জলবায়ু পরিবর্তনে অদৃশ্য হচ্ছে অসংখ্য সমুদ্র সৈকত

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কোন বিশেষ দেশ জনগোষ্ঠী-ভিত্তিক নয় এই পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবের পড়েছে সারা পৃথিবীর মানুষের উপর। বিশেষ করে গত ২০ থেকে ৩০ বছর ধরে এর প্রভাব এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, থেকে আমেরিকা মহাদেশও ছড়িয়ে পড়েছে।

পশ্চিমা বিশ্বের অনেকেই এই জলবায়ু পরিবর্তনকে বিজ্ঞানের একটি ছোটখাটো বিষয় বলে মনে করেন। অথচ এটি চলমান শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ঘটনা। এমনকি বারাক ওবামা পর্যন্ত এই বিপর্যয়কে সন্ত্রাসবাদের চেয়েও বড় হুমকি বলে অভিহিত করেছিলেন। এর প্রভাবে ২১০০ সালের মধ্যে বিশ্বের অর্ধেক সমুদ্রসৈকত অদৃশ্য হয়ে যাবে বলে জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা মতামত দিয়েছেন।

বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার ক্লাইমেট চেঞ্জ’ এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে, ঘন মানব বসতি উপকূলরেখাগুলোর আরো ক্ষয় হতে পারে। বিজ্ঞানীরা উপগ্রহের চিত্র ব্যবহার করে গত ৩০ বছরে সৈকত গুলো কিভাবে পরিবর্তন হয়েছে তা দেখিয়েছেন। এতে দেখা গিয়েছে শতাব্দীর শেষের দিকে পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক বালুকাময় সমুদ্র সৈকত বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় দুটি বিষয় হচ্ছে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও সাগর অম্লকরণ। মানুষের অবিবেচিত মাত্রাতিরিক্ত উৎপাদন, প্রকৃতির প্রতি কোন প্রকার সম্মান প্রদর্শন না করার কারণে বেড়ে যাওয়া কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস এই দুটি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা রাখছে।

এ গ্যাসের ফলে পৃথিবীর গ্রীন হাউজ এর উপরে মাত্রাতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে পৃথিবীতে আসা সূর্যের আলো যে তাপ সৃষ্টি করছে তা পৃথিবী থেকে প্রয়োজনীয় মাত্রায় বেরিয়ে যেতে পারছে না। এর ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বছর বছর ঝড় বৃষ্টির সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে, এবং এসব ঝড় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রয়োজনীয় শক্তি খুব সহজেই সঞ্চার করতে পারছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যে বরফ রয়েছে তা গলতে শুরু করেছে। বিজ্ঞানীদের এক গবেষণায় দেখা গেছে ১৮৮০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সারা পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এই তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে বরফ গুলো অর্থাৎ হিমবাহগুলো গলছে। এই দ্রুতগতিতে হিমবাহ গলে যাওয়ার কারণে প্রাকৃতিক হ্রদ গুলো ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন আগামী এক দশকের ভেতরে অন্তত ৫০০০ হ্রদ যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে সমুদ্রের উচ্চতা বেড়ে যাবে এবং ২০২১ সালের মধ্যে অসংখ্য সমুদ্র সৈকত হারিয়ে যাবে।

গবেষকরা অনুমান করছেন যে, পশ্চিম আফ্রিকার গাম্বিয়া এবং গিনি-বিসাউ তাদের ৬০ শতাংশেরও বেশি সমুদ্র হারাতে পারে। এরপরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তালিকায় রয়েছে অস্ট্রেলিয়া যার প্রায় ৫০০ মাইল জলবায়ু পরিবর্তনের বলি হতে পারে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মেক্সিকো, চীন, ইরান, আর্জেন্টিনারও হাজার হাজার মাইল উপকূল হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

বহুকাল ধরে তুষারপাতের কারণে অসংখ্য বরফের স্তুপ তৈরি হয়েছে এন্টার্কটিকায়। এদের বেশিরভাগই দুই মাইলেরও বেশি পুরু। এবং বিগত শত শত বছর ধরে এই বরফের স্তুপ গুলো তাদের স্বাভাবিক অবস্থাতেই ছিল। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই বরফ গুলো গলতে শুরু করেছে, এর ধাপগুলো ধসে পড়ে যাচ্ছে। এন্টার্কটিকার বরফ গলার কারণে ২১০০ সাল নাগাদ সাগরের পানির উচ্চতা বেশ বেড়ে যেতে পারে। যদি তাই হয় তাহলে অনেক শহর উপকূলকে এই পানিরস্তর গ্রাস করে নেবে।

চলমান বছরের ফেব্রুয়ারিতে একটি সমীক্ষায় বলা হয়েছে, আগামী ৫০ বছরের মধ্যে সারা পৃথিবীর তাপমাত্রা যদি ০.৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস বৃদ্ধি পায় তাহলে পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। আর যদি তাপমাত্রা ২.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পায় তাহলে ৯৯ শতাংশ প্রজাতি স্থানীয়ভাবে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।

অদূর ভবিষ্যতে মানবজাতির জন্য কি অপেক্ষা করছে তা যদি আমরা ইতিহাসের দিকে তাকাই তাহলে কিছুটা হলেও আমরা বুঝতে পারবো। আজ থেকে এক লাখ ২৫ হাজার বছর আগে পৃথিবী এখনকার তুলনায় আরো বেশ খানিকটা উষ্ণ ছিল। তখন পানির স্তর আজকের চেয়ে ২০ থেকে ৩০ ফুট বেশি ছিল। প্রায় 30 লাখ বছর আগে আমাদের বায়ুমন্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা এখনকার মতোই ছিল। তবে ২০৫০ সালে সাগরের পানির স্তর আজকের তুলনায় ৭০ ফুট বেশি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। গ্রিনল্যান্ড এবং পশ্চিম এন্টার্কটিকার বরফ যদি গলে যায় তাহলে সাগরের পানির স্তর আরো ৩৫ ফুট বেড়ে যেতে পারে।

সুতরাং আমাদের নিজেদের জন্য, আমাদের ভবিষ্যতের জন্য, মানবজাতি তথা সমগ্র পৃথিবীর জন্য আমাদের এখন থেকেই কাজ করতে হবে। প্রকৃতিকে ফিরিয়ে দিতে হবে তার আপন গতি। কমাতে হবে দূষণ, বৃদ্ধি করতে হবে বৃক্ষরোপণ। তবেই আমরা এই সংকট থেকে বের হয়ে আসতে পারবো।