamWebToday articles!
আমরা দুঃখিত কোনো কারণে ত্রুটি দেখা গিয়েছে:
সম্মতি জানানোর অর্থ, আপনি Salamweb-এর শর্তাবলী এবং গোপনীয়তার নীতি মেনে নিচ্ছেন
নিউজলেটার শিল্প

চীনের উইঘুর মুসলিমদের প্রতি সরকারের বিরূপ মনোভাবের কারণ

এশিয়া ১৮ ফেব্রু. ২০২১
মতামত
চীনের উইঘুর
© Bbbar | Dreamstime.com

চীনের উইঘুর জাতি অতীতের অধিকাংশ সময়েই স্বাধীন ভাবে কাটিয়েছে, তাই পৃথক রাজ্য গঠনের পক্ষে এই এলাকায় জনপ্রিয় জনমতের অস্তিত্ব ছিল। উইঘুররা মূলত তুর্কী বংশোদ্ভূত হলেও জাতিগত, সাংস্কৃতিক এবং ভাষাগত ভাবে অনেকটাই আলাদা। বহু শতক আগে ইসলাম গ্রহণ করার পর থেকে তারা মুসলিম রাষ্ট্রের অধীনেই থেকেছে। অপরদিকে, হুই জনগোষ্ঠী মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও জাতিগত ভাবে সংখ্যাগুরু হান চীনাদের চেয়ে কোনও ভাবেই ভিন্ন নয়।

চীনের উইঘুর বনাম হুই

হুই মুসলিমরা অতীতে চীনা শাসনের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করার পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রেই তারা সরকারের হয়ে উইঘুরদের বিরুদ্ধে লড়াইও করেছে। তাই উইঘুর এবং হুইরা মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও তাদের মধ্যে মতৈক্য নেই, এবং তারা নিজেদের সম্প্রদায়ের মধ্যেই থাকতে পছন্দ করে এবং নিজেদের মসজিদেই প্রার্থনা করে। যদিও এই ধরনের মানসিকতা দিনে দিনে কমছে, কারণ মুসলিমদের বিভিন্ন সম্প্রদায় ক্রমাগত একটি সম্প্রদায় হিসেবে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে।

বহু ক্ষেত্রে চীনা সরকার উইঘুরদের ক্ষেত্রে দমনমুলক আইন প্রয়োগ করেছে, কিন্তু তার কোনও প্রভাব হুইদের উপরে পড়েনি। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে, কারণ সম্প্রতি দেখা গিয়েছে যে, চীনা সরকার হুইদের ইসলাম ধর্মের রীতিনীতি পালনের উপরে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। কিন্তু উইঘুরদের সর্বদাই সন্দেহের চোখে দেখা হয়েছে।

চীনের উইঘুর-দের প্রতি আন্তর্জাতিক রাজনীতি

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তিধরদের মধ্যে প্রভাব এবং আধিপত্যের লড়াইয়ের জেরে এই সমস্যা আরও জটিল হয়েছে। উইঘুরের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দশক ধরে মদত দিচ্ছে। এটা সহজেই অনুমেয় যে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ নিঃস্বার্থ নয়। কারণ, বর্তমান দশকেই, শিনচিয়াঙে পরিত্যক্ত তেল এবং খনিজের ভাণ্ডারের খোঁজ মিলেছে এবং এটি হল চীনের সব থেকে বড় প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদক অঞ্চল।

“সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ”-এর অপব্যবহার

৯/১১ এবং “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” এর তাৎক্ষণিক পরিণাম হিসেবে চীনা সরকার শিনচিয়াঙের মুসলিমদের জীবনযাপন পদ্ধতির উপরে কঠোর নিষাধাজ্ঞা আরোপ করতে বিন্দুমাত্র দেরি করেনি। চীনা সরকার দাবি করে যে, শিনচিয়াঙের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও আন্তর্জাতিক স্তরের সন্ত্রাসবাদীদের মধ্যে সুসম্পর্ক রয়েছে এবং “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ”কে সামনে রেখে এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রনীতিকে হাতিয়ার করার মাধ্যমে তারা শিনচিয়াঙের বিরুদ্ধে আক্রমণ তীক্ষ্ণ করে তুলেছে।

২০০১ সালের নভেম্বরে, জাতিসংঘের মানবাধিকার হাই কমিশনার ম্যারি রবিনসন চীনকে সতর্ক করে বলেছিলেন যে, সংখ্যালঘু গোষ্ঠীকে দমন করার জন্য যেন তারা কোনও ভাবেই আমেরিকার নেতৃত্বে পরিচালিত সন্ত্রাসবাদ অভিযানকে হাতিয়ার না করে। দুর্ভাগ্যবশত, চীন এই সতর্কবাণীতে কর্ণপাত করেনি।

চীনের উইঘুর-দের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন

স্থানীয় ছোটখাট বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনগুলিতে কোনও ভাবেই মুসলিমদের অবদান ছিল না – এই আন্দোলনকারীরা হয় ধর্মনিরপেক্ষ, কমিউনিস্ট বা বর্তমান “আল-কায়দা” প্রকৃতির গোষ্ঠীভুক্ত ছিল, যাদের কোনওটিই মূল মুসলিম ভাবধারার প্রতিফলন নয়। কাজেই এই ধরনের আন্দোলনগুলির সাথে উইঘুর মুসলিমদের যোগ থাকার যে অভিযোগ তোলা হয়, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

২০০৭ থেকে ২০১৫-এর মধ্যে কয়েকটি আল কায়দার ধাঁচের আক্রমণের ফলে, চীনের মতে তিনটি ক্ষতিকারক বিষয়ের বিরুদ্ধে তাদের লড়াই করার জন্য কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়েছে, এগুলি হল – বিচ্ছিন্নতাবাদ, সন্ত্রাসবাদ এবং ধর্মীয় উগ্রবাদ।

চীনের বিভিন্ন কঠোর পদক্ষেপ

সর্বপ্রথম, ইসলামি রীতিনীতির সাথে বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যকলাপকে এক দৃষ্টিতে দেখার ফলে, চীন রাষ্ট্র বেআইনিভাবে সমস্ত রকম ইসলামিক পড়াশোনা এবং ধর্মীয় অনুশীলনকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হিসেবে ঘোষণা করে। শিনচিয়াঙে বসবাসকারী কয়েক হাজার উইঘুরকে কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং কোনও রকম বিচার ছাড়াই কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়।

চীন শুধু এখানেই থেমে থাকেনি, বরং উইঘুর মুসলিমদের বলপ্রয়োগের মাধ্যমে কমিউনিস্ট আদর্শ গ্রহণ ও পালন করতে বাধ্য করা হচ্ছে এবং তাঁরা ইসলাম ধর্ম সম্পর্কিত সমস্ত অনুশীলন পরিত্যাগ করতে কার্যত বাধ্য হচ্ছেন। উইঘুরদের পুনঃশিক্ষার মাধ্যমে কমিউনিস্ট পার্টির গান গাওয়ানো হচ্ছে।

উইঘুররা অধিকার দাবী করে, স্বাধীনতা না

যদিও চীনের বহু সংবাদ মাধ্যমে, এমনকী পশ্চিমী দেশগুলির সাংবাদিকরাও বার বার উল্লেখ করেছেন যে, শিনচিয়াঙের মূল উদ্দেশ্যহল বিচ্ছিন্নতাবাদ। কিন্তু শিনচিয়াঙের অধিকাংশ উইঘুরের প্রত্যাশা হল, শুধু চীনা নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি। যার দ্বারা তাঁরা রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ব্যতীত নিজেদের ধর্ম পালন করতে, নিজেদের ভাষায় পড়াশোনা করতে এবং নিজেদের প্রচলিত সংস্কৃতি পালন করতে পারেন।

এগিয়ে যাওয়ার পথ

ইতিহাসে প্রমাণ আছে, নাগরিকদের তাঁদের ধর্মাচরণের স্বাধীনতা দিলে রাষ্ট্র এবং সমাজ সমৃদ্ধ হয়, অন্যদিকে নিপীড়নমূলক নীতি শুধু অশান্তি, হিংসা আর রাষ্ট্রের পতনের কারণে পরিণত হয়।

মুসলিমরা চীনে হাজার বছর ধরে আইনকে সম্মান করে সংখ্যালঘু হিসেবে বসবাস করছে। যে রাষ্ট্রনেতারা সন্ত্রাসবাদের ভয়ে সাধারণ মুসলিম নাগরিকদের উপরে নির্যাতন করে, তাঁদের একটা কথা জানান অত্যন্ত জরুরি। ইসলাম কোনও ভাবেই সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করে না। বরং ইসলামের সত্য জ্ঞান সন্ত্রাসবাদকে চিরতরে পৃথিবীর বুক থেকে মুছে দিতে পারে।