ছদ্মরূপে হলেও, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ইসলাম মেনেছিলেন আমেরিকায় বিক্রি হওয়া বহু আফ্রিকান ক্রীতদাস 

dreamstime_s_191298991

বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে আমেরিকার বেশ কয়েকটি সংরক্ষণাগার ও গ্রন্থাগার থেকে আফ্রিকান দাসেদের বহু নথিপত্র উদ্ধার হয় এই সংগ্রহের মধ্যে মিলেছে কুরআনের আয়াত, ব্যক্তিগত চিঠি এবং স্বদেশের মুসলিম নেতৃবৃন্দের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা চিঠি দুঃখের বিষয়, মালিকদের হাত থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার আকুতি-ভরা এই চিঠিগুলি কখনও তাদের প্রাপকদের কাছে পৌঁছয়নি বহু দশক ধরে বাক্সবন্দি অবস্থায় পড়েছিল এই চিঠিগুলি আমেরিকার ক্রীতদাসদের লেখা এই চিঠিগুলি থেকে তাদের স্বদেশ এবং পটভূমি সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্য জানা গিয়েছে এই সংগ্রহের অধিকাংশ চিঠি থেকে এ কথা স্পষ্ট বোঝা যায় যে, লেখকরা মুসলিম ছিলেন

এই চিঠি ও নথিগুলি থেকে জানা যায়, আটলান্টিক মহাসাগর অতিক্রম করে আমেরিকা আসার সময় কী ধরনের অমানবিক পরিস্থিতি তাঁদের সহ্য করতে হয়েছেএই ক্রীতদাসদের মধ্যে বহু মুসলমান ছিলেন, তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন সুশিক্ষিত তাঁদের মধ্যে যেমন ধর্মীয় ও উপজাতির নেতারা ছিলেন, তেমনই আবার সামরিক বাহিনীর সদস্যরাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন ফলে এই মুসলমান দাসেরা নিজেদের কাজে দক্ষতার পরিচয় দিয়ে বহু ক্ষেত্রেই ক্রীতদাসদের শ্রেণিবিভাজনের শীর্ষে উঠে আসতেন, এবং একটা সময়ে ক্রীতদাসের জীবন থেকে মুক্তি লাভ করে আফ্রিকায় ফিরে যেতেন 

একটি ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, একজন দাস তার মনিবের বাগানের সমস্ত রেকর্ড আরবী ভাষায় লিখে রেখেছিলেন মুসলমানদের সাথে যেহেতু আরবী ভাষার ঘনিষ্ঠ যোগ রয়েছে, তাই এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে যে, ওই মুসলিমরা আমেরিকার দাসত্বের ইতিহাসের একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল ১৮২৮ সালের একটি আকর্ষণীয় উপাখ্যান থেকে জানা যায়, একজন খ্রিস্টান শিক্ষক কোনও একজন দাস-কে নিজের মাতৃভাষায় প্রভুর প্রার্থনা লিখতে বলেছিলেন। সেই খ্রিস্টান ব্যক্তি আরবী ভাষায় লিখিত সেই নথিতে সাক্ষী হিসেবে নাম স্বাক্ষরও করেছেন কয়েক দশক পরে সেই দলিলটি পাঠোদ্ধার করে দেখা যায়, সেই দাস প্রভুর প্রার্থনা লেখার পরিবর্তে কুরআনের প্রথম অধ্যায় লিখেছিলেন 

বিভিন্ন নথি থেকে জানা যায়, বহু মুসলিম দাস আমেরিকাতে এসেও ইসলামী জীবনযাত্রা ধরে রাখার জন্য প্রচুর প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন আফ্রিকান-আমেরিকান পণ্ডিত এরিক লিঙ্কন মনে করেন, এই মুসলমান দাসেদের ইসলামের স্মৃতি এবং তাঁদের পূর্ববর্তী জীবনধারার অভ্যাস কখনওই পুরোপুরি বিনষ্ট হয়নি অনেকে খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার বিরোধিতা করেছিলেন অনেকে আবার ছদ্মরূপে নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাস পালন করে গিয়েছিলেন অনেক দাস মালিক এবং তাদের পূর্বপুরুষ দাসদের অনুশীলন এবং অভ্যাসগুলি পরবর্তীকালে মনে রাখতে পেরেছিলেন, তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন যে সেই দাসেরা মুসলমান ছিলেন

জর্জিয়ার উপকূলে অবস্থিত সাপেলো দ্বীপে, কিছু নির্দিষ্ট ইসলামিক অনুশীলন এখনও অবধি রয়ে গিয়েছে গির্জায় পুরুষ এবং মহিলারা আলাদা সারিতে বসেন, যেমনটা সাধারণত মসজিদে করা হয়। সমস্ত জুতা সরানো হয় এবং মহিলারা তাঁদের চুল ঢেকে রাখেন গির্জাগুলি মক্কার দিকে মুখ করে নির্মীত হয়েছে এবং মৃতদেহগুলিও মক্কার দিকে মুখ করে কবর দেওয়া হয়েছে সাপেলো দ্বীপের অধিকাংশ কৃষ্ণাঙ্গ বাসিন্দা হলেন বিলালী মুহাম্মদ নামক এক মুসলমানের বংশধর, যাঁকে ১৮০৩ সালে সাপেলো দ্বীপে দাস হিসেবে আনা হয়েছিল। তিনি আরবি পড়তে ও লিখতে পারতেন এবং কুরআনের অনুলিপি দিয়ে তাঁকে কবর দেওয়া হয় তাঁর স্ত্রী ফিবি হিজাব পরতেন, এবং তাঁর মেয়েদের নাম ছিল মদিনা ও ফতেমা। ইসলামী বিশ্বাস এবং ওযুর নিয়ম, সকালের নামাজ এবং নামাজের আহ্বানের উপরে, ১৮২৯ সালে বিলালী একটি ছোট বই রচনা করেছিলেন। এটি বিলালী দলিল হিসাবে পরিচিত, যা বর্তমানে জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহে রয়েছে।

১৮৩৯ সালের আগস্টে, অ্যামিস্টাড নামক জাহাজে চাপিয়ে কয়েক জন আফ্রিকান-কে ক্রীতদাস হিসেবে স্পেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। কোনও ভাবে সেই দাসেরা বিদ্রোহ করেন এবং জাহাজের ক্যাপ্টেনকে হত্যা করেন। বিদ্রোহীরা জাহাজের কয়েক জন কর্মীকে এই শর্ত দেন, হয় জাহাজ ঘুরিয়ে ফের আফ্রিকার উপকূলের দিকে নিয়ে যেতে হবে আর না হলে, তাঁদের হত্যা করা হবে। জাহাজের কর্মীরা আফ্রিকার দিকে জাহাজ নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রাণ বাঁচালেও তাঁরা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। অ্যামিস্টাড জাহাজ নোঙর করেছিল আমেরিকার লং আইল্যান্ডে, এবং বিদ্রোহী দাসেদের বিচার শুরু হয়  কানেক্টিকাটে। বিচার চলাকালীন জানা যায়  যে, ওই দাসেরা আফ্রিকান মুসলমান এবং বর্তমান সিয়েরা লিওনের বাসিন্দা ছিলেন।

এখনও পর্যন্ত বিভিন্ন সংগ্রহ থেকে যে পরিমাণ প্রমাণ মিলেছে, তা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের যে আফ্রিকান পুরুষরা ক্রীতদাস হিসেবে কাজ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অনেকেই মুসলমান ছিলেন। এবং তাঁদের মধ্যে অধিকাংশই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মনে-প্রাণে মুসলমান ছিলেন।