জলবায়ু পরিবর্তনে শারীরিক সমস্যা বাড়ছে শিশুদের

শারীরিক স্বাস্থ্য ১৬ মার্চ ২০২১ Contributor
জ্ঞান-বিজ্ঞান
জলবায়ু পরিবর্তনে শিশুদের সমস্যা

বদলে যাচ্ছে পৃথিবীর জলবায়ু, আর এই জলবায়ু পরিবর্তনে শিশুদের সমস্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্ব উষ্ণায়ন, বায়ুদূষণ এখন আমাদের কাছে অতি পরিচিত শব্দবন্ধ। আর এগুলির হাত ধরেই নাকি পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে আমাদের চেনা পৃথিবীর জলবায়ু। শীতে এখন আর তেমন শীত পড়ে না, কিংবা বর্ষাকালে কখনও বা অতিবৃষ্টিতে ভেসে যায় আশপাশ, আবার কোনও-কোনও এলাকায় বৃষ্টির ছিটেফোঁটাও মেলে না! এমন অভিযোগ তো হামেশাই আপনারা সকলে করে থাকেন কিন্তু জানেন কি, এহেন জলবায়ু পরিবর্তন শিশুদের নানা শারীরিক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে? জলবায়ু পরিবর্তনে শিশুদের সমস্যা কীভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে, অতিবৃষ্টি কীভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শিশুদের ক্ষতি করছে, তাই নিয়ে সম্প্রতি ‘নেচার সাসটেনেবিলিটি’-তে প্রকাশিত হয়েছে এক নতুন গবেষণা।

জলবায়ু পরিবর্তনে শিশুদের সমস্যা: সাম্প্রতিক গবেষণা

ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটি এবং ব্রাজিলের ফিয়োক্রুজ হেলথ রিসার্চ ইনস্টিটিউট-এর গবেষকরা তাঁদের করা সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখেছেন, যে-সমস্ত মায়েরা গর্ভাবস্থায় অতিবৃষ্টিজনিত ‘শক’-এর সম্মুখীন হয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ভ্রূণের বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে এবং এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই প্রসব হয়ে গিয়েছে।

আপনারা সকলেই জানেন, প্রিম্যাচিয়োর শিশুদের ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশ কম থাকে, যা পরবর্তী স্বাস্থ্য এবং শারীরিক ও মানসিক গঠনের উপর তা প্রভাব ফেলে। এই প্রবণতা বেশি করে দেখা যায় সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উপর, যার মধ্যে অ্যামাজোনিয়ানরা অন্যতম।

জলবায়ু পরিবর্তনে শিশুদের সমস্যা কীভাবে হয়?

আজকের দিনে জলবায়ুর পরিবর্তন এবং অতিরিক্ত গরম পড়া বা অতিবৃষ্টির মতো উগ্র ঘটনা ভাবি মা এবং গর্ভস্থ সন্তান, উভয়ের ক্ষেত্রেই নানাভাবে ক্ষতি করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এর প্রভাবে শস্যোৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটে, ফসল নষ্ট হয়, ফলে পুষ্টিকর খাবার অপ্রতুল হয়ে পড়ে, এবং নানারকম রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। অ্যামাজোনিয়াতে অতিবৃষ্টির ফলে বন্যা খুব স্বাভাবিক একটি ঘটনা, যা মশার বংশবৃদ্ধির জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। এর ফলে নিম্নবিত্ত পরিবারগুলিতে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গুর মতো রোগের পাশাপাশি জলবাহিত রোগের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়। এছাড়া বন্যা, খরা মানুষের জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে, অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে, যা স্ট্রেস, উদ্বেগ ডেকে আনে। এই স্ট্রেসজনিত সমস্যাই কিন্তু প্রিম্যাচিয়োর শিশুজন্মের কারণ এবং তা শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে বাধা দেয়।

এই সমীক্ষাটিতে গবেষকরা কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তনে শিশুদের সমস্যা হয়, তার জন্য সুদীর্ঘ ১১ বছর ধরে ব্রাজিলের অ্যামাজন স্টেটের ৪৩টি নদীনির্ভর পুরসভা অঞ্চলগুলিতে সদ্যোজাত শিশুর উপর পরীক্ষা করেন। এর মধ্যে তাঁরা ২৯১,৪৭৯টি শিশুজন্মের ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে সদ্যোজাত শিশুদের জন্মকালীন ওজন, ভ্রূণের বৃদ্ধি এবং গর্ভাবস্থাকালীন সময়কে কীভাবে স্থানীয় অঞ্চলের বৃষ্টিপাত প্রভাবিত করে, তা লিপিবদ্ধ করেন।

অ্যামাজোনিয়া অঞ্চলে অতিবৃষ্টি নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বে বা ‘প্রিটার্ম’ শিশুর জন্ম এবং বাধাপ্রাপ্ত বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। দেখা গিয়েছে, এর ফলে শিশুদের গড় ওজন প্রায় ২০০ গ্রাম করে হ্রাস পেয়েছে।

জলবায়ুর উগ্রতা প্রভাব ফেলে শিশুর বৃদ্ধিতে!

অ্যামাজোনিয়া অঞ্চলে জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে দীর্ঘস্থায়ী অতিবৃষ্টি বর্তমানে সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। শুধু তাই না, গত কয়েক দশকে বন্যাও প্রায় পাঁচগুণ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

উপগ্রহ চিত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য ব্যবহার করে গবেষকরা প্রতিটি ধরনের বৃষ্টিপাতের রকমের সঙ্গে প্রসবপূর্ব সপ্তাহের (যার মধ্যে প্রাক-গর্ভাবস্থা ত্রৈমাসিক অন্তর্ভুক্ত) তুলনা করার চেষ্টা করেছেন।

এছাড়াও সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে,

  •  অতিপ্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে ৪০%-এর বেশি ক্ষেত্রে সদ্যোজাত শিশুর ক্ষেত্রে কম ওজন দেখা গিয়েছে
  •  স্বাভাবিকের চেয়ে শুষ্ক পরিবেশও ক্ষতির কারণ—এর ফলে শিশুদের ওজন গড়ে ৩৯ গ্রাম হ্রাস পেয়েছে
  • বর্ষাকালে যারা গর্ভধারণ করেছেন, তাঁদের শিশুদের ক্ষেত্রে গড় ওজন ১৩ গ্রাম হ্রাস পেয়েছে

ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির এনভায়রনমেন্ট সেন্টারের অধ্যাপক এবং এই সমীক্ষার অন্যতম গবেষক ডক্টর লিউক প্যারির মতে, “আমাদের গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, জলবায়ুর পরিবর্তন শুরু থেকেই শিশুদের উপর খারাপ প্রভাব ফেলছে।”

সামাজিক বৈষম্য ক্ষতি করছে শিশুর

“ব্রাজিলের অ্যামাজন অঞ্চলে এমনিতেই সামাজিক বৈষম্য দেখা যায়। কম বয়সে, এমনকী, বয়ঃসন্ধিকালীন সময়েই মেয়েরা সেখানে মা হয়ে যায়, এবং তাদের মধ্যে শিক্ষারও কোনও চল নেই। দেখা গিয়েছে, যে-সমস্ত শিশুরা উচ্চবিত্ত পরিবারে জন্মায়, তাদের চেয়ে নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্মানো শিশুদের ওজন অন্তত ৬০০ গ্রাম কম! আর এইসমস্ত শিশুদের ক্ষেত্রে জলবায়ুর উগ্রতা আরও বেশি করে ক্ষতি ডেকে আনে।

“এই সমস্যা যাতে না হয়, তার জন্য ওই অঞ্চলে আরও বেশি করে দারিদ্র দূর করার দিকে নজর দিতে হবে। নদীবিধৌত অঞ্চলের অধিবাসীরা যাতে যথাযথ স্বাস্থ্য পরিকাঠামো পায়, সেদিকে খেয়াল রাখা দরকার। এছাড়া স্থানীয় অধিবাসীরা যাতে বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন এবং ঘনঘন বন্যা এবং খরায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, তার জন্য তাদের সাহায্য করা প্রয়োজন।”

ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং এই সমীক্ষার প্রধান গবেষক ডক্টর এরিক চ্যাকোন-মন্টালভান জানিয়েছেন, “আমরা সমীক্ষার জন্য আগেকার কিছু উপলব্ধ জন্মগত পরিসংখ্যানের দিকেও নজর দিয়েছি। এবং সেখান থেকেও জলবায়ুর পরিবর্তন ও সদ্যোজাত শিশুর ওজনের সম্পর্কটি বোঝার চেষ্টা করেছি। দেখা গিয়েছে, অতিপ্রবল বৃষ্টিপাত তো বটেই, এমনকী, মাঝারি বৃষ্টিও বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে।

অ্যামাজোনিয়া অঞ্চলে জলবায়ুর পরিবর্তন উদ্বেগের কারণ। এর প্রভাবে শিশুদের জন্মের সময় যে কম ওজন দেখা যাচ্ছে, তা তাদের শিক্ষাগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছে, ফলে বড় হয়ে উপার্জনও স্বাভাবিকভাবেই কমছে। সেইসঙ্গে বাড়ছে শারীরিক নানা সমস্যাও।”

ব্রাজিলের ফিয়োক্রুজ-এর জেসেম ওরেলানার কথায়, “অ্যামাজোনিয়ার মতো অবহেলিত, অনুন্নত নদীনির্ভর অঞ্চলে বাসিন্দাদের এই বৃষ্টিপাতজনিত ‘শক’ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রবাহিত হয়ে আসছে। এখানকার প্রান্তিক বাসিন্দারা নানাভাবে অন্যায়ের শিকার হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন বা বিশ্ব উষ্ণায়নে এদের কোনওরকম ভূমিকা নেই, বরং এরা অরণ্যকে রক্ষা করে। কিন্তু তাও পরিবেশগত নানা কারণে এদেরই ভুগতে হচ্ছে সবচেয়ে বেশি!” আর এভাবেই জলবায়ু পরিবর্তনে শিশুদের সমস্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।