জানেন কি ইরানের মৃত্যুনগরী, নকশ-এ-রুস্তম কাকে বলে?

মধ্য প্রাচ্য Contributor
জানা-অজানা
নকশ-এ-রুস্তম
File ID 105899088 | © Evgeniy Fesenko | Dreamstime.com

মৃত ব্যক্তিকে মাটি দেওয়া ইসলামে অবশ্য পবিত্র কর্তব্য। বলা হয়, মানুষের মরণের পর কঠিন তিনটি ধাপ তাঁকে পার হতে হয়।

আনাস ইবনে মালিক (রাঃ ) বলেন, রাসূল(সাঃ) বলেছেন, যখন মৃত ব্যক্তিকে কবরে রাখা হয় এবং তার সঙ্গীগণ সেখান হ’তে ফিরতে থাকে, তখন সে তাদের পায়ের শব্দ শুনতে পায়। তাদের ফিরে যেতে না যেতেই তার নিকট দু’জন ফেরেশতা চলে আসেন এবং তাকে উঠিয়ে বসান। তার পর নবী করিম (সাঃ) -এর প্রতি ইশারা করে জিজ্ঞেস করেন তুমি দুনিয়াতে এ ব্যক্তি সম্পর্কে কি ধারণা করতে? মুমিন ব্যক্তি তখন বলে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি আল্লাহর দাস এবং তাঁর রাসূল। তখন তাকে বলা হয়, এই দেখে লও জাহান্নামে তোমার স্থান কেমন জঘন্য ছিল। আল্লাহ তোমার সেই স্থানকে জান্নাতের সাথে পরিবর্তন করে দিয়েছেন। তখন সে উভয় স্থান দেখে এবং খুশি হয়।

সেই কারণেই মরণের পরেও মানুষের যাপন একটু সহজ করার জন্য প্রাচীন যুগ থেকেই তার সমাধিটিকে তার মরণোত্তর গৃহ বানানোর এক প্রয়াস দেখা যায়।

Funerary art বা সমাধি শিল্প ইসলামী ইতিহাস ও অন্যান্য ধর্মের ইতিহাসের এক অপরিহার্য অংশ। একটি সভ্যতার শিল্প ও সংস্কৃতির নানা চিহ্ন বহন করে এক একটি সমাধিস্থল। অলংকার, পোশাক পরিচ্ছদ, সমাধি দেওয়ার ধরন, মানুষের শারীরিক বৈশিষ্ট্য থেকে সমাজের ক্রম বিবর্তন সম্পর্কেও জানা যায় এক একটি সমাধি থেকে।

সারা বিশ্বে ছড়িয়ে রয়েছে অজস্র সমাধি শিল্প, তবে, সেগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য ইরানের মৃত্যুনগরী নকশ-এ- রুস্তম।

নকশ-এ-রুস্তম কী?

নকশ-এ-রুস্তম আসলে ইরানের প্রাচীনতম সমাধিনগরী। খ্রিষ্টের জন্মের প্রায় ৬০০ থেকে ৫০০ বছর আগে পাহাড় কেটে বানানো এই সমাধিসৌধ ইরানের বিখ্যাত আকিমিনিড রাজবংশের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের পরিচয় দেয়। সেই সময়, পার্সিপোলিস শহর ছিল আকিমিনিড রাজবংশের রাজধানী। জীবিত শাসক সেখানে বাস করতেন। কিন্তু মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে আসা হত এই নীরব নিঃশব্দ পাথুরে মৃত্যুনগরী নকশ-এ-রুস্তমে। পরবর্তীকালে সাসানিদ রাজবংশের নানা ঐতিহাসিক প্রমাণ এই সমাধিস্থল থেকে পাওয়া গিয়েছে।

অবস্থান

ইরানের পরিচিত শহর পার্সিপোলিস থেকে মাত্র বারো কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে গেলেই পাওয়া যাবে এই অদ্ভুত সুন্দর সমাধিনগরী। আক্ষরিক অর্থে একে বলা চলে যুগযুগান্তের ইতিহাস বুকে নিয়ে অপেক্ষা করে থাকা এক বালির শহর।

নকশ-এ-রুস্তম-এর বিবরণ

নকশ-এ-রুস্তমে প্রথমে প্রবেশ করলেই চোখ টানে দারায়ুসের সমাধি। কিন্তু সেদিকে মনোনিবেশ করার আগে অবশ্যই একবার প্রথম সম্রাট সাইরাসের সমাধি দর্শন করা উচিত।

সাইরাসের সমাধি

ইরানের প্রথম পরিচিত ক্ষমতাবান সম্রাট ছিলেন সাইরাস। যদিও আকিমিনিড বংশের বিখ্যাত সম্রাট ধরা হয় দারায়ুসকে, তবুও সাইরাস নিজের ক্ষমতায় বলীয়ান ছিলেন। এই সাইরাসের সমাধি স্থাপনের মাধ্যমেই এই সমাধিনগরীর সূচনা। অন্যান্য সমাধির মত সাইরাসের সমাধি একেবারেই পাহাড় কেটে তৈরি নয়, বরং পাথরের স্তূপ একের পর এক বসিয়ে এই সমাধি তৈরি হয়। সাইরাসের পুর্বসূরী প্রথম সাইরাসের সমাধিও ঠিক একই রকম দেখতে। সাইরাসের সমাধিতে বর্তমানে কোনও লিপি খুঁজে পাওয়া যায় না, কিন্তু মধ্যযুগের একজন ভ্রামণিকের লিখন থেকে জানা যায় এই সমাধিতে ঠিক কী লিখা ছিল,

“হে পথিক, তুমি যেই হও, যেখান থেকেই আসো, জেনে রাখো, আমি সাইরাস, পারস্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। আমাকে বিরক্ত কোরো না, এই সামান্য মাটি দিয়ে আমার দেহ আবৃত হয়ে থাক।”

দারায়ুসের সমাধি

অন্যান্য সমাধির মত এই সমাধিটিও পাহাড় খোদাই করে বানানো। এবং অন্যান্য সমাধির থেকে সবচেয়ে মনোগ্রাহী। ঐতিহাসিকরা বলেন, খৃষ্টপূর্ব প্রায় ৬০০ বছর আগে এটি বানানো হয়েছে। কথিত আছে, দারায়ুস নিজেকে নিয়ে এতটাই গর্বিত ছিলেন যে নিজের মৃত্যুর প্রায় বছর দশেক আগেই এই সমাধি তৈরি শেষ করে ফেলেছিলেন। সমাধিমন্দিরে প্রবেশের মুখে উত্তমপুরুষে তিনি নিজের বংশপরিচয় ও কীর্তিপরিচয় খোদাই করিয়েছিলেন। ঐতিহাসিকরা বলেন, সমস্ত লেখাই প্রাচীন ফারসি ভাষায়।

দারায়ুসের সমাধি দর্শনের পর তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের সমাধি নজর টানে। এই সমাধিগুলিতে নানাপ্রকার ভাস্কর্য ও চিত্র খোদাই করা রয়েছে। তবে, সময়ের প্রভাবে অনেক সমাধির গা থেকেই মুছে গিয়েছে ইতিহাসের অনেক আখর। যদিও, দারায়ুসের পুত্র জারেক্সিসের সমাধিটি থেকে এখনও অনেক কিছু জানা যায়।

সমাধিনগরী থেকে প্রাপ্ত ইতিহাস

মূলত, সেই সময় মানুষের জীবন যাপন ও পোশাক আশাক কেমন ছিল তা জানা যায় সমাধিতে খোদাই করা চিত্রগুলি থেকে। দেখা গিয়েছে, দাড়ি রাখার প্রবণতা ছিল তখনও। একমাত্র মিশর দেশে দাড়ি রাখা হত না। ভাষার ব্যবহার জানা যায় ও সমাজে কীরূপ বর্ণাশ্রম প্রচলিত ছিল তাও জানা যায়। মিশর, আরব, লিবিয়া ইত্যাদি দেশের পুরুষের চিত্র থেকে জানা যায় তাঁরা আলখাল্লা ও আবৃত পোশাক পরতেন।

যুগযুগ ধরে মানুষ নিজের যাপনের ইতিহাস রচনা করে গিয়েছে পৃথিবীর বুকে, নিজের পরের প্রজন্মের কাছে সমসাময়িক হয়ে ওঠার জন্য। নকশ-এ-রুস্তম কিন্তু সেই উদ্দেশ্যে বানানো নয়, বরং এখানে পা রাখলে মনে হয় দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ইতিহাস যেন শান্তিতে সুষুপ্তিতে আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে।