জানেন কি এই মসজিদ নির্মাণের সঙ্গে প্রিয়নবী সাঃ যুক্ত

quba mosque
Quba Mosque in Al Madinah, Saudi Arabia. ID 51981851 © Brizardh | Dreamstime.com

পৃথিবীর প্রথম মসজিদ নির্মাণের ইতিহাস! মুসলিমদের প্রার্থনার পবিত্র স্থান মসজিদ। যেখানে মুসলিম পুরুষরা আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় ইবাদতে রত থাকেন। মুসলমানদের মসজিদ নির্মাণের ধারা শুরু হয় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর ইসলাম প্রচারের সময় থেকে। আরবের পবিত্র মদিনার দক্ষিণদিকে অবস্থিত কুবা বা মসজিদে কিবলাতাইন হলো পৃথিবীর প্রথম মসজিদ। বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.) মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় আসার পর এই মসজিদ তৈরি হয়। তখনো ফিলিস্তিনের জেরুজালেমে অবস্থিত পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস বা মসজিদুল আকসার দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করতেন মুসল্লিরা। তারপর এই পবিত্র কুবা মসজিদে জোহরের নামাজ চলাকালেই কিবলা পরিবর্তনের ওহি এসেছিল।

উল্লেখ্য, কুবা মূলত একটি স্থানীয় প্রাচীন কূপের নাম। সেই থেকেই এলাকাটির এমন নামকরণ হয়। মহানবী (সা.) হিজরত করে মদিনা গিয়ে কুবা এলাকায় আবু আইয়ুব আনসারী (রা)-এর বসতবাড়িতে অবস্থান করেন। পরে মসজিদে নববির খুব কাছে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলেও প্রতি শনিবার মসজিদুল কিবলাতাইনে নামাজ আদায় করতেন নবী (সা.)। দুই রাকাত নামাজ আদায়ের পর আসমানি ফরমান আসে। যাতে আল্লাহর তরফে মহানবী (সা.)-কে নির্দেশ দেয়া হয় কিবলা পরিবর্তন করার জন্য। ওই অবস্থাতেই জোহরের ফরজ নামাজের ভেতর কিবলা বদল করে বায়তুল্লাহর দিকে মুখ ফিরিয়ে বাকি দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন নবীজী (সা.)। তাঁকে অনুসরণ করে সাহাবাগণ ও মুসল্লিরা দিক পরিবর্তন করে নেন। মদিনায় মসজিদে নববীর পর কুবা হলো দ্বিতীয় বৃহত্তম ও মর্যাদাশীল মসজিদ। এই মসজিদে একসঙ্গে ২০ হাজার মুসুল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।

পবিত্র মদিনা নগরীর উপকণ্ঠে অবস্থিত এই কিবলাতাইন বা কুবা মসজিদ। পবিত্র মসজিদ নববী থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৪ কি. মি.। দ্বিতীয় হিজরিতে সাওয়াদ বিন গানাম গোত্রের লোকরা এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। কাদামাটি ও পাথর দিয়ে প্রথম নির্মাণকাজ হাত লাগিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন মহানবী (সা.) নিজেই। মাটি, পাথর, খেজুর পাতা ও খেজুর ডাল দিয়ে তৈরি হয় এই মসজিদ। তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান ইবনে আফফান রা: প্রথম এর সংস্কার করেন। খলিফা ওমর বিন আবদুল আজিজ মসজিদটির প্রথম মিনার তৈরী করেন।৪৩৫ হিজরীতে আবু ইয়ালি আল-হোসায়নি কুবা মসজিদ সংস্কার করেন। তিনি মসজিদের মিহরাব তৈরী করেন। ৫৫৫ হিজরীতে কামাল আল-দীন আল ইসফাহানি মসজিদে আরো বেশ কিছু সংযোজন করেন। পরবর্তী সময়ে ৬৭১, ৭৩৩, ৮৪০ ও ৮৮১ হিজরীতে উসমানী সাম্রাজ্যকালে মসজিদটি সংস্কার করা হয়। উসমানী শাসনামলে ১২৪৫ হিজরীতে সর্বশেষ পরিবর্তন সাধন করেন সুলতান আবদুল মজিদ। পরবর্তীকালে আরবের বাদশাহ ফাহাদও মসজিদ সংস্কারের কাজে হাত লাগান। সংস্কার ও সম্প্রসারণ হতে হতে ১৩,৫০০ বর্গমিটার আয়তনের এই মসজিদে এখন ২০ হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন। এতে ১৭ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট দুটি গম্বুজ রয়েছে।

ভূ-পৃষ্ঠে সব মসজিদের ফযিলত সমপর্যায়ের হলেও চারটি মসজিদের ফজিলত অন্য সব মসজিদ থেকে অনেক বেশি। তন্মধ্যে বায়তুল্লাহ শরিফের মর্যাদা ও মাকাম সবার ওপরে। এরপর মসজিদে নববী, তৃতীয় নম্বরে বায়তুল মুকাদ্দাস। চতুর্থ নম্বরে মসজিদে কুবা। প্রথমোক্ত তিনটি মসজিদের ফজিলত ও মাহাত্ম্য সর্বজনবিদিত হলেও চতুর্থটির ব্যাপারে অনেকেরই জানাশোনার পরিধি অপ্রতুল, সীমিত। পবিত্র কোরআনের সূরা আত-আওবা ১০৮ আয়াতে এই মসজিদের প্রশংসা করেছেন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। তাই এই মসজিদের সংক্ষিপ্ত ফজিলতের কথা তুলে ধরা হলো।

রাসুল সা. মদিনা শরিফে হিজরতের প্রথম দিন কুবায় অবস্থানকালে এর ভিত্তি স্থাপন করেন। আর এ হিজরতের মধ্য দিয়ে মদিনা শহরকে কেন্দ্র করে ইসলাম ও কোরআনের বাণী বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। স্বয়ং রাসুল সা. এ মসজিদের নির্মাণকাজে সাহাবাদের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেন। এখানে নামাজ আদায় করেন। নবুওয়ত প্রাপ্তির পর এটাই প্রথম মসজিদ, যার ভিত্তি তাকওয়ার ওপর স্থাপিত হয়। অতঃপর জুমার দিন মদিনা অভিমুখে যাত্রা করেন।

মসজিদে কুবায় নামাজ আদায়ের ফজিলত :

মসজিদে কুবায় নামাজের ফজিলতের কথা অসংখ্য হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। যেমন- হযরত ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অশ্বারোহণ করে কিংবা হেঁটে মসজিদে কুবায় আগমন করতেন এবং দুই রাকাত নামাজ আদায় করতেন। অন্য এক হাদিসে রয়েছে, প্রতি শনিবারে রাসুল সা. কুবায় আগমন করতেন। (বুখারি-মুসলিম)

আরেক হাদিসে বর্ণিত আছে, মসজিদে কুবায় নামাজ আদায় করার সওয়াব একটি ওমরাহর সমপরিমাণ। (তিরমিজি)

রাসুল সা. আরো ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি নিজের ঘরে ভালোভাবে পবিত্রতা অর্জন করে (সুন্নাত মোতাবেক অজু করে) মসজিদে কুবায় আগমন করে নামাজ আদায় করে তাকে একটি ওমরাহর সমপরিমাণ সওয়াব দান করা হবে। তাই তো রাসুল সা. এর যুগ থেকেই প্রতি শনিবার মসজিদে কুবায় নামাজ আদায় করার জন্য গমন করা মদিনাবাসীর অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। বর্তমানেও তাদের এই আমল অব্যাহত রয়েছে।

আধুনিককালে সৌদি শাসনামলে হজ্ব মন্ত্রণালয় মসজিদটির দায়িত্ব গ্রহণ করে-যা মূল ডিজাইনে অধিকতর সংস্কার ও সংযোজন করে। বর্তমান কুবা মসজিদ ইসলামী ঐতিহ্যের পাশাপাশি আধুনিকতম সুযোগ সুবিধা সম্বলিত একটি অনন্য স্থাপত্য।