চীনের সাথে ইসলামের প্রথম পরিচয় কীভাবে ঘটেছিল?

Emin Minaret(Sugongta). a famous historic site in Turpan, Xinjiang, China
Emin Minaret(Sugongta). a famous historic site in Turpan, Xinjiang, China.Photo 90773601 © - Dreamstime.com

‘কুয়াংচৌয়ের বড় মসজিদ’ হুয়াইশেং মসজিদ নামেও পরিচিত, যার অর্থ ‘নবীকে স্মরণ করুন’ (নবীর স্মৃতিতে মসজিদ) এবং এটি ‘কুয়াংতা মসজিদ’ নামেও পরিচিত যার ইংরেজি অর্থ হল “দ্য বেকন টাওয়ার মস্ক” বা বাংলায় “বাতিঘর মসজিদ”। হুয়াইশেং মসজিদটি কুয়াংতা রোডে (লাইট প্যাগোডা রোড) অবস্থিত যা রেনমিন ঝংলু থেকে পূর্ব দিকে চলে গিয়েছে।

৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে অর্থাৎ ইসলাম ধর্মের জন্মের আগে, আরব সমুদ্রযাত্রীরা “মধ্য সাম্রাজ্য” (চীন) এর সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল। আরব জাহাজগুলি সাহস করে আরব উপসাগরের প্রান্তে বসরা এবং পারস্য উপসাগরের কায়েস (সিরাফ) শহর থেকে যাত্রা শুরু করেছিল। তারা ভারত মহাসাগর ধরে আসার সময় সরণদীপ (শ্রীলঙ্কা) পেরিয়েছিল এবং সুমাত্রা ও মালয়েশিয়া উপদ্বীপের মধ্যবর্তী মালাক্কা প্রণালী হয়ে পৌঁছেছিল দক্ষিণ চীন সাগরে। তারা দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের ছুয়ানচৌ এবং কুয়াংচৌ বন্দরের সাথে বাণিজ্য চালাত। কিছু আরব সেই সময়ে চীনে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেছিলেন এবং সম্ভবত যখন প্রথম মুসলিম প্রতিনিধিরা এসেছিলেন তখন তাঁরা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, কারণ তাঁদের পরিবার-পরিজনরা তখনও আরবে ছিলেন এবং তাঁরা সকলে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। 

কুয়াংচৌ-কে আরবরা বলতেন খানফু, যাঁরা পরবর্তীকালে সেখানে মুসলিম কোয়ার্টার নির্মাণ করেছিলেন যা ধীরে ধীরে বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। সুবিধাজনক ভৌগলিক অবস্থানের সৌজন্যে কুয়াংচৌ চীনের প্রাচীনতম বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক বন্দর শহর হিসাবে গড়ে উঠিছিল। একাধিক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী চীন বিশ্ব ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। বর্তমানে বিশ্বের উন্নত দেশগুলির মধ্যে অন্যতম হওয়ার পাশাপাশি চীন বরাবর অত্যন্ত সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে পরিচিত। 

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) যখন একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই সময় চীন তার একতা রক্ষা ও প্রতিরক্ষা নিয়ে ব্যস্ত ছিল। প্রাচীন চীনা ইতিহাসে মুসলিম আরবদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং তাদের সাম্রাজ্যকে আল-মদিনা (আরবের) বলা হত। চীনা ভাষায় ইসলামকে বলা হয় “ইসিলান জিয়াও” (যার অর্থ “বিশুদ্ধ ধর্ম”)। 

চীনে ইসলামের আগমন সম্পর্কিত বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক মত রয়েছে। অনেকে দাবি করেন যে, আবিসিনিয়া (ইথিওপিয়া) থেকে কয়েক মাসের ব্যবধানে মুসলমানরা দুটি দলে প্রথম চীনে এসেছিলেন।

ইথিওপিয়া এমন এক দেশ যেখানে মক্কার কুরাইশ উপজাতির অত্যাচারের ভয়ে বহু মুসলমান অন্য দেশে পালিয়ে গিয়ে আত্মরক্ষা করেছিলেন। মনে করা হয়, এই শরণার্থীদের মধ্যে হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) – এর এক কন্যা হযরত রুকাইয়া (রাঃ) , তাঁর স্বামী উসমান ইবনে আফফান (রাঃ), সাদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রাঃ) এবং আরও অনেক বিশিষ্ট সাহাবী ছিলেন। আবিসিনিয়ার রাজা আটমাহা নেগাস তাঁদের অ্যাক্সাম শহরে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রদান করেছিলেন।

হুয়াইশেং মসজিদের ইতিহাস জানতে হলে ফিরে দেখতে হবে তাং রাজবংশের (৬১৮-৯০৭) শাসন তথা “চীনা ইতিহাসের স্বর্ণযুগ” চলাকালীন সপ্তম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ইসলামিক সংস্কৃতিকে। মহানবী( সাঃ) -এর মৃত্যুর ১৮ বছর পরে, খলিফা উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) (শাসনকাল ৬৪৪-৬৫৬ খ্রিস্টাব্দ)-এর হাত ধরে ইসলাম ধর্মের সাথে চীনের প্রথম পরিচয় হয়।

সর্বপ্রথম যাঁরা ইসলাম গ্রহণ ও পবিত্র কুরআন মুখস্থ করেছিলেন, তাঁদের অন্যতম ছিলেন খলিফা উসমান (রাঃ)। শান্ত ও কোমল স্বভাবের অধিকারী হযরত উসমান (রাঃ)  বিয়ে করেছিলেন হযরত রুকাইয়া (রাঃ)-কে এবং তাঁর মৃত্যুর পরে হযরত উম্মে কুলসুম (রাঃ) (উভয়ই নবীর কন্যা ছিলেন)-কে বিয়ে করেন। ফলস্বরূপ তাঁকে ‘ধু-এন-নুরায়েন’ (যাঁর কাছে দুইটি আলো রয়েছে) উপাধি দেওয়া হয়েছিল। সাহাবীদের স্মৃতি থেকে পবিত্র কুরআন সংকলনের আদেশ দেওয়া এবং ইসলামী সাম্রাজ্যের চারটি কোণে তার অনুলিপি পাঠানোর জন্য হযরত উসমান (রাঃ) অত্যন্ত প্রশংসিত হয়েছিলেন।

সাদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রাঃ)-এর (মৃত্যু ৬৭৪ খ্রিস্টাব্দ) নেতৃত্বে হযরত উসমান (রাঃ) চীনে একটি প্রতিনিধি দল প্রেরণ করেছিলেন। স্থাপত্যশিল্পে দক্ষ সাদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রাঃ) চীনের প্রথম মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, এবং সেখানেই ইসলামি স্থাপত্যশৈলীর সাথে চীনা স্থাপত্যশেলীর মেলবন্ধন ঘটেছিল। চীন ইতিহাসবিদ লিউ চিহ ১২ খন্ডের ‘মহানবীর জীবনী’ বইটিতে লিখেছেন অবিসিনিয়া বা ইথিওপিয়া থেকে ৬১৬ খ্রিস্টাব্দে সাদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রাঃ) একদল সাহাবীদের নিয়ে চীনে প্রথম আসেন। কয়েকজন সাহাবী জীবিকার সন্ধানে আরব ভূমে ফিরে যাননি, চীন এবং যত্রতত্র ছড়িয়ে পড়েছিলেন। এই ২১ বছর পর ফের পবিত্র কোরআনের একটি লিপি নিয়ে সাদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রাঃ) চীনের পথে পা বাড়ান। 

তাং রাজবংশের প্রাচীন ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুসারে, সাদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাঃ) এবং তাঁর সাথীরা যে বিশেষ রুট ধরে চীনে এসেছিলেন ৬৫০ খ্রিস্টাব্দে, অর্থাৎ ভারত মহাসাগর এবং চীন সাগর হয়ে তাঁরা পৌঁছেছিলেন কুয়াংচৌ বন্দরে। সেখান থেকে তাঁরা স্থলপথে রওনা পৌঁছেছিলেন বর্তমান শিয়ান-এ, এই যাত্রাপথই পরবর্তী কালে “সিল্ক রুট” নামে পরিচিত হয়।

চিনে বসবাসকারী অন্যতম সাহাবী ৬৩৫ খ্রিস্টাব্দে মারা গিয়েছিলেন এবং তাকে হামি-র পশ্চিমে শহরাঞ্চলে সমাহিত করা হয়েছিল। তাঁর সমাধি “গিজেস মাজারস” নামে পরিচিত এবং আশেপাশের এলাকাবাসী তাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করে। এর অবস্থান উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ শিনচিয়াং-এ এবং ওই প্রদেশের উত্তর-পূর্বের রাজধানী উরুমকি থেকে প্রায় ৪০০ মাইল পূর্বে। শিনচিয়াং আয়তনের দিক থেকে জাপানের চারগুণ, আটটি ভিন্ন দেশের সাথে তার আন্তর্জাতিক সীমানা রয়েছে এবং এটি হল তুর্কি-ভাষী উইঘুরদের বাসস্থান। তাই, চীনের বৃহত্তম ইসলামিক অঞ্চল হওয়ার পাশাপাশি ভৌগোলিকভাবেও শিনচিয়াং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল।

সর্বজনীন হওয়ার কারণে বিভিন্ন জাতি ও দেশের মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং চীনে এই বিষয়টি আরও স্পষ্ট। কারণ চীনের আদি বাসিন্দারা দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তার ফলে আজও সৌদি আরব-সহ যে কোনও আরব দেশের মোট জনসংখ্যার চেয়ে চীনের মুসলিমদের সংখ্যা অনেক বেশি।