ছবি না লেখা? কোন পদ্ধতিতে শিক্ষা সন্তানের জন্য কার্যকরী?

শিক্ষা ০৭ এপ্রিল ২০২১ Contributor
ফিচার
কোন পদ্ধতিতে শিক্ষা

কোন পদ্ধতিতে শিক্ষা সন্তানের জন্য কার্যকরী? সন্তান একটু বড় হলেই এ নিয়ে ভাবনা শুরু হয়ে যায় তার আম্মি-আব্বুর। তাকে স্কুলে ভর্তি করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন তাঁরা। সে কীভাবে শিখবে ‘অ’-‘আ’-‘ক’-‘খ’ বা ‘এ’-‘বি’-‘সি’-‘ডি’, কাকে বলে আম, কোনটাই বা আঙুর, কীভাবেই বা সে ‘এক’-‘দুই’-‘তিন’-‘চার’ গুনতে শিখবে, সেই নিয়ে ভাবনাচিন্তার অন্ত থাকে না তাঁদের। ছবি দেখে নাকি অন্য কোনওভাবে, কোন পদ্ধতিতে বাচ্চাদের শেখালে তাদের মাথায় সহজে বিষয়টা গেঁথে থাকবে, এই নিয়ে বিজ্ঞানীরা বহুদিন থেকেই নানা গবেষণা করে আসছেন। সেই বিষয়েই সম্প্রতি জানা গেল নতুন তথ্য।

ছবি নাকি লেখা, কোন পদ্ধতিতে শিক্ষা দরকার ?

এই প্রশ্ন আমাদের মনে চিরন্তন। ‘কগনিটিভ সায়েন্স’ পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়া এক গবেষণা থেকে জানা গিয়েছে, কোনও বিষয়ের বর্ণনা শুনে বিষয়টিকে চেনার পরিবর্তে তাকে চোখে দেখেই সেই বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা করে নেওয়া সম্ভব। এবং এটি শুধুমাত্র একেবারে ছোট শিশুই নয়, সমস্ত বয়সের বাচ্চা, ছাত্র এমনকী প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এই গবেষণাটি বেশ কিছু পুরনো গবেষণার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে এবং গবেষণার ক্ষেত্রে ভিন্ন-ভিন্ন পরিবেশে নানারকম শিক্ষণপ্রণালী বা আওয়াজ ইত্যাদির উপর জোর দেওয়া হয়েছে।

ডার্টমাউথ-এর রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট টিমি মা-র মতে, “মানুষ কীভাবে কোনও কিছু শেখে এবং কোন-কোন বিষয় তার শেখাকে প্রভাবিত করে এটি বুঝতে পারলেই শিক্ষাপদ্ধতির ক্ষেত্রে বেশ কিছু উন্নতি করা সম্ভব।”

শিক্ষণের পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ

কোন পদ্ধতিতে শিক্ষা দেবেন সন্তানকে, সেটি দেখতে গিয়ে বলা যায়, শিক্ষণের পরিবেশ অনেকসময়েই শিক্ষণপ্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ধরুন, একজন ছাত্র একই বিষয় একজন শিক্ষক ও তাঁর সহ-শিক্ষকের থেকে শিখছে। বলা বাহুল্য, এক্ষেত্রে দু’জনের পড়ানোর পদ্ধতি পৃথক হবে। এক্ষেত্রে ছাত্রকে এই পৃথক পড়ানোর পদ্ধতিকে গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু শিক্ষকদের এই নানাভাবে পড়ানোর পদ্ধতিও শিক্ষণকে জটিল করে তুলতে পারে।

এই গবেষণাটির জন্য গবেষকরা ‘ইয়োশ’, ‘ইউগ’ এবং ‘নিজ’ এই তিনটি কাল্পনিক চরিত্রের অবতারণা করেন এবং এদের নাম শেখানোর জন্য তাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য সরবরাহ করেন। এক্ষেত্রে দু’ধরনের শিক্ষণপদ্ধতি অবলম্বন করা হয়।

কোন পদ্ধতিতে শিক্ষা দেবেন সন্তানকে?

প্রথম পদ্ধতিটি হল ‘অবজেক্ট-লেবেল লার্নিং’। এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীকে প্রথমে বস্তুটি দেখানো হয়, তারপর তার নাম জানানো হয়। বিষয়টি অনেকটা রংয়ের নাম জানানোর আগে রংটি দেখিয়ে সে সম্পর্কে ধারণা করে নেওয়ার মতোই।

দ্বিতীয় পদ্ধতিটি ঠিক এর উলটো। এটি ‘লেবেল-অবজেক্ট লার্নিং’ নামে পরিচিত। এক্ষেত্রে ছাত্রটিকে প্রথমে বস্তুটির নাম চেনানো হয়।

এই সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের প্রথমে চরিত্রের ছবির সঙ্গে তাদের কাল্পনিক নামকে মেলাতে বলা হয়। ছবি দেখে নাকি নাম দেখে, কীভাবে সেগুলি চেনা সহজ হবে, সেটি দেখার জন্য এই সংক্রান্ত তথ্যগুলিকে ইচ্ছাকৃতভাবেই ভুল রাখা হয়।

সমীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী, যে-সমস্ত ছাত্ররা আগে বস্তুটিকে দেখে পরে তার নাম শুনেছে, অর্থাৎ ‘অবজেক্ট-লেবেল’ শিক্ষার্থীরা, ‘লেবেল-অবজেক্ট’ শিক্ষার্থী, অর্থাৎ, আগে যারা বস্তুটির নাম শিখে পরে বস্তুটিকে দেখে, সেইসমস্ত শিক্ষার্থীদের চেয়ে দ্রুত শিখতে পারে।

‘ফ্রিকোয়েন্সি বুস্টিং’

গবেষকরা খেয়াল করেছেন যে, যে-সমস্ত শিক্ষার্থীরা কোনও বস্তুর নাম জানার আগেই বস্তুটিকে দেখে নেয়, তারা ‘ফ্রিকোয়েন্সি বুস্টিং’-এ সক্ষম। অর্থাৎ, তারা অসঙ্গতিপূর্ণ তথ্যের সাহায্যেও বস্তুটিকে সনাক্ত করতে পারে।

যেমন, শিক্ষকরা যখন কোল্ডড্রিংক্সের মতো কার্বোনেটেড পানীয় বোঝাতে ‘সোডা’, ‘পপ’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করেন, তখন সেটি শুনে ছাত্ররাও ‘ফ্রিকোয়েন্সি বুস্টিং’ পদ্ধতির সাহায্যে সর্বাপেক্ষা অধিক ব্যবহৃত শব্দবন্ধটি শিখে নেয়। এবং সেটিই ব্যবহার করে।

তবে ‘ফ্রিকোয়েন্সি বুস্টিং’-এর মূল বৈশিষ্টটি হল, এই নিয়মটি শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের চেয়েও বেশি ব্যবহার করে থাকে।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করলেন মা। “আপনার সন্তানকে যখন লাল বা নীল রং বিষয়ে শেখাতে যাবেন, তখন সেটি কীভাবে শেখালে সবচেয়ে ভাল হবে, সেটা কেউই খুব একটা ভাবেন না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বাবা-মা আগে বলেন যে, ‘দেখো, এটা নীল রং’, তারপর বাচ্চাকে কোনও একটা নীল রংয়ের বস্তু দেখান। কিন্তু এই গবেষণা থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তে এসেছি যে, শেখানোর সঙ্গে-সঙ্গে কীভাবে কোনও বিষয় বাচ্চাকে শেখাবেন, সেটিও খুব গুরুত্বপূর্ণ। আর এই শেখানোর সময় যদি বাচ্চাকে আগে বস্তুটিকে দেখিয়ে নিয়ে পরে তার নাম জানানো হয়, তবে সেটি বেশি কার্যকরী হয়।” মন্তব্য মা-এর, যিনি এই গবেষণাটি ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার গবেষক আরভিনের সঙ্গে এই গবেষণাটি করেছেন।

প্রত্যেক শিক্ষার্থীই আলাদা!

একজন শিক্ষার্থী অন্য শিক্ষার্থীর চেয়ে কোথায় আলাদা, তা বোঝার জন্য ও গবেষণার সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করার জন্য গবেষকদল গাণিতিক মডেলের সঙ্গে-সঙ্গে তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাও প্রদান করেন।

“শিক্ষণপদ্ধতিতে যে-কোনওরকম অসঙ্গতির সঙ্গেই যে ‘অবজেক্ট-লেবেল’ শিক্ষার্থীরা মানিয়ে নিতে পারে, তা বোঝার জন্য এই গবেষণায় একটি অভিনব গাণিতিক মডেলের সাহায্য আমরা নিয়েছি। এই গাণিতিক তত্ত্বই যে আদতে পর্যবেক্ষণমূলক তথ্যকে ব্যাখ্যা করতে পারছে, তা উৎসাহব্যঞ্জক,” জানালেন মা।

গবেষকদলের মতে, মানুষের শিক্ষণপদ্ধতি বুঝতে পারলে তাকে বিস্তৃত জায়গায় প্রয়োগ করার অবকাশ রয়েছে। যেমন, বিদেশি ভাষা শিক্ষণের প্রোগ্রামগুলির ক্ষেত্রে কোনও বিষয়ের নাম শেখানোর আগে তার ছবি দেখালে উপকার পাওয়া যায়। সন্তানের জন্য কোন পদ্ধতিতে শিক্ষা কার্যকরী তা জানতে এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ। এবং এর ফলাফল অঙ্ক, বিজ্ঞান, ও অন্য যে-কোনও বিষয়ের শেখানোর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায়।

(ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার গণিতের অধ্যাপক নাতালিয়া কোমারোভা এবং আরভিন একত্রে এই গবেষণাপত্রটি লেখেন।)