শরিয়াহ সম্মত ওয়েব পরিবেশ. আরওসন্ধানকরুন

চোখ ‘ছানাবড়া’ হয় মুর্শিদাবাদের নবাবি মিষ্টি দেখলে

ID 113324252 © Alex Sipetyy | Dreamstime.com

ব্রিটিশ শাসনের আগে পর্যন্ত বাংলা, বিহার ও ওড়িশার রাজধানী হিসেবে পরিচিত পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ প্রাচীন পদচিহ্নের ধারক ও বাহক। সময় যেন থমকে গিয়েছে এখানে। পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম সেরা পর্যটন কেন্দ্র মুর্শিদাবাদ বিখ্যাত, নবাবি আমলের ভাস্কর্য, হাজারদুয়ারী, ইমামবরা, কাটরা মসজিদের জন্য। শিল্প, চিত্রকলার পাশাপাশি সুবে বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদের মিষ্টিও কিন্ত ভীষণ জনপ্রিয়। বিখ্যাত মিষ্টিগুলির মধ্যে প্রথমেই উল্লেখযোগ্য ছানাবড়া। ঠিক কবে এই মিষ্টির উদ্ভব ঘটে সে সম্পর্কে তেমন কোনও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া না গেলেও অনুমান করা হয় ছানাবড়ার উদ্ভব হয়েছিল নবাবি আমলেই। কথিত রয়েছে, নবাবি আমলের প্রায় শেষের দিকে মুর্শিদাবাদ শহরে নিমাই মণ্ডল নামে এক ব্যক্তি শহরের বুকে একটি মিষ্টান্নের দোকান দিয়েছিলেন। সেই দোকানের ছানাবড়া নাকি খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। কথিত রয়েছে, সেই দোকান থেকে ছানাবড়া নিয়মিত নবাব প্রাসাদে সরবরাহ করা হত। নবাবদের ছানাবড়া প্রীতির গল্প কতখানি সত্য তা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও মুর্শিদাবাদের নিজামত পরিবারে যে মাঝে মাঝেই ছানাবড়ার প্রবেশ ঘটত, তাতে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। মুর্শিদাবাদে ছানাবড়ার তৈরির দু’জন বিখ্যাত কারিগর ছিলেন সৈদাবাদের পটল সাহা ও গোপেশ্বর সাহা। পটল সাহা অবশ্য পটল ওস্তাদ নামেই খ্যাত ছিলেন। তাঁর হাতের ছানাবড়া সাধারণ মানুষ তো বটেই, এমনকি রাজারাও মুগ্ধ হতেন। কথিত রয়েছে কাশিমবাজারের রাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী ছানাবড়ার খুব সমঝদার ছিলেন। এবং তাঁর হাত ধরেই ছানাবড়ার সুনাম মুর্শিদাবাদের গণ্ডী পেরিয়ে বহু দূর অবধি ছড়িয়ে পড়েছিল।
শোনা যায় নবাবের আমলে একটি ছানাবড়ার ওজন হতো এক কুইন্টাল। এখনকার ‘ওস্তাদ’রা ততটা বিশাল মাপের ঐতিহ্যবাহী এই মিষ্টি তৈরি করতে পারেন না। তবে তাঁরা ৩০কেজি, ১০কেজি বা ৫ কেজি ওজনের ছানাবড়া হামেশাই তৈরি করেন। ২০০৮সালের একটি অনুষ্ঠানে ৩০কেজি ওজনের একটি ছানাবড়া দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন তৎকালীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়। রাহুল গান্ধী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও এখানকার বিশেষ এই মিষ্টির প্রশংসা করেছেন। তাই মুর্শিদাবাদের মিষ্টি ব্যবসায়ীরাও চাইছেন এই মিষ্টিও ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ বা জিআইয়ের তকমা পাক। ছানাবাড়ার এমন স্বাদ আর অন্য কোনও রাজ্যে পাওয়া যায় না।
মুর্শিদাবাদের মিষ্টি ব্যবসায়ী সংগঠনের বিজয় গোপাল সাহা বলেছিলেন, ‘আমরা ছানাবড়ার কেন জিআই পাব না বলুন তো? এমন মিষ্টি আর কোথাও তৈরি হয় না। নবাবের আমলে এক ওস্তাদ প্রথম এই মিষ্টি তৈরি করেছিলেন। ভালো মিষ্টি তৈরি করলে তাঁরা ওস্তাদ নামে পরিচিত। আগে নবাবদের ডাইনিং টেবিলে ছানাবড়া শোভা বৃদ্ধি করত। যে যেমন আকৃতির চান তাঁকে ঠিক তেমনটাই করে দেওয়া হয়। তবে দোকানে পাঁচ টাকা এবং ১০টাকার ছানাবড়া বেশি বিক্রি হয়।’
বহরমপুর শহরে প্রায় ১০০টি মিষ্টির দোকান রয়েছে। সব দোকানের সামনেই শোভা পায় ছানাবড়া। এছাড়া জেলাতে প্রায় ১৫০০টি দোকান রয়েছে। অধিকাংশ দোকানেই এই মিষ্টি পাওয়া যায়। বহরমপুরের আরেক মিষ্টি বিক্রেতা সুজিত সাহা বলেন, ছানাবড়া তৈরি করতে ছানা, মিছরি বা চিনি, এলাচ এবং আটা দরকার হয়। অন্যান্য জেলাতেও এই মিষ্টি তৈরি হলেও আমাদের কারিগরদের মতো তারা তা তৈরি করতে পারে না। বাইরে থেকে যারা জেলায় আসেন তাঁরা বিশেষ এই মিষ্টি কিনে নিয়ে যান। সারা বছরই ছানাবড়া তৈরি হয়। পুজোর সময় বা অন্যান্য উৎসবে অতিরিক্ত মিষ্টি তৈরি করে রাখতে হয়। জেলার কেউ বাইরে কোথাও আত্মীয়ের বাড়িতে গেলে সঙ্গে করে এই মিষ্টি নিয়ে যান।
আজ মুর্শিদাবাদের প্রায় সর্বত্রই ছানাবড়া পাওয়া যায়। কিন্ত ছানাবড়ার উদ্ভব যে শহরে হয়েছিল বলে অনুমান করা হয়, সেই মুর্শিদাবাদ শহরেই আজ ছানাবড়ার তেমন কোনও ভাল দোকান নেই। পুরানো ঐতিহ্যবাহী যে সব দোকানগুলি ছিল সেগুলি আজ বন্ধ। বর্তমানে মুর্শিদাবাদের ছানাবড়া বললে বহরমপুরের ছানাবড়াকেই সাধারণত বোঝানো হয়। বহরমপুরের খাগড়ার ছানাবড়া আজও সমান জনপ্রিয়। খাগড়া ছাড়াও শহরের বেশ কিছু এলাকায় ভাল মানের ছানাবড়া এখনও পাওয়া যায়।
এছাড়া বাকরখানি এক বিস্মৃত জনপ্রিয় মিষ্টি এই জেলার। এক বিয়োগান্তক প্রেম কাহিনি লুকিয়ে বাকরখানি নামের মধ্যে। মুর্শিদাবাদের মানুষ চায়ের সাথে ‘বাখোর’ বিস্কুটের সঙ্গে অভ্যস্ত হলেও অনেকেই আমরা বাকরখানির নাম জানি না। অথচ এই বাখোর বিস্কুটেরই আদি নাম বাকরখানি।
বাকরখানি ছিল ময়দা দিয়ে তৈরি রুটি জাতীয় খাবার বিশেষ। ময়দা থেকে রুটি বানিয়ে তা মচমচে বা খাস্তা করে ভেজে বাকরখানি তৈরি করা হত। জনশ্রুতি অনুসারে, নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর দত্তক ছেলে আগা বাকের খাঁর নামানুসারে এই রুটির নামকরণ করা হয়েছে।
আগা বাকের প্রখর মেধার অধিকারী যুদ্ধবিদ্যাতেও পারদর্শী ছিলেন। রাজধানী মুর্শিদাবাদের নর্তকী খনি বেগমের প্রেমে পড়েন আগে বাকের। কিন্ত উজিরপুত্র নগর কোতোয়াল জয়নাল খান ছিল পথের কাঁটা। সে খনি বেগমকে প্রেম নিবেদন করলে তিনি জয়নাল খানকে প্রত্যাখান করেন। প্রত্যাখ্যাত হয়ে জয়নাল খনি বেগমকে হত্যা করে। ঐতিহ্যবাহী বাকরখানি রুটির নামের পেছনে রয়েছে বাকের খান এবং খনি বেগমের নাম। আসলে বাকের খাঁন হয়তও তাঁর প্রেমকে অমর রাখতেই রুটির এই নামকরণ করেন। মুর্শিদাবাদের নবাব পরিবারে বাখরখানি রুটির জনপ্রিয়তা থাকলেও বর্তমানে সেই জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েছে। এর কারণ হিসেবে নতুন প্রজন্মের চাহিদার অভাবকেই দায়ী করা যেতে পারে।

কিছুবলারথাকলে

যোগাযোগকরুন