ছায়া নাটক, পুতুল নাচ, ইসলামীয় নাট্যশৈলীর ইতিকথা

dreamstime_s_44309464

আমাদের প্রত্যেকের একটা স্বাভাবিক প্রবণতাই হচ্ছে আমরা কোনও জিনিস পড়া বা শোনার থেকে সেই জিনিসটি দেখার প্রতি বেশি আগ্রহ প্রকাশ করে থাকি। এর সঙ্গে অবশ্যই একধরনের বিশ্বাসযোগ্যতার বিষয় জড়িয়ে থাকে। ‘দৃশ্যগ্রাহ্য’ যে কোনও জিনিসের গ্রহণযোগ্যতা অপেক্ষাকৃত বেশি হয়, একথা বলা বাহুল্য।

দৃশ্যগ্রাহ্য জিনিসের প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায় অধুনা ইলেকট্রনিক বিভিন্ন ডিভাইস বা যন্ত্রসংবলিত বিভিন্ন ছবি এবং অন্যান্য ভিডিয়ো প্রসঙ্গের কথা। কিন্তু শতাব্দি প্রাচীন আগে এই বিষয়গুলো এতটাই সহজলভ্য ছিল না। এখনকার মতো সুসজ্জিত প্রেক্ষাগৃহের উপস্থিতি ছিল সেই সময়ে ছিল যৎসামান্যই, তাছাড়া প্রেক্ষাগৃহে সকলের উপস্থিতি একেবারেই কাম্য ছিল না। সঙ্গে সঙ্গেই ছিল বেশ কিছু নিয়ম। নিষেধাজ্ঞা। প্রেক্ষাগৃহে ঠিক কোন ধরনের বিষয় প্রদর্শিত করা উচিত, সেই সম্পর্কে একপ্রকার নির্দেশিকাও চালু ছিল সেই সময়ে।

কথা প্রসঙ্গে ফিরে যাওয়া যাক। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে, সুপ্রাচীনকালে এই ধরনের প্রথা ঠিক কীভাবে প্রচলিত ছিল সেই সময়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা যেতে পারে।

মিশরের নাট্যরীতি

প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা-সংস্কৃতির প্রতি নজর দিই তাহলে লক্ষ করা যাবে প্রায় ২০০০ খ্রিপূর্বাব্দ সময়ে, প্রাচীন মিশরে নাট্যরীতির চালু ছিল। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, তৎকালীন নাট্যবিষয় এবং নাট্যপরিবেশনের ধারা অবশ্যই আধুনিক ভাবধারা সম্বলিত ছিল না মোটেই। তবুও শত শতাব্দি পূর্বের মানুষজন কিঞ্চিৎ জনমনোরঞ্জক, একইসঙ্গে শিক্ষণীয় কোনও বিষয় জানবার উদ্দেশ্য নিয়ে এইসকল নাটকগুলো দেখে থাকতেন।

দামেস্কের ছায়া নাটক

মধ্যযুগে প্রচলিত বেশ কয়েকটি শিল্পসংস্কৃতির ধারা আমাদের চোখে পড়বে। তার মধ্যে অন্যতম হল ‘ছায়া থিয়েটার’ বা ‘Shadow play’। কী তার বৈশিষ্ট্য? ছায়া থিয়েটার পরিবেশনের সময় বিভিন্ন ধরনের ‘পুতুল’ ব্যবহার করা হয়ে থাকত। এগুলিই ছিল নাটক বা মঞ্চসজ্জার মূল উপকরণ। সাধারণত হস্তনির্মিত পুতুলের সমন্বয়ে, অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে একটি পাতলা পরদার পিছনে ছায়া বা shadow-র মধ্যে দিয়ে কোনও গল্প-কথা বা কাহিনি পরিবেশন করা হয়ে থাকত। মধ্যপ্রাচ্যের দামেস্কে এই রীতি এখনও অনুশীলিত হয়ে থাকে। দামেস্ক প্রসঙ্গে আরও একটা জিনিস মনে পড়ে। শিক্ষা-সংস্কৃতির বিকাশে দামেস্ক বেশ উন্নত একটি প্রদেশ। আমরা বিভিন্ন দেশের সুপ্রাচীন গ্রন্থাগারের ইতিহাসের কথা বলতে গিয়ে এই দামেস্কের কথাও উল্লেখ করেছিলাম।

সাধারণত মঞ্চের পিছন থেকে একটি আলো ফেলা হয়, যাতে পুতুলগুলির ছায়া স্ক্রিনে প্রোজেক্ট করা যেতে পারে। এই প্রোজেক্টশনের সঙ্গে সঙ্গেই সংগীত ও প্রয়োজনীয় গান মঞ্চে উপস্থাপিত হতে থাকে। সাধারণত নাটকের মূল উপাদানই হল সামাজিক কোনও ঘটনা বা নিছক কোনও হাস্যরসাত্মক ঘটনা…

যা জনমনোরঞ্জক। একটা সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ক্যাফেতে এই ধরনের ‘শ্যাডো প্লে’ পরিবেশনের বিশেষ চল ছিল। বর্তমান সময়ে ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং অন্যান্য আরও অনেক বিষয়ের আবিষ্কারের ফলে শ্যাডো প্লে-র জনপ্রিয়তা ধীরে ধীরে হ্রাস পেয়েছে। আরও একটা জিনিস মনে রাখতে হবে সাম্প্রতিক সময়ে সিরিয়ার ভয়ংকর পরিবেশের প্রভাব ওর পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন দেশেও আঘাত এনেছে। কাজেই সমস্যাবহুল এই সময়ে দাঁড়িয়ে শিল্পের চর্চা নিছকই বাহুলতা মাত্র।

পুতুল নাচ

এই সূত্র ধরেই আমরা ফিরে যেতে পারি প্রাচীন ইতিহাসের দোড়গোড়াতে। সেই সময়ে পাপেট থিয়েটার (যার একটা বিশেষ অংশ হিসেবে আমরা ছায়া থিয়েটারের উল্লেখ পাই) এবং passion play-এই দুটি জনপ্রিয় নাট্যমাধ্যমের সঙ্গে আমরা পরিচিত হই। ‘Passion play’ কিন্তু ‘তাজিয়া’ নামেও বিশেষ জনপ্রিয় হয়েছিল। এই ধরনের থিয়েটার পরিবেশনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল ইসলামীয় প্রাচীন গাথা, ইতিকথার সারাৎসার দর্শকের সামনে তুলে ধরা।

মধ্যপ্রাচ্যের ওমানকে ধরা হয় ‘performing art’-র একটি অন্যতম প্রধান নগরী। ওমানের মাস্কাটে ছিল রয়্যাল অপেরা হাইজ। এই প্রেক্ষাগৃহেই নাটকের পাশাপাশি সংগীত পরিবেশনেরও একটা রীতি ছিল। ভুলে গেলে চলবে না আমরা যে সময়ের কথা বলছি সময়কালের বিচারে তা যথেষ্ট প্রাচীন। ‘কারাগজ’ নামক এক তুর্কি ছায়া থিয়েটার এই দেশে বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। তাজিয়া বা passion play-র মধ্যে আমরা দেখেছি হজরত আলীর জীবনের বিভিন্ন ঘটনাবলীর একধরনের ঐতিহাসিক বিবরণ। ‘কারাগজ’ প্রসঙ্গে অনেকেরই ধারণা রয়েছে চীন থেকে ভারতে এই ধরনের নাট্যরীতির আগমন, পরে অবশ্য মোঙ্গল সৈন্যদের থেকে চীন থেকে এই নাট্যরীতির প্রচলন শুরু হয় তুর্কি প্রদেশে। অটোমান সাম্রাজ্যে এই নাটক বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়েছিল, পরে তুরস্ক এবং গ্রিসে ছড়িয়ে পড়ে।

কারাগজ নাটক প্রসঙ্গে বলতে হয়, এই নাটকে কারাগজ এবং হ্যাসিভাট বা হ্যাসিভাড নামের দুটি চরিত্র পাওয়া যায়। মূলত এই দুই চরিত্রকে ভিত্তি করেই নাট্যকাহিনি আবর্তিত এমনটা বলতে পারি। কারাগজ নাটক কয়েকটিভাগে বিভিক্ত ছিল যেমন- মুকাদ্দেমে(সূচনা বা ভূমিকা অংশ), মুহারেবে (কারাগজ এবং অন্যান্য চরিত্র বিশেষত হ্যাসিভাটের পারস্পরিক সংলাপ), ফ্যাসিল( মূল কাহিনির পরিবেশন) এবং বিটিস বা বিটি (নাট্যের উপসংহার)। এই প্রসঙ্গে আরও কয়েকটি জিনিস উল্লেখ করা যায় কারাগজ নাটক পরিচালনার জন্য বা নাটকের পুতুলগুলো ঠিকভাবে পরিচালনার জন্য একজন দক্ষ নিয়ন্ত্রকের প্রয়োজন হয়, একজন থাকেন শিক্ষানবিশ যাকে বলে ‘সান্দিক্কর’ আর অন্যদিকে পুতুলগুলোর নিয়ন্ত্রণ যিনি নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন তাকে বলে কারাগজকি, হাইয়াল। এছাড়া থাকেন ‘ইয়ার্ডাক’, তিনি মূলত সূচনার অংশটুকু পরিবেশন করে থাকেন, কোনও চরিত্রের সংলাপ দেওয়ার কাজ ইয়ার্ডাকের থাকে না।

আনাতোলিয়াতে এই ছায়া থিয়েটারের ধরন

পাপেট থিয়েটারের প্রসঙ্গ দিয়ে প্রতিবেদনটি শুরু করার প্রসঙ্গে আমরা মিশরের কথা বলেছিলাম, এক্ষেত্রে অনেক গবেষকেরাই আবার মনে করেন মিশর থেকেই আনাতোলিয়াতে এসেছে এই ছায়া থিয়েটারের ধরন। ঐতিহাসিক যুক্তি অবশ্যই রয়েছে ইয়াভুজ সুলতান সেলিম কর্তৃক মিশর জয় ১৫১৭ সালে, সেই যুদ্ধজয়ের ফলশ্রুতিতে তিনি ‘ছায়া থিয়েটার’ দেখেন সেখানে। একইসঙ্গে অভিভূত হয়েছিলেন। কার্যত, ছায়া থিয়েটারের অভিনব পদ্ধতির দ্বারা বিশেষভাবে আকৃষ্ট হয়ে তিনি আনাতোলিয়াতে এই থিয়েটারের রীতিটি চালু করেছিলেন বলে ধারনা করা হয়। শোনা যায়, তিনি নাকি পাপেট থিয়েটার পরিবেশনকারীকে নিজের রাজপ্রাসাদে নিয়ে এসেছিলেন। ইয়াভুজ সুলতান সেলিমের ছেলেও পরে এই শিল্পের দ্বারা বিশেষভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন এবং ছায়া থিয়েটারের একধরনের স্থায়ি ঠিকানা উসমানিয়া প্রাসাদে বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়।

ইরানের ক্ষেত্রে ১০০০ সিইর পূর্ব থেকেই পাপেটশিল্পের একধরনের অস্তিত্ব ছিল বলেই জানা যাচ্ছে। তবে সেই সময়ে পাপেট বা পুতুল নাচের জনপ্রিয়তা এতটা বেশি ছিল না বলেই জানা যায়। মূলত দস্তানা এবং দড়ি ব্যবহার করে তাকে বিভিন্ন আকার-আকৃতির অবয়ব প্রদান করার মাধ্যমেই মঞ্চে মূল কাহিনি পরিবেশিত হত।

‘খায়াল-আল-জিল’

পাপেট থিয়েটার, ছায়া থিয়েটারের অন্য একটি নাম পাচ্ছি, তা হল ‘খায়াল-আল-জিল’। যখন আমরা কোনও বিষয়কে সরাসরি প্রকাশ করতে পারি না, সেসব ক্ষেত্রে আমরা রূপকের আশ্রয় গ্রহণ করে থাকি, এই ‘খায়াল-আল-জিল’-কে আমরা রূপকের দ্যোতক হিসেবেও ব্যবহার করতে পারি। ভেবে দেখলে এই ধরনের নাট্য পরিবেশনের মূল উপাদানই অনেকাংশে ছিল সমাজ নির্ভর এবং সামাজিক বিভিন্ন ঘটনা নির্ভর, কাজেই সরাসরি নাট্যকার দর্শকদের সামনে কাহিনি তুলে না ধরে আভাসে এবং ইঙ্গিতের মাধ্যমে বিষয়ের উপস্থাপনা করতেন।

বর্তমান সময়ে নাট্য পরিবেশনের ক্ষেত্রে একটা বড় উপাদান হিসেবে থাকে নাট্যের ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর বা মিউজিক। শতাব্দি প্রাচীন ওই সময়েও আবহ সংগীতের নির্মাণ হত বাঁশি, ঢোল এবং তাম্বুরা সহযোগে।

শিয়া ইসলামিয় নাটকগুলো অনেকাংশেই ধর্মীয় কাহিনি বা ঘটনা কেন্দ্রিক হলেও , ধর্মনিরপেক্ষ ঘটনাগুলো আখ্রাজা হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিল।

সুতরাং, একবিংশ শতকে দাঁড়িয়ে শিল্প-সংস্কৃতি বিকাশের যেসকল উপাদান আমরা পেয়ে থাকি, তার মধ্যে নাটক হল অন্যতম একটি প্রধান রূপ। প্রাচ্যেও এই রূপেও একটা ধারাবাহিক বিকাশ ছিল, অন্তত ইতিহাস সেই কথাই বলে।