ছায়ানাটিকা: মিশর থেকে ইস্তানবুলে পা রেখেছিল যে শিল্প

শিল্প Contributor
ফিচার
ছায়ানাটিকা
© Vasilis Ververidis | Dreamstime.com

মধ্য ইস্তানবুলের তাশকিম স্কোয়ারে নিজের ব্যাক অফিসে বসে চেঙ্গিজ ওজেক কাজ করছিলেন, যখন আমি সাক্ষাতকার নেওয়ার জন্য প্রবেশ করলাম। নিজের কার্যালয়কে চেঙ্গিজ বলেন ‘শ্যাডো থিয়েটার’। তবে এটাও জানালেন যেন ইস্তানবুল শহরে তাঁর থিয়েটারটিই এই ঘরানার শেষ থিয়েটার। কথা বলতে বলতে চামড়ার টুকরো কেটে তাতে রং করছিলেন ওজেক। প্রশ্ন করে উত্তর পাওয়া গেল, তসবির বানাচ্ছেন।

“আমি কখনও খালি হাতে থাকতে পারি না” মিষ্টি হাসির সঙ্গে এই উত্তরও এল। আর এইভাবেই দিনের পর দিন একাকী নতুন নতুন গল্প ও তসবীর ( নাটিকার পুতুল) বানিয়ে যান চেঙ্গিজ ওজেক, ইস্তানবুলের অন্যতম প্রভাবশালী তূর্কী পুতুল নাটিকা শিল্পী। আর একা হাতে চেষ্টা করে যান ইস্তানবুল ও সমগ্র তূর্কীর শিশু ও কিশোরদের মনোরঞ্জন করতে।

“এখনও জন ৫০ লোক পাওয়া যাবে তুরস্কে, যারা ছায়ানাটিকা বা পুতুল নাটিকা শিল্পটি জানেন। কিন্তু মাত্র তিন বা চার জন রয়েছে যারা নিজেদের জীবন পুরোপুরি এই শিল্পে সঁপে দিয়েছে।” কারাগোজ পুতুল নাটিকা শিল্পের একটা চরিত্রের তসবীর বানাতে বানাতে আমাকে জানালেন ওজেক। নিজেকে অবশ্য কিছুতেই মানতে চাইলেন না সেরা বলে, তাঁর দাবি তিনি এখনও অনেক কিছু শিখতে পারেননি। এখনও তাঁর অনেক কিছু জানা ও পরখ করা বাকি।

শ্যাডো থিয়েটার বা পুতুল ও ছায়ানাটিকা-র ইতিকথা

ষোড়শ শতক নাগাদ অটোমান তুরস্কে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হতে থাকে ছায়ানাটিকা বা পুতুল নাচ। এই সময়ে অটোমান তূর্কী সুলতান প্রথম সেলিম মিশরের মামলুক সাম্রাজ্যকে পরাজিত করে মিশর দখল করেন। শুধু তাই নয়, ১৫১৭ অব্দে পরাজিত মামলুক সুলতান দ্বিতীয় তুমান বেইকে ফাঁসি দেওয়া হয়। নতুন সম্রাটের সম্মান ও মনোরঞ্জের জন্য এক মামলুক ছায়ানট এই ঘটনার একটি পুতুলনাটিকা সুলতান সেলিমের দরবারে পেশ করেন।

সেলিম এতে প্রীত হলে ঐ নটশিল্পীকে নিজের দরবারে স্থায়ী আসন দিয়েছিলেন। আর তারপরেই সমগ্র অটোমান সাম্রাজ্য জুড়ে প্রচলিত হয়ে যায় এই শিল্প। মূলত অটোমান তূর্কীদের প্রাত্যহিক জীবন, প্রেম, সম্পর্ক ও রাজনীতির উপর নির্ভর করেই এই নাটিকাগুলি বানানো হত। তূর্কীভাষায় ছায়ানটকে বলা হয় হায়ালি।

“সমস্ত পুরনো হায়ালির শুরু কিন্তু ইস্তানবুলেই। এই শহরকে বলা যায় ছায়ানাটিকার আঁতুড়ঘর। হ্যাঁ, কিছু কিছু বরসা বা অন্য শহরের প্রভাবও রয়েছে। কিন্তু পুতুল বা ছায়ানাটিকার সূচনা কিন্তু এই শহরেই।” জানালেন ওজেক, যিনি নিজেও ইস্তানবুলেরই বাসিন্দা।

“পাশা ও অন্যান্য শাসকদের দরবারে একজন করে হায়ালি থাকতই। আর সেখান থেকেই বলকান, মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও আর যেখানে যেখানে অটোমান সাম্রাজ্য বিস্তৃত হয়েছে, সেখানেই ছায়ানাটিকাও পৌঁছে গিয়েছে।”

ছায়ানাটিকার গল্প

ওজেকের থেকেই জানতে পারলাম, ছায়ানাটিকার নানা গল্প হতে পারে। মূলত ছায়ানটের স্বাধীনতা কোন বিষয়ে সে নাটিকাটি তৈরি করবে। তবে সবচেয়ে বিখ্যাত কারাগোজ ও হাসিভাতের গল্প। দুই অভিন্নহৃদয় বন্ধু, যারা নানা বিপদের মধ্যে পড়ে এবং শেষে নিজেদের বুদ্ধি খাটিয়ে সেই বিপদ থেকে উদ্ধার পায়। কারাগোজ সমাজের নিচু শ্রেণির মানুষ, আর হাসিভাত উচ্চশ্রেণীর ধনী সন্তান। এই নাটিকার মাধ্যমে ভারী সুন্দর করে বন্ধুত্বের বার্তা দেওয়া যায়। আর তাই, তুর্কী সমাজের উচ্চ নীচ সব শ্রেণির মধ্যেই এই নাটিকা ভীষণ প্রিয়।

ওজেক জানালেন, এই কারাগোজ আর হাসিভাত বাস্তব জীবনে সত্যিই ছিলেন। উত্তরপশ্চিমের বরসা শহরে এক মসজিদ বানানো হচ্ছিল, তার মিস্তিরি ছিলেন কারাগোজ আর দেখাশোনা করতেন হাসিভাত। দুজনেই ছিলেন মজার মানুষ, আর তার ফলে আশপাশের লোকজনকে কাজের মধ্যেই প্রবল হাসির খোরাক দিতেন। এর ফলে, মসজিদটি তৈরি হতে দেরি হয়। ক্ষিপ্ত অটোমান সুলতান দুজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে, বাস্তবে মারা গেলেও আজ ছায়ানাটিকার চরিত্র হিসেবে তারা অমর।

ছায়ানাটিকার বর্তমান অবস্থা

“দুঃখের বিষয়, আমার শিল্প সম্পর্কে দেশের বাইরের লোকজনের খুব আগ্রহ। কিন্তু দেশে আগ্রহী পাইনা সেভাবে” হাসতে হাসতে জানালেন ওজেক। তিনি ১৯৯৮ সাল থেকে আন্তররজাতিক ছায়ানাটিকা উৎসব চালু করেছেন নিজের চেষ্টায়। এছাড়াও প্রায় ৫০টি দেশ ও ১৫০টি শহরে তিনি নিজের ছায়াণাটিকা দেখিয়েছেন। বর্তমানে, একটি ছায়ানাটিকা সংগ্রহশালা খুলতে চান ওজেক, তূর্কী সরকারের সঙ্গে কথা হচ্ছে তাই নিয়ে।

বাকি বিশ্বের কাছে অবশ্য পুতুল বা ছায়ানাটিকা তুরস্কের অন্যতম প্রাচীন শিল্প। ২০০৯ সালে ইউনেস্কো এটিকে ‘কালচারাল হেরিটেজ’-এর তকমা দিয়েছে।

“ছায়ানাটিকা, মূলত কারাগোজ ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। ৫০০ বছর আগে এই একটি শিল্প চলচ্চিত্র, সাহিত্য, ভাস্কর্য, চিত্রশিল্প সবকিছুর চাহিদা মেটাতে পারত। তাই এই শিল্পকে রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য।” জানলার বাইরের ব্যস্ত শহরের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত এক নিশ্চিত গলায় জানালেন ইস্তানবুলের বিখ্যাত হায়ালি চেঙ্গিজ ওজেক।

Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.